কোথায়
মিলবে
পেস
বোলার?
প্রকাশ : ২২ জুলাই ২০১৩, ২২:২১
বব উইলিস, ক্রিস ওল্ডরা আশির দশকেই বিদায় নিয়েছিলেন। নব্বইয়ের শুরুর দিকে ইয়ান বোথামও অবসর নিয়ে ফেলার পর ইংল্যান্ড পেস বোলিং নিয়ে পড়েছিল মহা বিপদে। প্রতিপক্ষের ব্যাটসম্যানদের ওপর প্রভাব ফেলার মতো পেসার কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছিল না। সেই সময়ে এক ইংলিশ ক্রিকেট ভক্ত নিজের গরজে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন—
আপনার উচ্চতা কী ছয় ফুটের আশেপাশে? জোরে ঢিল ছুঁড়তে পারেন? তাহলে ইংল্যান্ড জাতীয় দল আপনাকে খুঁজছে!
বাংলাদেশের অবস্থাও ওই নব্বই দশকের ইংল্যান্ডের মতো বলতে পারেন। পার্থক্য একটাই—বাংলাদেশ কোনো কালেই উইলিস বা বোথাম পায়নি ক্রিকেটে! পেস বোলার নিয়ে বাংলাদেশের হাহাকারটা নির্দিষ্ট কোনো একটা সময়ের গল্প নয়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে যাত্রা শুরুর পর থেকে এটাই বাংলাদেশের সবচেয়ে নিয়মিত প্রশ্ন—কবে বলার মতো কয়েকজন পেস বোলার খুঁজে পাবে বাংলাদেশ?
সেই খেলোয়াড়ী জীবন থেকে এই প্রশ্নের সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে আকরাম খানকে। অধিনায়ক হিসেবে, নির্বাচক হিসেবে বাংলাদেশে স্থায়ী হতে পারার মতো আন্তর্জাতিক মানের পেস বোলারের সংকট নিয়েই চলতে হয়েছে তাকে। আর এই পথ চলতে গিয়ে একটা সমাধান তিনি ও তার নির্বাচক কমিটি পরিকল্পনা করেছিলেন—একটা পূর্ণাঙ্গ পেস বোলিং অ্যাকাডেমি করা। সেজন্য কাজও শুরু করেছিলেন আকরাম খানরা। কিন্তু সে স্বপ্ন এখনও পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। এখনও তাই হা হুতাশ ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। এই হা হুতাশের শুরু বাংলাদেশের শুরুর সময় থেকেই।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশ যখন হাটি হাটি পা করছে, তখনই দেশের সর্বকালের অন্যতম সেরা পেসার বলে আলোচিত গোলাম নওশের প্রিন্স, জাহাঙ্গীর শাহ বাদশাহরা ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছেন। এরপর মাশরাফি বিন মুর্তজার মতো অমিত প্রতিভাধর পেসার বাংলাদেশ পেয়েছে। পেয়েছে তালহা জুবায়ের, শাহাদাত হোসেনের মতো সম্ভাবনাময় পেসার। পেয়েছে সৈয়দ রাসেল, হাসিবুল হোসেন শান্তর মতো পরিশ্রমী পেসার। পরিসংখ্যান বলছে সেই ১৯৮৬ সালের শুরুর পর থেকে বাংলাদেশ ২৭৩টি ওয়ানডে ম্যাচে ৪০ জন পেস বোলার খেলিয়েছে। ২০০০ সালে শুরু করার পর ৭৯টি টেস্টে বাংলাদেশের হয়ে বল করেছেন ২৩ জন পেসার।
কিন্তু সমস্যা হল এই ঝাকে ঝাকে পেস বোলারদের মধ্যে কেউই সেভাবে স্থায়ী হতে পারেননি। সবচেয়ে বেশি যিনি স্থায়ী হয়েছেন, তার নাম মাশরাফি বিন মুর্তজা। কিন্তু মাশরাফি আবার কখনোই নিচের সেরাটাকে বেশিদিন একটানা উপহার দিতে পারলেন না ইনজুরির একের পর এক ছোবলে। এমন করে ইনজুরির কাছে পরাস্ত হওয়া পেস বোলারের সংখ্যাও কম নয়। কখনো ইনজুরি, কখনো ফর্মহীনতা, কখনো হঠাত্ হারিয়ে যাওয়া মিলিয়ে ব্যাপার একটাই—পেস বোলিং সংকট আর কাটছে না।
এ অবস্থায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) করণীয় ছিল একটাই—পেস বোলার তৈরির জন্য বিশেষ কর্মসূচি হাতে নেয়া। এ ক্ষেত্রে বিসিবি বলার মতো দু’টি কাজ করেছে। প্রথম সেই গোড়ার দিকে কিছু সম্ভাবনাময় তরুণ পেসারকে তারা ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার পেস বোলিং অ্যাকাডেমিতে পাঠিয়েছে। এখন সে কর্মসূচিও আর নেই। এরপর মূলত একটি মোবাইল ফোন অপারেটর প্রতিষ্ঠানের আয়োজনে দু’বার বাংলাদেশে পেসার হান্ট হয়েছে। সেখান থেকে রুবেল হোসেন ছাড়া আর কাউকেই খুঁজে পায়নি বাংলাদেশের ক্রিকেট।
আর এই জায়গাটাতেই পরিষ্কার এগিয়ে গিয়েছিল আকরাম খানদের প্রকল্পটা। বিসিবির সবুজ সংকেত পেয়ে তারা মাঠেও নেমে পড়েছিলেন। বয়সভিত্তিক বিভিন্ন টুর্নামেন্ট ও স্কুল ক্রিকেটে নিজেরা গিয়ে বা অন্য সাবেক খেলোয়াড়দের সহায়তা নিয়ে খুঁজে বের করেছিলেন সম্ভাবনাময় জনা বিশেক পেস বোলারকে। তাদের পরিকল্পনা ছিল, এদের নিয়েই যাত্রা শুরু করবে বাংলাদেশের পূর্ণাঙ্গ পেস বোলিং অ্যাকাডেমি, ‘পেস বোলারদের তৈরি করে নিতে চাইলে ১৭-১৮ বছরের কম বয়সী ক্রিকেটারদের নিয়েই কাজ করতে হবে। আমরা সেরকম জনা বিশেককে খুঁজেও পেয়েছিলাম। আমাদের পরিকল্পনাটা ছিল, ওদের নিয়ে আবাসিক একটা সারাবছর ধরে চলা পূর্ণাঙ্গ অ্যাকাডেমি করা। এদের পড়াশোনার দায়িত্বটাও নিতে হত আমাদের। সবাই ক্রিকেটার হতে পারবে, এটা তো নিশ্চিত করা যায় না। তাই পড়াশোনাটাও আমাদের তত্ত্বাবধায়নে হবে, এমন পরিকল্পনা ছিল। এর ভেতর থেকে কেউ কেউ যোগ্য হলে আমরা হয়তো বিকেএসপিতে ভর্তি করে দেয়ার চেষ্টা করতাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দাঁড়ালো না প্রকল্পটা।’
প্রকল্পটা নিয়ে অনেক স্বপ্নই দেখেছিলেন আসলে আকরামরা। আলাদা ভবন, আলাদা অনুশীলনের জায়গা, দেশের একটা-দুটো মাঠকে এরকম পেস বোলারদের সহায়ক উইকেটে সাজিয়ে ফেলা; এমন সব পরিকল্পনা ছিল তাদের।
কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ভেসে গেছে সব পরিকল্পনা। এখন সেই পরিকল্পনা বুকের ভেতর নিয়ে ঘুরে বেড়ান আকরাম খান। তবে আকরাম খান স্বপ্ন দেখেন, এই অ্যাকাডেমির পরিকল্পনা একদিন বাস্তবে রূপ নেবেই, ‘আমি যে বোর্ড পরিচালক হতে চাই, তার মূলে এরকম কিছু স্বপ্ন আছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, একদিন এই স্বপ্নগুলো বাস্তবে পরিণত হবেই।’
আবার ইংল্যান্ডের গল্প দিয়ে শেষ করা যাক। সেই খ্যাপাটে ভক্তের বিজ্ঞাপনে কোনো কাজ হোক আর নাই হোক, ইংল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ডের দারুণ চেষ্টার ফল আমরা এখন চোখের সামনে দেখছি। গত এক দেড় দশকে ইংল্যান্ড অ্যান্ড্রু ফ্লিনটফ, জেমস অ্যান্ডারসন, স্টিভ হার্মিসনের মতো পেসার পেয়েছে।
এখন দেখার বিষয় আকরাম খানের স্বপ্নের ফলে আমরা কোনো ফ্লিনটফ খুঁজে পাই কি না!