এলজিইডির মোটা টাকা লোপাট হয় দুর্নীতিতে
প্রকাশ : ২১ জুলাই ২০১৩, ২৩:১৩
দুর্নীতিতেই লোপাট হয়ে যায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) ব্যয়কৃত অর্থের বিরাট অংশ। সে কারণে এই সংস্থার বাস্তবায়নকৃত অবকাঠামোগুলো নিম্নমানের হয়ে থাকে। এলজিইডি সম্পর্কে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রণীত একটি গবেষণা রিপোর্টে দেয়া হয়েছে এমন তথ্য। গতকাল রবিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে এক গোলটেবিল আলোচনায় এটি প্রকাশ করা হয়।
বিষয়টির ওপর আলোচনাকালে বিশেষজ্ঞরা বলেন, মূলত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণেই এলজিইডির মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন প্রকল্পে অস্বচ্ছতার জন্ম হয় এবং সেই অস্বচ্ছতার মাধ্যমে লোপাট হয়ে যায় বিরাট অংকের টাকা। তারা দুর্নীতি রোধ ও প্রকল্পের যথাযথ বাস্তবায়নে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধের সুপারিশ করেন।
টিআইবি ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য এম হাফিজউদ্দিন খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে মুখ্য আলোচক ছিলেন স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ ও অধ্যাপক সালাহউদ্দিন এম আমিনুজ্জামান। এলজিইডি সম্পর্কিত রিপোর্টের সারাংশ উপস্থাপন করেন টিআইবির কর্মকর্তা শাহজাদা এম আকরাম ও নাহিদ শারমিন। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন এলজিইডির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ, টিআইবির উপ-নির্বাহী পরিচালক সুমাইয়া খায়ের প্রমুখ।
ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, গুরুত্বপূর্ণ ১০টি মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী ও সচিব যদি ঠিক হয়ে যান, তাহলে দেশের দুর্নীতি ৭০ ভাগ কমে যাবে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ও সে রকম গুরুত্বপূর্ণ একটি মন্ত্রণালয়। তিনি বলেন, এলজিইডির বড় বড় কর্মকর্তাদের প্রত্যেকেরই নিয়মিত আয়ের হিসাব দেয়া উচিত। কারণ সংস্থাটিতে একটি বড় অনিয়ম ধামাচাপা দিতে গিয়ে আরও ১০টি অনিয়মের জন্ম দেয়ার ঘটনা অহরহ ঘটে। একদিনে ১০টি প্রকল্প পাস করার মতো ঘটনাও রয়েছে। তবে এলজিইডির কাজে গতিশীলতা আনার প্রয়োজনে মন্ত্রণালয় পর্যায়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পরিহারেরও পরামর্শ দেন তিনি। ড. তোফায়েল বলেন, বর্তমানে দেশে দুর্নীতির প্রধান কারণই রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। মন্ত্রী-এমপি ও সচিবসহ প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপ থাকায় প্রকল্পের কাজে স্বচ্ছতা থাকে না।
অধ্যাপক সালাহউদ্দিন এম আমিনুজ্জামান বলেন, সুনির্দিষ্ট আইন ও মিশন ব্যতিরেকেই এলজিইডি নামক প্রতিষ্ঠানটি বহুবিধ কাজে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছে। তাই সংবিধানের আলোকে সংস্থাটির জন্য কার্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ আইন প্রণয়ন করতে হবে।
টিআইবির গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্রামীণ অবকাঠামো নির্মাণ, উন্নয়ন ও মেরামতের দায়িত্বে থাকা দেশের সর্ববৃহত্ প্রকৌশল সংস্থা এলজিইডি সূচনালগ্ন থেকে উল্লেখযোগ্য নানা ইতিবাচক অর্জন করলেও দলীয় রাজনীতির প্রভাব, মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ, প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতা ইত্যাদি কারণে প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে পারছে না। অন্যদিকে জনবল ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, তদারকির অভাব ও নীতিমালা বাস্তবায়নের অভাবে অনেক ক্ষেত্রে দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ঘটেছে। বিশেষত এলজিইডি’র প্রধান প্রকৌশলীর একচ্ছত্র ক্ষমতা প্রয়োগ ও রাজনৈতিক প্রভাবের ফলে পদায়ন, বদলি, পদোন্নতি প্রভৃতি ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়মের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী স্বেচ্ছাধীনভাবে গাড়িসহ অফিসের লজিস্টিকের ব্যবহার বিশেষত বেআইনিভাবে ব্যক্তিগত কাজে গাড়ি ব্যবহার এবং এজন্য জ্বালানি ও ড্রাইভারের ওভারটাইম এলজিইডি থেকে পরিশোধ, সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই প্রকল্প প্রণয়ন, ব্যয় প্রস্তাবনা প্রাক্কলনে অনিয়ম, কার্যাদেশ প্রদানে রাজনৈতিক প্রভাব, দরপত্র নিয়ন্ত্রণ, দরপত্র পেশের পর শিডিউল পরিবর্তনসহ প্রকৌশলী ও ঠিকাদারদের সমঝোতার মাধ্যমে বিভিন্ন দুর্নীতি, বিল উত্তোলনে দুর্নীতিসহ এলজিইডিতে নানা ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়ম পরিলক্ষিত হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এলজিইডির প্রত্যেক ঠিকাদারকে সংস্থার বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রতিটি বিল থেকে সাড়ে ৮ শতাংশ থেকে সাড়ে ১০ শতাংশ কমিশন দিতে বাধ্য করা হয়। এভাবে কমিশন বাবদ কোটি কোটি টাকা ঠিকাদারদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয়া হয়। এর বিপরীতে ঠিকাদাররা নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করার কারণে অনেক প্রকল্পই যথাযথভাবে টেকসই হতে পারে না। স্থানীয় পর্যায়ে সংসদ সদস্য, মন্ত্রী এবং তাদের ঘনিষ্ঠজনেরা দরপত্র ও কার্যাদেশ নিয়ন্ত্রণ করেন এবং রাজনীতিবিদদের ইচ্ছানুযায়ী প্রকৌশলীদের কাজ করতে হয়।
তাছাড়া অধিকাংশ স্কিম পরিকল্পনামাফিক বাস্তবায়ন করা হয় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাস্তবায়নের সময় পরিকল্পনা পাল্টে ফেলা হয়। সার্বিকভাবে প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে উন্নয়ন সহযোগী, রাজনীতিক ও বাস্তবায়নকারী সংস্থার অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাবের কারণে সাধারণ গ্রামীণ জনগণ চাহিদা অনুযায়ী উন্নয়নের সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।