আমার বিশ্বাস সাংবাদিক সেলিনা হত্যায় চৌধুরী মইনুদ্দিন জড়িত ছিলেন
প্রকাশ : ২১ জুলাই ২০১৩, ২৩:১৪
যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে বুদ্ধিজীবী হত্যা মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের তৃতীয় সাক্ষী শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীনের ছেলে সুমন জাহিদ। জবানবন্দিতে তিনি বলেছেন, আমার দৃঢ় বিশ্বাস মা শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীনকে অপহরণ করে হত্যার ঘটনায় চৌধুরী মঈনুদ্দিন জড়িত ছিলেন। তিনি বলেন, পরবর্তীতে উজির মামা পত্রিকায় ছবি দেখে একদিন বলেছিলেন, বুবুকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় এই লোকটিও ছিল।
সাক্ষ্য দানকালে তিনি ও তার মামা সাহাবউদ্দিন উজির ছিলেন শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীনকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়ার ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। জবানবন্দিকালে সুমন জাহিদ তার মাকে অপহরণ ও হত্যার ঘটনা বর্ণনা দেয়ার সময় বার বার কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। এ সময় হূদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল গতকাল রবিবার এ জবানবন্দি গ্রহণ করে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত বুদ্ধিজীবী হত্যায় অভিযুক্ত পলাতক চৌধুরী মঈনুদ্দিন ও আশরাফুজ্জামান খানের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলায় জবানবন্দিতে সুমন জাহিদ বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা ১১৫, নিউ সার্কুলার রোডের (বর্তমান ২৯ নং শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক) বাসায় থাকতাম। ১৯৭১ সালের ১৩ ডিসেম্বর বেলা আনুমানিক দেড়টার দিকে আমি ও আমার এক মামা (সাহাবউদ্দিন উজির) গোসল করে বাসার ছাদে অবস্থান করছিলাম। মা তখন রান্না করছিলেন। সে সময় আমরা বুঝতে পারলাম, বাসার সামনে একটা গাড়ি এসে থেমেছে। তখন বাসার ছাদ থেকে আমি ও মামা উঁকি দিয়ে দেখতে পাই, জিপ ও একটি মাইক্রোবাসের পেছনে একটি মিলিটারি লরি ছিল। মাইক্রোবাসটিতে কাঁদামাখা ছিল। কিছুক্ষণ পর বাসার কলাপসিবল গেটে কড়া নাড়ার শব্দ শুনতে পাই। আমাদের পাশের ফ্ল্যাটে তখন সৈয়দ সালাহউদ্দিন সাহেব থাকতেন। তিনি কলাপসিবল গেটটি খুলে দেন। আগতরা সেলিনা পারভীনের ফ্ল্যাট কোনটা জানতে চাইলে তিনি তা দেখিয়ে দেন। তারা সালাহউদ্দিন সাহেবকে ঘরে চলে যেতে বললে তিনি ঘরে চলে যান।
সুমন জাহিদ বলেন, কড়া নাড়ার শব্দ পেয়ে আমরা কয়েক সিঁড়ি নেমে উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করি, কারা এসেছে। তখন মা দরজা খুলে দিলে আগতরা পরিচয় জানতে চান। তাদের একজন আমাদের দেখে ফেলেন এবং বন্দুক তাক করে বলেন, ‘হ্যান্ডসআপ’। তখন আমি এবং উজির মামা হাত উঁচু করে নেমে আসি। এ সময় তারা আমাদের পরিচয় জানতে চাইলে মা আমাকে দেখিয়ে বলেন, সে আমার ছেলে আর মামাকে দেখিয়ে বলেন, সে আমার ছোটভাই। তখন আগতরা উজির মামাকে দেখিয়ে বলেন, ইয়ে মুক্তি হ্যায়? তিনি বলেন, এ সময় আমি মায়ের কাছে গিয়ে আঁচল ধরে দাঁড়িয়ে থাকি। তখন আগতরা মাকে বলেন, আপনাকে আমাদের সঙ্গে সেক্রেটারিয়েটে যেতে হবে। কারফিউ পাস নেই যেতে পারব না মা একথাটি বলার পর আগতরা জানান, আমাদের কাছে কারফিউ পাস আছে, অসুবিধা হবে না। আমি মায়ের সঙ্গে যেতে চাইলে তাদের একজন বলেন, বাচ্চা লোক নেহি যায়েগা, আন্দা মে যাও। সুমন জাহিদ বলেন, আগতদের মুখ মাফলার দিয়ে ঢাকা ও হাতে অস্ত্র ছিল। তাদের ধমকে আমি ও মামা ভয় পেয়ে দরজার কাছে চলে যাই। সে সময় আমার মাথায় হাত রেখে মা বলেছিলেন, সুমন তুমি মামার সঙ্গে খেয়ে নিও। আমি কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবো। এটাই ছিল মায়ের সঙ্গে আমার শেষ কথা। তখন আগতরা গামছা দিয়ে সেলিনা পারভীনের চোখ বাঁধার পর পিঠ মোড়া করে বেঁধে কাঁদামাখা গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে যান। এরপর মায়ের আর কোনো খবর পাইনি জানিয়ে সাক্ষী বলেন, ১৭ ডিসেম্বর শহীদ মুনীর চৌধুরী ও কবীর চৌধুরীর ভাই শমসের চৌধুরীর কাছ থেকে মেজ মামা মহসীন ও উজির মামা জানতে পারেন, রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে মায়ের লাশ পড়ে আছে। পরেরদিন ১৮ ডিসেম্বর মায়ের লাশ শনাক্ত করার পর আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়।
সে সময় সেলিনা পারভীন তার সম্পাদিত পত্রিকা ‘শিলালিপি’র বিক্রয়লব্ধ টাকা দিয়ে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিত্সার ব্যবস্থা করতেন। এটি জানতে পেরে সেলিনা পারভীনকে অপহরণ এবং হত্যা করা হয়েছে বলে অনুসন্ধানে সাক্ষী জানতে পেরেছেন বলে তার সাক্ষ্যে উল্লেখ করেন। সুমন বলেন, মা দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকায় লিখতেন। সেখানে ফেনীর চৌধুরী মঈনুদ্দিন নামে একজন কাজ করতেন। মামা সাহাবউদ্দিন উজির তখন ছাত্র ইউনিয়ন করতেন। চৌধুরী মঈনুদ্দিন তখন ইসলামী ছাত্র সংঘের নেতা ছিলেন। তাদের মধ্যে প্রায়ই রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব্ব্ব হতো। সুমন আরো বলেন, যেহেতু চৌধুরী মঈনুদ্দিনের বাড়ি ফেনীতে আর মামার সমসাময়িক সেই হিসেবে চৌধুরী মঈনুদ্দিনও মাকে বুবু বলে ডাকতেন। দীর্ঘ অনুসন্ধানে জানতে পারি, এই মঈনুদ্দিনই আগতদের আমাদের বাসার ঠিকানা দিয়েছিলেন। পরে উজির মামা পত্রিকায় ছবি দেখে একদিন বলেছিলেন, বুবুকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় এই লোকটিও ছিল। এছাড়াও রায়েরবাজার বদ্ধভূমি থেকে সে সময় জীবিত ফিরে আসা একমাত্র ব্যক্তি দেলোয়ার হোসেনের কাছ থেকে জানতে পারি, মাকে ধরে নিয়ে মোহাম্মদপুর ফিজিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারের আলবদর হেডকোয়ার্টারের একটি রুমে ২০-২৫ জন লোকের সঙ্গে আটকে রাখা হয়েছিল। তিনি বলেন, “আমি দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি যে, চৌধুরী মঈনুদ্দিন ছিলেন আলবদর বাহিনীর অপারেশন ইন-চার্জ এবং আশরাফুজ্জামান খান ছিলেন আলবদরের একজন সদস্য।