পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাওয়া প্রাণী

পৃথিবীতে হাজারো রকমের পশু-পাখি আছে। অনেক প্রাণী আছে যারা কোন এক সময় আমাদের এই পৃথিবীর অধিবাসী ছিল। পৃথিবীর পরিবেশ ও আবহওয়া পরিবর্তনের কারণে এবং পশু শিকারের খেসারত দিতে সতেরো থেকে বিংশ শতাব্দীর মধ্যে এদের অনেককে এই পৃথিবী থেকে চিরতরে বিদায় নিতে হয়। চলো হারিয়ে যাওয়া সে সকল কয়েকটি প্রাণী গল্প শোনাই আজ তোমাদের। গত সংখ্যার পরে আজ থাকছে তার দ্বিতীয় কিস্তি। ক্যাপ লায়ন : ২৫০ কেজি ওজনের বিশাল দেহের এই সিংহের আবাসভূমি ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চল কাররো এর তৃণভূমি এলাকায়। ইউরোপীয়দের দক্ষিণ আফ্রিকায় উপনিবেশ শুরুর সাথে সাথে এই প্রাণীটির নির্মূল কার্য শুরু হয়ে যায়। উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকেই নির্বিচারে ক্যাপ লায়ন বধ করা শুরু হয় এবং ১৮৬০ সালে এসে পৃথিবী থেকে এই প্রাণীটিকে সম্পূর্ণ নিচিহ্ন করতে সমর্থ হয়। ১৮৬৫ সালে সর্বশেষ ক্যাপ লায়নটি হত্যা করার মধ্য দিয়ে ক্যাপ লায়ন বিলুপ্ত করার পর্বটি শেষ হয়। মহান কাঠকুড়ালি/ কাঠঠোকরা পাখি : পৃথিবীর সুন্দর পাখীদের মধ্যে অন্যতম সুন্দর এই পাখির বসবাস ছিল মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ বনাঞ্চল এলাকায়। বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে নাটকীয়ভাবে এই পাখি বিলুপ্ত হতে থাকে। বিশ্বের আবহওয়া ও পরিবেশ পরিবর্তনের পাশাপাশি মানুষ কর্তৃক গাছগাছালি কেটে বনাঞ্চল উজার এবং অবৈধভাবে শিকার করাটাই এই পাখীর বিলুপ্ত হবার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ১৯৫৭ সালে এই প্রজাতির সর্বশেষ পাখিটি গোচরীভূত হয়। কোয়াগা : ১৮৭০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার অধিবাসী জেব্রা প্রজাতির এই প্রাণীর সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্তি ঘটে। জেব্রাদের মতই এই প্রাণীটির মুখে, ঘাড়ে সাদা ডোরাকাটা দাগ এবং ঘাড়ে কেশর ছিল। এদের পেটের ও পায়ের চামড়ার রং ছিল সম্পূর্ণরূপে সাদা। উনবিংশ শতাব্দিতে ডাচ উপনিবেশীয়রা মাংস ও চামড়ার লোভে এই বন্যপ্রাণীদের নির্বিচারে হত্যা করে এবং ১৮৮৩ সালে ১২ আগস্ট বেঁচে থাকা সর্বশেষ কোয়াগার মৃত্যুর ভেতর দিয়ে এই প্রজাতির প্রাণীর বিলুপ্তি ঘটে। আলকা /দানব পেঙগুইন : এই প্রাণীটি আক গোত্রের পাখিদের মধ্যে সর্ববৃহত্ পাখি।আবার অনেকেই পাখিকে ‘ইম্পেরিয়াল এলাকাইন’ বা ‘দানব পেঙগুইন’ বলে জানত। রোমান অমলে আটলান্টিক মহাসাগরের উপকূলবর্তী দেশ ফ্লোরিডা থেকে গ্রীনল্যান্ডসহ আইসল্যান্ড, স্ক্যানডিনাভিয়া, পশ্চিম ইউরোপের উপকূল এলাকায় এদেরকে সচরাচর দেখা যেত। সাধারণত একটি পূর্ণ বয়স্ক আলকা উচ্চতায় ১ মিটার পর্যন্ত হত। ১৮৪৪ সালের ২ জুন আইসল্যান্ডে এই প্রজাতির একটি জুটিকে শেষ বারের মত দেখা যায়। বালী টাইগার : ব্যাঘ্র প্রজাতির মধ্যে বালী টাইগার ছিল আকারে সর্বাপেক্ষা ছোট এবং দেখতে অনেকটা জাগুয়ারের মত। ইন্দোনেশিয়ার বালী দ্বীপে এই প্রাণীটির পদচারণা ছিল। শিকার করার নামে এদেরকে নির্বিচারে হত্যা করা হলে ১৯৩৭ সালে এরা পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়। নিউজিল্যান্ডের পেঁচা : পেঁচা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত এই প্রাণীটি স্থানীয় ভাষায় ‘ওইকাউ ইন মাউরি’ বলে পরিচিত ছিল। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে অর্থাত্ ১৯১৪ সালের দিকে এই প্রাণীটি বিলোপ হতে থাকে। আবহওয়া ও পরিবেশের পরিবর্তন এবং খাদ্যের অপ্রতুলতা এই প্রাণীটির বিলুপ্ত হওয়ার প্রধান কারণ হিসাবে ধরা হয়েছে। টাইগার অফ জাভা : ব্যাঘ্র পরিবারের অন্তর্ভুক্ত এই প্রাণীটিকে ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপে দেখা যেত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে বার্লিন এবং রোটারড্যাম—এর চিড়িয়াখানায় বেশ কয়েকটি জাভান টাইগারকে দেখা গেলেও পরে এদের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায় নাই। অবশেষে ১৯৭৯ সালে টাইগার অফ জাভাকে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। জাপানিজ নেকড়ে : বিলুপ্ত হওয়া এই প্রাণীর বসবাস ছিল জাপানের দ্বীপপুঞ্জ হনসু , কাইউসু এবং সিকোকু এলাকায়। ১৭৩২ সালে এলাকাবাসীদের ক্রোধ ও রোষানলে পড়ে এই নেকড়েগুলোর মৃত্যু ঘটে। ১৯০৫ সালে শেষ বারের মত এই প্রাণীটিকে দেখা যায়। বেইজী ডলফিন : ১৯৭৯ সালে চীন কর্তৃপক্ষ নদীতে বসবাসকারী বেইজী ডলফিনকে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার বিপদ সংকেত ঘোষণা দেয় এবং ১৯৮৩ সালে আইন করে এই প্রাণী শিকার নিষিদ্ধ করা হয়। এরপর কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী ১৯৮৬ সাল থেকে ১৯৯০ সাল অবধি এই মাছটির সংখ্যা ৩০০ থেকে ২০০ তে নেমে আসে। পরবর্তিতে সে দেশের নদীগুলোর মুখে ৩টি বৃহত্ বাঁধ নির্মান করা হলে পরিবেশ পরিবর্তনের কারণে বেইজী ডলফিনের অস্তিত্ব সংকটে পরে যায় এবং এক সময় এই সংখ্যা দ্রুত নীচে নেমে এসে ৭ এ পৌঁছায়। চীনা বিজ্ঞানীরা এই প্রাণীর অস্তিত্ব রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিলেও এদের সন্ধান লাভে ব্যর্থ হয় তারা। অবশেষে ২০০৬ সালে চীন সরকার সরকারীভাবে এই প্রাণীর বিলুপ্তি ঘোষণা করে। সমবুর্গস হরিণ : থাইল্যান্ডের জলময় তৃণভূমি এলাকায় এই প্রাণী কে দলবেধে গাছের গাছের ফল, গুল্ম, লতাপাতা আহার করতে দেখা যেত। কিন্তু এদেরকে কখনই গহীন বনাঞ্চলে প্রবেশ করতে দেখা যেত না । উনবিংশ শতাব্দির মাঝামাঝি সেখানে প্রচুর ধান উত্পন্ন করার লক্ষে বিশাল জলময় জমিগুলো কৃষিকার্যের আওতায় নিয়ে আসা হলে পরিবেশ পরিবর্তনের কারণে হরিণদের অস্তিত্ব বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে। অবশেষে ১৯৩২ সালে এই সমবুর্গস হরিণ পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়।