আমার কথা

ছোটবোন হেনার লাগানো শিউলি ফুলের সাদা, হলুদ ফুলগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, বাড়ির ওঠোনের এক কোণায়, শরত্ হেমন্তকালের দুর্বাঘাসের শিশির, ভোরের খেজুর গাছের খেজুরের রস নিয়ে গেছে আমাদের দোহারপাড়ার তাহের গাছি, এক ঝাঁক শালিক এ গাছে ও গাছে গিয়ে খেজুরের রস মনের আনন্দে খাচ্ছে দেখে আমারও একদিন ইচ্ছে জেগেছিলো, আমি তাহের গাছি হবো, হাড়ি ভর্তি খেজুর রস গাছ থেকে পেড়ে রস এবং লোইগুড়-পাঠালীগুড় বানাবো, সেই খেজুর গাছের ডাল দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে যখন ঘন, সাদা রং ধারণ করবে, তখনই মায়ের ঘর থেকে পরিষ্কার শুকনো একটি শাড়ি এনে উঠোনে বিছিয়ে দিয়ে -তারই উপরে সেই গরম লাল টকটকে ঘন রসগুলো লম্বা করে ঢেলে দেবো, যেভাবে তাহের গাছি দেন, আমিও তাই দেবো, তারপর আমাদের দোহারপাড়ার যারা যারা কিনবেন ১নং পাটালী গুড় ২ টাকা সের, পাবনা বাজারে গেলে ৩ টাকা সের চাই বিক্রি করবো আড়াই টাকায়। তাহের গাছি চাচার কথা শুনে, এবং ২-টাকা ৩ টাকা, তখনকার দিনে, আমাদের মতো ক্লাস থ্রি-ফোরে পড়া ছাত্র-ছাত্রীদের কল্পনার বাইরে ছিলো, অতোগুলো টাকার স্বপ্নই আমাকে বিভোর করে রাখতো, আমাকে একদিন তাহের গাছির মতো গাছিই হতে হবে। এমনিতরো ছিলো আমার শৈশব-কৈশোরের সেই আদ্যিকাল। ছিলো বাড়ির পূব দিকে আমাদের বাঁশঝাড়। আম-কাঁঠালের বাগান, আমলকী, বেল, পেয়ারা, জাম, করমচা, লেবু, বাতাবি লেবু, গাবগাছ! বাড়ির বাইরের সেই জামরুল গাছটি এখনো আছে, পানির কলের কাছে, কাচারী ঘরের পূর্বদিকে, রয়েনউদ্দিন মোল্লার বাঁশবাগান, বিঘার উপরে বিঘা, তার ভেতরে শেয়ালের, সাপের, নেউলের বাস, বাঁশ বাগানের ভেতর আম-কাঁঠালের গাছ, সেই গাছের মগডালে বকদের আস্তানা, তেঁতুল গাছের ঝোপের আড়ালে অলস দুপুরে ঘুঘু ডাকে সেই বাঁশ বাগানের মাথার উপরে। যখন চাঁদ ওঠে মনে হতো, পৃথিবীর সবচাইতে সুন্দর স্থানটি হচ্ছে আমাদের এই দোহারপাড়া। এই দোহারপাড়াতেই আমার জন্ম ১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর। মায়ের নাম রহিমা খাতুন, বাবার নাম মোহাম্মদ হাশিমউদ্দিন শেখ। আমাদের বাড়ির ঠিক পেছনেই শানবাঁধানো বিশাল বিশাল তিন ঘাট, একটি পুকুরের উত্তরে, একটি পশ্চিমে, অপরটি দক্ষিণে। সেই দক্ষিণেই আছে/ছিলো প্রমত্তা পদ্মা নদী, তারই শাখানদী ছিলো ইছামতি। ইছামতিকে খেয়ে ফেলেছে পাবনা শহরের দক্ষিণের চর তারাশুরের চার কোষাখালীর এবং সুকরোর চরের জনগণ। ইছামতী নদীতে প্রতিবছর দুর্গাপূজার সময় হরিশ ঘোষের পূজামন্ডপ থেকে কালাচাঁদপাড়ার কে.পি. ইউনিয়ন থেকে রাধানগরের মজুমদারদের বাড়ি থেকে, শালগাড়িয়া, লাহিড়ীপাড়া, গোপালপুর, এমনকি গেঞ্জী ব্যবসায়ী ফনি দত্তদের বাড়ি থেকে ট্রাকে করে নিয়ে আসা দুর্গা ঠাকুরকে মিশন হাউসের সামনে দিয়ে দক্ষিণের ঘোষপাড়ার ভেতর দিয়ে —“দুর্গ্গা মাই কি জয়” বলতে চলতে আমাদের সহপাঠীরা, তাদের স্বজনেরা প্রতিবেশীরা মা দুর্গাকে বিসর্জন দিতেন ইছামতী নদীতে। ভাদ্র-আশ্বিনের বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় সেই ইছামতী নেই, তবে সেকালে পাবনা শহরের অনাচে-কানাচে যেভাবে প্রতিমা গড়া হতো, একালে ঠিক ততোটি হয় না। ১৯৬৪ সালে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা, ১৯৬৬ সালে পাকভারত যুদ্ধ, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে হিন্দু সম্প্রদায়ের ধনী শ্রেণী পাড়ি দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে। ইছামতী নদীকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ একটি কবিতা লিখেছিলেন, ওকে নিয়ে ভাবতে গেলে কষ্ট পাই, বর্ষার আরম্ভেই পুরো আরিসপুরের দক্ষিণ দিকের টুকরোরচর সংলগ্ন বসতবাড়ি তলিয়ে যেতো। যেতাম আমার মামাতভাই মোগল ভাইয়ের সাথে নৌকায় চড়তে। তার মামাদের বাড়ির ঐ আরিসপুরেই সারাদিন নৌকায় চড়ে ইচ্ছেমতো ইছামতী নদীতে গোসল করে চোখ দুটো লাল টকটকে করে আমাদের দোহারপাড়ায় ফেরার সময়, মোগল ভাইয়ের নানীমা কখনো দিতেন জালি শসা, যার নাভিমূল থেকে হলুদ ফুলটুক তখনো ঝরে যায়নি, কোনদিন বাতাবি লেবু- নিজের গাছের ভাদ্র মাসের গাছপাকা দু’চারটে তাল, মা ভীষণ খুশী হতেন, যেহেতু আমাদের বাগানে সব প্রজাতির গাছ থাকলেও ছিলো না একপায়ে দাঁড়ানো দীর্ঘদেহী রবীঠাকুরের সেই তালগাছ। সেই সময়ের বেশ কিছুদিন আগে হয়তোবা বছর দুয়েক আগে থেকে আমাদের দোহারপাড়ার বাড়িতে দুটি শিশু পত্রিকা, ঢাকা থেকে পাঠাতেন সরদার জয়েনউদ্দিন (১) শাহীন (২) সিজরা, সম্ভবত সেটি ১৯৫৭-৫৮। সরদার জয়েনউদ্দিন, আর আবদুল গনি হাজারী ছিলেন আমাদের ছোট কাকা আবুল কাশেম আবু সাঈদের কলিকাতা জীবনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। দুই দেশে ভাগ হবার পরে ঢাকায় এলেও ছোটকাকা পাবনাতেই ভূমি অফিসে চাকরি নিলেও বন্ধুত্ব আমৃত্যু অটুট ছিলো ৩ জনারই। সরদার সাহেব তার সম্পাদিত (১) শাহীন (২) সিতারা নিয়মিত পাঠানোর কিছুদিন গরে, ১৯৫৯ সালে আমাদের অগ্রজ কবি, নাট্যকার, অধ্যাপক, নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা, জিয়া হায়দার পাকিস্তান অবজারভার গ্রুপের সাপ্তাহিক পত্রিকা পল্লীবার্তায় চাকরি পাবার সুবাদে তিনি সাপ্তাহিক পল্লীবার্তা পাঠাতেন দোহারপাড়ায়। পল্লীবার্তায় চাকরি দিয়েছিলেন আবদুল গনি হাজারী। সেই পল্লীবার্তা একদিন বন্ধ করে দিয়ে নতুন নামে যে পত্রিকাটি অবজারভার গ্রুপ বাজারে ছাড়লেন সেটির নাম পূর্বদেশ। ৬০ এর দশকে। সাপ্তাহিক পূর্বদেশের চাঁদের হাটের পিউ আপা ছিলেন (লায়লা সামাদ), অপরদিকে দৈনিক ইত্তেফাকের কচি-কাঁচার আসর চালাতেন আমাদের সকলের শ্রদ্ধেয় দাদা ভাই (রোকনুজ্জামান খান)। সাপ্তাহিক পূর্বদেশে ১৯৬৩-৬৪ সালে গল্প, কবিতা এবং দাদাভাইয়ের কচি-কাঁচার একটি বার্ষিক সংখ্যায় সম্ভব ১৯৬৭-৬৮ সালে ছাপা হয়েছিলো। আমি লেখাপড়া যেটুকু শিখেছিলাম, অগ্রজদের দেখাদেখি, পরবর্তীতে দাউদ হায়দার, জাহিদ হায়দার, আবিদ হায়দার, আরিফ হায়দার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলা বিভাগের প্রভাষক, দাউদ, বার্লিনে- জাহিদ, কখনো দেশের ভেতরে, কখনো বাহিরে। আর আমি এখন বেকার। অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী। লেখা-পড়া-লেখা দেশে-বিদেশে। ১৯৮০ সালে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থায় জনসংযোগ নির্বাহীর চাকরি দিয়েছিলেন সাবেক সচিব মোহাম্মদ সিরাজুদ্দিন আর গতবছর টাঙ্গাইল সাহিত্য পরিষদের পক্ষ থেকে কবি বুলবুল খান মাহবুব - প্রদত্ত অরণি সাহিত্য পুরস্কার ২০১২- এই আমার সাহিত্য স্বীকৃতি। কবি মাহমুদ কামাল জানতে চেয়েছিলেন, ইতিপূর্বে পুরস্কৃত হয়েছি কিনা?- জানিয়েছিলাম, অর্থের বিনিময়ে করতে চেয়েছিল অনেক প্রতিষ্ঠান। আমি পাবনার পাগল, দোহারপড়ার রোকন সম্মত হয়নি, নীতি বিসর্জন দিয়ে। যেমন হননি আমার অগ্রজেরা। ১৯৬৩-৬৪ সাল থেকে নিয়মিত শিশুদের পাতায় লিখতাম, অগ্রজ জিয়া হায়দার একদিন জানালেন, শিশুদের পাতায় যেমন লিখবি, তেমনি বড়োদের পাতায়ও লিখবি। অগ্রজের কথায়, এখন যা পারি- তবে দেশ স্বাধীন হবার পারে, বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত ধান শালিকের দেশে অনেকগুলো ছড়া নিয়মিত ভাবেই প্রকাশিত হয়েছিলো, এখনো হচ্ছে। যেমন হচ্ছে ইত্তেফাকের শিশুদের পাতা কচি-কাঁচার আসরে।