আলোকপাত
জাতি কি শুনবে গার্মেন্টস কর্মীর আত্মকাহিনী
প্রফেসর ড. আবদুর রহমান খোকন
প্রকাশ : ২২ জুলাই ২০১৩, ২১:৩৭
আমি ফুলপুরের মৌসুমি। ময়মনসিংহ জেলার ফুলপুর উপজেলার গোদারিয়া গ্রামের হতদরিদ্র মোখলেসের মেয়ে আমি। গরিব বাবার মেয়ে হলেও বাবা-মার খুব আদরের ছিলাম। সকালবেলা সামান্য পানিভাত লবণ-মরিচ দিয়ে মা খেতে দিলেও আদরের সাথে লক্ষ্মী সোনা বলেই মা খাওয়াতেন। গ্রামের সরু রাস্তায়, মাঠে-ঘাটে সমবয়সীদের সাথে দৌড়াদৌড়ি করেই কাটিয়েছি কিশোরকাল। রৌদ্র, বৃষ্টি, সকাল-বিকাল-সন্ধ্যা সকল সময়েই ছিলাম একইরকম। পুকুর-খাল, কাদা-বালুতে মাখামাখি। ডাল আর সরিষা ক্ষেত কোনটাই বাদ পড়তো না আমার পায়ের ঝুনঝুনির শব্দ থেকে। বয়স বাড়ন্ত হলো, বুঝতে পারলাম বাবার সংসার চালাতে কষ্ট হচ্ছে। বাবা যেদিন ঠিকঠাকমতন সংসারের খাবার সংগ্রহ করতে পারতেন না সেদিন দেখতাম বাবা মুখ মলিন করে বসে আছেন। আর অভাগা মার দু’চোখ বেয়ে পানি বুক পর্যন্ত পৌঁছে যেত। একদিন সিদ্ধান্ত নিলাম ঢাকায় যাবো। কাজ করবো। সত্ভাবে রোজগার করার সিদ্ধন্ত নিলাম। ঢাকাতে আসলাম। কাজ নিলাম সাভারের রানা প্লাজার এক গার্মেন্টসে। ওভারটাইমসহ মাসে যা পেতাম খরচ মিটিয়ে বাড়িতে পরিবারের জন্য মাসে ১৫০০ টাকার মতন পাঠাতাম। রোজার ঈদ, কোরবানিতে কাপড়-চোপড়সহ বাড়তি কিছু টাকা দিতাম। বাবা, মা, ছোট ভাই-বোনদের মুখে সুন্দর হাসি দেখতাম। আমার বাড়িতে যাওয়ার খবরে পথ চেয়ে থাকতো বাবা, মা ও ভাই-বোনেরা। জড়িয়ে ধরতো। মা-বাবা পাশে দাঁড়িয়ে আনন্দ অশ্রুতে ভাসতো। গেল কোরবানিতে সকলের সাথে শেষ দেখা। কেন যেন বাবা-মা বারবার জানতে চেয়েছিলেন আমি আবার কবে আসবো? বাড়িতে আজ আমি এসেছি। কিন্তু আজ আমি কথা বলতে পারছি না। আমি আজ লাশ হয়ে এসেছি। পাঁচটি দিন ছিলাম আমি রড- সিমেন্টের ভারী ভারী চাপার মধ্যে। দীর্ঘ চারটি দিন আমি বাঁচার আশায় ভীষণ কষ্টে শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছিলাম। চাপা পড়ায় আমার দুই হাত ও দুই পা ভেঙ্গে বাঁকা হয়ে গিয়েছিল। বুকের ভিতর পড়েছিল মাঝারি আকারের ভাংগা ভিম। আমার চারপাশ থেকে আসছিল করুণ আর্তনাদের ধ্বনি। তিনদিন পরে এক উদ্ধারকর্মী আমাকে খাবার পানি দিয়েছিলেন। শিকাগো শহরের শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন, বাঙালির অধিকার আদায়ের আন্দোলন কী ব্যর্থ? পু্ঁজিবাদী অর্থনীতির নগ্নতা আমার এই অবস্থার জন্য দায়ী। রানাদের মতন বিবেকহীন অর্থ পিপাশু পেশিশক্তির মালিকরা আমার মৃত্যুর জন্য দায়ী। ওরা তো শুধু আমাকেই হত্যা করে নাই, ওরা হত্যা করেছে আমার শত শত ভাই-বোনকে। ওরা হত্যা করেছে শত শত পরিবারের সোনালী স্বপ্নকে। ওরা শুধু আমাদের হত্যাকারী নয়, ওরা দেশ, জাতি, মানবতার শত্রু। ওদের উপস্থিতি খেটে খাওয়া শ্রমিক শ্রেণির জন্য বিপজ্জনক। মানবসভ্যতার বিকাশের ইতিহাসে আমরা শ্রমিক শ্রেণি যে অবদান রেখেছি তা আর একবার বিশ্ববাসীকে স্মরণ করতে বলবো। সাথে সাথে দুনিয়ার মজদুরকে বলবো— “দুনিয়ার মজদুর ভাইসব, আজ এক মিছিলে দাঁড়া”। সব ভেদাভেদ ভুলে মজলুম মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াই-সংগ্রামে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান জানাচ্ছি। মানুষের জীবন নিয়ে ধরণীর বুকে আর যেন কোন শক্তি খেলা খেলতে না পারে। যেন অর্থপিপাসুরা নতুন করে মানবতাকে উপহাস করতে না পারে। তোমরা সেই কাজ করো। আর যেন কোন মৌসুমীর ছিন্নভিন্ন লাশের পাশে দাঁড়িয়ে মা-বাবার বুক থাবড়াতে না হয়। সাভারের রানা সাহেবদের বলি তোমাদের পাপ কর্মে ধরণী কাঁপছে থরথর করে। মাটি তোমাদের গ্রাস করবেই। সাবধান হও। লোভের লাগাম টেনে ধরো। রানা সাহেবরা মনে রাখবেন সীমা লংঘনকারীকে স্রষ্টা ক্ষমা করেন না। রানা সাহেব মনে রাখবেন মেহনতি শ্রমিকরা আপনাদের সাহেব বানায়। কিন্তু আপনাদের কুকর্মে বাতাস ভারী হয়ে গেছে। বাতাস আর লাশের ভার বইতে পারছে না। রানা সাহেবদের পদভারে মাটি আজ ফেটে যাচ্ছে। হে মাটি, হে মা মৌসুমীরা চিরকাল আছে তোমাদের সাথে। থাকবে চিরদিন।
লেখক : অর্থনীতিবিদ, চেয়ারম্যান, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ ও এগ্রিবিজনেস বিভাগ, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা