ঈদবাজার ও ঈদের অর্থনীতি

প্রতি বত্সর রমজান মাস না আসিতেই ঈদের কেনাকাটা শুরু হইয়া যায়। আস্তে আস্তে বিভিন্ন বিভাগীয় ও মফস্বল শহরগুলির মার্কেট, বিপণীবিতান ও শপিংমলগুলি সরগরম হইয়া ওঠে। এমনকি ফুটপাতের দোকানগুলিতেও মানুষের তিল ধারণের ঠাঁই থাকে না। এবার রমজানের শুরুতে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয়। যেমন—উপর্যুপরি কয়েকদিন হরতালের পর জমিয়া উঠিয়াছে রাজধানী ঢাকা, মহানগরী চট্টগ্রাম ও রাজশাহীসহ শহর-নগরের ঈদবাজারগুলি। ব্যাংকগুলিতেও গ্রাহকদের ভিড় ক্রমশ বাড়িতেছে। ঈদের আগে আর কোন রাজনৈতিক উত্তাপ ও উত্তেজনা দেখা না দিলে এবারের ঈদের কেনাকাটায় জাতীয় অর্থনীতি স্ফীত হইবে বলিয়া আশা করা যায়। দোকান মালিক সমিতির হিসাব অনুযায়ী রাজধানীতে সর্বমোট ২৩০টি মার্কেট বা শপিংমল রহিয়াছে। ইহার মধ্যে আছে ১৪টি মেগাশপ। সমিতির ধারণা, এ বত্সর ঈদের কেনাকাটায় লেনদেন হইবে কমপক্ষে ৪০ হাজার কোটি টাকা। ইহা একটি উত্সাহব্যঞ্জক খবরই বটে। উল্লেখ্য, ২০০৯ সালে ঈদবাজারে বেচাবিক্রি হইয়াছিল ২০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। অর্থাত্ মাত্র চার-পাঁচ বত্সরের মধ্যেই বিকিকিনি দ্বিগুণ হইয়া গিয়াছে। ইহা আমাদের দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের ইঙ্গিতবহ। ঈদের সময় গ্রামীণ অর্থনীতিতেও প্রাণ সঞ্চারিত হয়। ঈদ উপলক্ষে ২০ লক্ষাধিক গার্মেন্টস শ্রমিক রাজধানী ছাড়িয়া গ্রামে চলিয়া যায়। অন্য পেশার আরও দশ লক্ষাধিক মানুষ এ সময় গ্রামমুখী হয়। ইহাতে সার্বিকভাবে গ্রামে-গঞ্জে টাকার ফ্লো বা প্রবাহ বাড়িয়া যায়। ঈদবাজারগুলিতে আগামী দুই সপ্তাহে ক্রেতাদের আনাগোনা আরও বাড়িবে। তাই স্বাভাবিক কারণে এ সময় নাগরিকদের নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেওয়া বাঞ্ছনীয়। সরকার অন্যান্য বত্সরের ন্যায় এবারও এ ব্যাপারে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করিয়াছে। তাহাছাড়া এ পর্যন্ত বড় ধরনের কোন ছিনতাই, পকেটমার ইত্যাদি ঘটনা ঘটে নাই। আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটার এমন কোন দুঃসংবাদও পাওয়া যায় নাই। আমরা আশা করি, শেষপর্যন্ত এমন শান্তিপূর্ণ ও উত্সবমুখর পরিবেশই বজায় থাকিবে। ইহার পাশাপাশি যানজট নিরসনেও সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করিতে হইবে। গত শুক্র ও শনিবার হইতে মার্কেটগুলিতে উপচেপড়া ঢল দেখা যাইতেছে। সেই সঙ্গে বিশেষত রাজধানী ঢাকায় পাল্লা দিয়া বাড়িতেছে ভয়াবহ ও অসহনীয় যানজট। অফিস ছুটির পর রাস্তাঘাটে চলাফেরা করাই দুঃসাধ্য হইয়া উঠিতেছে। তাই দুপুর দুইটার পর হইতে যানজট নিরসনে কার্যকর ও সমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে। পোশাকের দোকানগুলিতে প্রচণ্ড ভিড়। পোশাকের অনুষঙ্গ হিসাবে পাদুকা বা জুতা, অলঙ্কার ও প্রসাধনীসহ বিভিন্ন পণ্য প্রচুর বিক্রি হইতেছে। প্রতি বত্সরের ন্যায় এবারও কম্পিউটার, মোবাইল সেট ও টিভিসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক পণ্য এবং ঘরবাড়ি সাজানোর আসবাবপত্রও বিপুল বিক্রি হইতেছে। টুপি, আতর, জায়নামাজ ইত্যাদি পণ্যের কেনাকাটাও শীঘ্রই বাড়িয়া যাইবে। প্রতি বত্সরের ন্যায় এবারও পোশাকের রং ও ডিজাইনে চমক আছে। আকাশ সংস্কৃতির কল্যাণে হাল জামানার ফ্যাশন সচেতন মানুষের রুচিবোধও ক্রমেই আন্তর্জাতিক হইয়া উঠিতেছে। দেশি পোশাক ও ব্রান্ডের নানা জিনিসপত্রে রুচির এই বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যাইতেছে। এভাবে পবিত্র ঈদকে ঘিরিয়া যে অর্থনীতির বিকাশ, তাহার উন্নতিতে আরও সচেষ্ট হইতে হইবে। ঈদ মৌসুমে রাজনৈতিক অস্থিরতা অবশ্যই বন্ধ করিতে হইবে। আরব দেশে কয়েকটি পবিত্র মাসে রক্তপাত ও হানাহানির কোন দৃষ্টান্ত নাই সেই আইয়্যামে জাহেলিয়াতের যুগ হইতে। আর সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশ বাংলাদেশের মানুষ রমজান মাসেও দুশ্চিন্তামুক্ত হইতে পারিতেছেন না, যাহা দুঃখজনক। যাহা হউক, ঈদ অর্থনীতি শুধু উত্সবের অংশই নহে, ইহা আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হইয়াছে বলিলেও অত্যুক্তি হয় না।