দুর্নীতি আর অব্যবস্থার মহোত্সব
প্রকাশ : ২২ জুলাই ২০১৩, ২১:৩৬
দেশে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি আর অব্যবস্থার যে মচ্ছব চলিয়াছে উহাতে সার্বিক অর্থনীতি যে এখনও কিরূপে টিকিয়া আছে উহাই এক পরম বিস্ময়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের অপার মহিমায় এখনও এত অব্যবস্থা, অনিয়ম, দুর্নীতি ও বিশৃংখলা সত্ত্বেও দেশটির অর্থনীতির চাকা ঘূর্ণায়মান রহিয়াছে ইহাই সম্ভবত এক্ষেত্রে সার সত্য বলিয়া বিবেচিত হইবার দাবি রাখে। দেশের দুইটি জাতীয় দৈনিকে গত শনিবার প্রকাশিত দুইটি ভিন্ন ভিন্ন প্রতিবেদনে সরকারি প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম, অব্যবস্থা ও দুর্নীতির যে ভয়াবহ চিত্র তুলিয়া ধরা হইয়াছে উহাতে প্রমাদ না গুনিয়া পারা যায় না নিশ্চয়ই। একটি প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে যে, নয় মাস পূর্বে খাদ্যে ভেজাল শনাক্তকরণের জন্য রাজধানীতে ২২ কোটি টাকা ব্যয়ে যে অত্যাধুনিক গবেষণাগারটি প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে নিয়োগ বিধির অভাবে সেখানে নাকি জনবল পাওয়া যাইতেছে না। ফলে উদ্বোধনের পর নয় মাসকাল পার হইয়া গেলেও ঐ গবেষণাগারটি এখনও চালু করা যাইতেছে না। প্রকল্প প্রণয়নের পর যথারীতি বৈদেশিক সাহায্যের উপর ভর করিয়া এই গষেণাগারটি নির্মাণ করা হয়। দেশে যখন খাদ্যে ভেজালের বিষয়টি তাবত্ জনগোষ্ঠীর জন্য মহা বিপদ সংকেত হইয়া দেখা দিয়াছে তখন এই ধরনের গবেষণাগারের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না নিশ্চয়ই। আর সে কারণেই ইহা নির্মাণ করা হইয়াছে। কিন্তু লোকবলের অভাবে উহা যদি এখন চালানোই না যায় তাহা হইলে এই ভূরি ভূরি টাকা অপচয়ের মানে কী? অন্যদিকে অপর একটি দৈনিকের প্রতিবদনে সরকারি অর্থ অপচয়ের মহোত্সব শীর্ষক যে খবরটি প্রকাশিত হইয়াছে উহা আরও ভয়াবহ। চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিত্সার্থে ২ কোটি ২০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে যে ট্রমা সেন্টারটি এগারো মাস পূর্বে নির্মাণ করা হইয়াছে উহাও জনবলের অভাবে অকার্যকর হইয়া পড়িয়া রহিয়াছে। আবার সাড়ে তিন লক্ষ লোকের জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার কথা বলিয়া ২০০৮ সালে সন্দ্বীপের স্বাস্থ্য কেন্দ্রের জন্য ২১ লক্ষ টাকা ব্যয়ে যে এ্যাম্বুলেন্সটি ক্রয় করা হইয়াছিল উহাতে প্রয়োজনীয় তেল বরাদ্দ না করায় এক্ষণে এমনিতেই এ্যাম্বুলেন্সটি নষ্ট হইতেছে। সীতাকুণ্ড উপজেলা হাসপাতালে অপারেশন থিয়েটারের নামে কোটি টাকার যন্ত্রপাতি ক্রয় করিলেও বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের অভাবে উহা গত দেড় বত্সরে একটি রোগীরও কাজে লাগে নাই।
প্রধানত সরকারি অর্থ আত্মসাতের জন্যই দেশের বিভিন্ন স্থানের স্বাস্থ্যসেবা বা অন্যান্য সেবাকার্যে নিয়োজিত কর্তাব্যক্তি এবং তাহাদের অনুচরেরা এইভাবে লুটপাটের মহোত্সব বসায়! গোটা দেশ জুড়িয়াই দশকের পর দশক ধরিয়া এইসব কুকীর্তি চলিতেছে। সরকারি মাল দরিয়া মে ডাল—এই কথার সহিত সেই পাকিস্তান আমল হইতেই আমরা সকলেই কম-বেশি পরিচিত। স্বাধীন দেশেও যে ঐ কথাই কার্যক্ষেত্রে অবলীলায় প্রয়োগ হইতে থাকিবে ইহা নিশ্চয়ই এই দেশটির স্রষ্টারা ভাবেন নাই। কিন্তু বাস্তবে আমরা সরকারি অর্থের যে লুটপাট আর আত্মসাতের চিত্র বিগত কয়েক দশক ধরিয়া দেখিতে পাইতেছি তাহাতে এই দেশের ভবিষ্যত্ বিষয়ে ভীষণভাবে উদ্বিগ্ন না হইয়া পারা যায় না। কেবল চট্টগ্রাম জেলায় স্বাস্থ্য সেবা খাতে এই ধরনের অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ক্রয়ের নামে লুটপাট এবং লোকবলের অভাবে উহা ব্যবহূত না হওয়ায় বিপুল অর্থের অপচয় কোনক্রমেই মানিয়া নেওয়া যায় না। জনগণকে দুর্ভোগের মধ্যে নিক্ষেপ করিয়া যাহারা এই ধরনের দুর্নীতি করে ও দায়িত্বহীনতার পরিচয় দেয় তাহাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি বিধান এবং আইন প্রয়োগে সব ধরনের পক্ষপাতহীনতা নিশ্চিত করিতে না পারিলে অচিরেই ঘোরতর তমসায় ছাইয়া যাইবে আমাদের ভবিষ্যত্। এই সার সত্যটিকে মাথায় রাখিয়া সংশ্লিষ্ট মহলের দায়িত্বশীল ব্যক্তি এবং দেশ পরিচালকেরা এখনই সোচ্চার হউন এবং নিজেদের আন্তরিকতা ও দেশপ্রেমের পরিচয় প্রদানের মাধ্যমে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিন।