সামাজিক ব্যবসা এবং প্রাসঙ্গিক কিছু কথা
প্রকাশ : ২৩ জুলাই ২০১৩, ২১:২০
এশিয়ার সবচেয়ে বড় এবং পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম খুচরা পোশাক বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান জাপানের ফার্স্ট রিটেইলিং কোম্পানির বিশ্বখ্যাত জনপ্রিয় ফ্যাশন ব্র্যান্ড ইউনিক্লোর পোশাক এখন আমরা বাংলাদেশেই পেতে যাচ্ছি। সামাজিক ব্যবসার উদ্দেশ্যে আসা এই কোম্পানির সমস্ত পোশাকই তৈরি করবেন আমাদের গ্রামের দরিদ্র জনগোষ্ঠী। মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে ক্যাজুয়াল পোশাকের চাহিদাকে বিবেচনায় নিয়েই ইউনিক্লো এখানে চার দশমিক ৬০ লাখ ডলার বিনিয়োগ করছে। জুলাই মাসে ঢাকায় শুরু করা তাদের দুইটি আউটলেটে ছেলেদের জন্য ৩২ ধরনের ও মেয়েদের জন্য ১০ ধরনের পোশাক বিক্রি করা হবে। এই পোশাকগুলো মূলত ৩৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য। জাপানি প্রযুক্তির মিশেলে তৈরি জীবাণুরোধী ও আরামদায়ক এই পোশাকগুলোর মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১৯৪ টাকা থেকে ১,১৯০ টাকার মধ্যে। বিশ্বে এক হাজার ২৫৪টি আউটলেটের অধিকারী ইউনিক্লোর উপমহাদেশে এটাই প্রথম আউটলেট। ২০১০ সালে ফার্স্ট রিটেইলিং কোম্পানি বাংলাদেশে সোশ্যাল বিজনেস প্রতিষ্ঠা করে। এরপর গ্রামীণ হেলথকেয়ার ট্রাস্টের যৌথ উদ্যোগে ইউনিক্লো ২০১১ সালে গ্রামীণ ইউনিক্লো লিমিটেড গঠন করে। গ্রামীণ ইউনিক্লোর সামাজিক ব্যবসায় ইউনিক্লোর অংশ ৯৯ শতাংশ আর গ্রামীণ হেলথকেয়ারের বাকি এক শতাংশ।
খুচরা বিক্রেতা হিসেবে পোশাকের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে প্রথম আসা এই কোম্পানির সস্তা পোশাক কি তবে দেশীয় ফ্যাশন হাউজগুলোর একচেটিয়া আধিপত্যে প্রভাব ফেলবে? ব্র্যান্ডের জন্য এতোদিন যেসব ভোক্তা অতি উচ্চ মূল্যে ক্যাটস আই, মেনজ ক্লাব, ট্রেন্ডজ প্রভৃতি থেকে তার পছন্দের শার্টটি বাছাই করতেন, এখন কি তবে সেই ভোক্তা শ্রেণি ইউনিক্লোর দিকে ঝুঁকবেন? কারণ ইউনিক্লোরও সারাবিশ্বে একই ব্র্যান্ড ইমেজ আছে। প্রশ্ন এসে যায়, ৯৯ শতাংশ বিনিয়োগ নিয়েও। দেশে এখনও কোনো সামাজিক ব্যবসার সুনির্দিষ্ট আইন নেই, সেক্ষেত্রে তাদের কোম্পানি আইনের অধীনেই দেশে বিনিয়োগ করতে হয়েছে। তবে কি এই আইনের ফাঁক গলেই সামাজিক ব্যবসার নামে দেশের একটা সিংহভাগ অর্থ বাইরে চলে যাবে?
সস্তায় গুণগতমান এবং ব্র্যান্ড ইমেজের নিশ্চয়তা
ইউনিক্লোর জনপ্রিয়তার কারণ
২০০৯ সালে ইউনিক্লোর জনপ্রিয়তা নিয়ে বেশ কিছু গবেষণা পরিচালিত হয়। জেনারেল কনজিউমার প্রিফারেন্স সার্ভেতে জাপানি ভোক্তাদের মাঝে ইউনিক্লোর শক্তিশালী জনপ্রিয়তার চিত্র দেখা যায়। বিজনেস মিডিয়া সার্ভেতে ইউনিক্লো নেতৃত্বস্থানীয় ক্যাজুয়াল শপের স্থান অধিকার করে। নিক্কেই (Nikkei) রিসার্চ ইন্সটিটিউট অফ ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড রেজিওনাল ইকোনোমি সার্ভেতে দেখা হয়, দেশের লাকশারি (বিলাসবহুল) ব্র্যান্ডের জনপ্রিয়তার ক্ষেত্রে ইউনিক্লোর অবস্থান দ্বিতীয়। অর্থনৈতিক মন্দার সময়েও বিশ্বের সমস্ত ইউনিক্লোর আউটলেটে বিক্রির হার সমান থাকে। দ্য বিজনেস অফ ফ্যাশন ম্যাগাজিন দেখেছে, একজন ভোক্তা কোনো খেয়ালের বশে ইউনিক্লোর পোশাক ক্রয় করেন না। তাঁরা ক্রয় করেন, কারণ এটা সমাজে তাঁদের স্টার্ন্ডাড বজায় রাখে এবং বর্তমান চাহিদা মেটায়।
নিউইয়র্কের জনপ্রিয় ফ্যাশন জার্নাল ওম্যান ওয়্যার ডেইলি (ডবি¬উ ডবি¬উ ডি) ইউনিক্লোকে ‘টপ পারফর্মার’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। তারা ভোক্তাদের মাঝে জরিপ চালিয়ে দেখেছে, নির্দিষ্টভাবে একজন ভোক্তার পছন্দ ‘সস্তা, কিন্তু হাল ফ্যাশনের সঙ্গে মানানসই’ পোশাক। ইউনিক্লোর বিজনেস পলিশিটাই এমন।
দেশীয় বাজার দর এবং ইউনিক্লোর মূল্য
নির্ধারণ দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে
ইন্সটিটিউট ফর গ্লে¬াবাল লেবার অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস সিএনএন-এর এক প্রতিবেদনে দেখিয়েছে, ডেনিম শার্ট তৈরিতে বাংলাদেশের মোট খরচ তিন দশমিক ৭২ মার্কিন ডলার (২৯০ টাকা)। কানাডার পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ওরুরেক গ্রুপ ২০১১ সালে আরেকটি হিসাবে দেখায়, একটি টি-শার্ট বাংলাদেশ থেকে তৈরি করতে মোট খরচ করে পাঁচ দশমিক ৬৭ ডলার। অথচ দেশীয় ফ্যাশন হাউজগুলোতে একটি শার্টের গড় মূল্যই এক হাজার টাকা। আবার একটি টি-শার্ট ৬০০ টাকার নিচে নেই। তৈরির খরচ এবং বিক্রির দামের এতোটা ফারাক চোখে পড়ার মতোই বটে! অথচ ইউনিক্লো দাবি করছে, আরামদায়ক ও গুণগত মানের দিক থেকে সর্বোচ্চ সেরা পোশাকটাই তারা বাজারে আনছে ১৯৪ টাকা থেকে ১,১৯০ টাকার মধ্যে। তথ্যটি বেশ বিস্ময়কর। তবে কি এবার দেশীয় ফ্যাশন হাউজগুলো প্রথমবারের মতো প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে যাচ্ছে কিংবা কিছুটা হলেও কি এগুলোর জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে?
বাংলাদেশে ইউনিক্লো এবং কিছু অসঙ্গতি
প্রথমেই যেমনটা বলা হয়েছে, দেশে এখনও কোনো সামাজিক ব্যবসা সংক্রান্ত আইন নেই। ফলে ইউনিক্লোকে দেশের বিদ্যমান কোম্পানি আইনের অধীনেই নিবন্ধিত হতে হয়েছে। সামাজিক খাতে ব্যবসা করতে হলে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে পুঁজিবাজারে যেতে হবে। কারণ বাংলাদেশে কোম্পানি আইন (কোম্পানিজ অ্যাক্ট ১৯৯৪) অনুযায়ী, স্ট্যাম্প অ্যাক্টের ১১, ১২ এবং ১৭ সেকশনের বিধান অনুসারে নিবন্ধিত কোম্পানির যে ুেকানো শেয়ার হস্তান্তরের জন্য শেয়ারের মোট বিক্রয়মূল্যের ওপর নির্ধারিত হারে রাজস্ব সরকারি কোষাগারে জমা করে মুদ্রণকৃত শেয়ার হস্তান্তর স্ট্যাম্প সরকারি টেজারি থেকে ক্রয় করার নিয়ম আছে। গ্রামীণ ইউনিক্লো-ও দেশের কোম্পানি আইনে গঠিত। অথচ তার পুঁজিবাজারে আসার ব্যাপারে স্পষ্ট কিছুই জানাইনি। ইউনিক্লো এমনকি ২০১১ সালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে নিবন্ধিত হলেও ২০১১-২০১২ অর্থবছরে ১০৯৭ টাকা ক্ষতি দেখিয়ে আয়কর বিবরণীও দাখিল করেনি। অথচ এনবিআর থেকে জানা যায়, আইন অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের করদাতা শণাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) থাকলেই তাকে আয়কর বিবরণী দাখিল করতে হবে। পরে নির্ধারণ করা হবে যে, ওই প্রতিষ্ঠানের আয় করমুক্ত কিনা।
বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানায়, বাংলাদেশে যে কোনো খাতে শতভাগ বিদেশি বিনিয়োগ গ্রহণ করা হয়। তবে হাইকোর্টের এক রায়ে বিদেশি শিপিং এজেন্সি, ফরোয়ার্ডিং, এয়ারলাইন্স জিএসএ, ইন্ডেন্টিং, ডিস্ট্রিবিউশন এবং ট্রাভেল এজেন্সি খাতে শতভাগ বিদেশি বিনিয়োগে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। একইসঙ্গে ওই রায়ে দেশি এবং বিদেশি উদ্যোক্তাদের যৌথ উদ্যোগে এসব কোম্পানি স্থাপনের সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে সেক্ষেত্রে দেশি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ ৫১ এবং বিদেশি বিনিয়োগ ৪৯ শতাংশ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু পোশাক বিক্রেতা হিসেবে ইউনিক্লো সেখানে দিব্যি ৯৯ শতাংশ বিনিয়োগ করেছেন। অথচ ভারত সরকার কোনো খাতেই একটি বিদেশি কোম্পানিকে ৪৯ শতাংশের বেশি বিনিয়োগের অনুমতি দেয় না। ন্যূনতম তিন লাখ মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করলে পাকিস্তান সরকার ১০ শতাংশ বিদেশি বিনিয়োগের অনুমতি দেয়। আর শ্রীলংকান সরকার একটি বিনিয়োগ প্রস্তাবে মাত্র ৪০ শতাংশ বিদেশি বিনিয়োগ করার অনুমতি দেয়।
সামাজিক ব্যবসা, ইউনিক্লো এবং রেভিনিউ প্রসঙ্গ
গেলো মাসে তাদের সংবাদ সম্মেলনে ইউনিক্লোর কার্যক্রমের ওপর প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে ইউনিক্লোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাদাহিরো ইয়ামাগুচি বলেন, আমরা ব্যবসার মাধ্যমে বাংলাদেশের দারিদ্র্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, লিঙ্গ বৈষম্য ও পরিবেশের মতো সামাজিক সমস্যগুলোকে দূর করতে চাই। এটা করা হবে সুন্দর ও বৈচিত্রময় পোশাকের নকশা করে, পোশাক তৈরি করে এবং সর্বোপরি তা বিক্রির সঙ্গে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে জড়ানোর মধ্য দিয়ে। এতে তাদের আয়ের একটি নতুন উত্স তৈরি হবে এবং তাদের জীবনমান উন্নত হবে। ইউনিক্লোর কর্মকর্তারা আরো জানান, মুনাফা তাদের সামাজিক ব্যবসার উদ্দেশ্য নয়।
ইউনিক্লোর টার্গেট ২০২০ সালের মধ্যে ৪০০০টি আউটলেট খোলার এবং এর মধ্যে চীনসহ দক্ষিণ এশিয়ায় ১০০০টি আউটলেট খোলা। কারণ ২০২০ সালের মধ্যে ইউনিক্লো সারাবিশ্বে পাঁচগুণ (quintuple) রেভিনিউ চায়। ২০১৩ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত তাদের রেভিনিউ আয় ১.০৬৯ ট্রিলিয়ন ইয়েন।
সস্তা শ্রম, গ্রামের দরিদ্র জনগোষ্ঠী আর ৩০ মিলিয়ন মধ্যবিত্তের এই দেশে ইউনিক্লোর স্বপ্ন পূরণের রাস্তাটা অনেক সহজ হয়ে গেলো বটে। যদিও সামাজিক ব্যবসার ধরন অনুযায়ী ইউনিক্লো মুনাফা দেশেই পুনর্বিনিয়োগ করবে, কিন্তু আইন অনুযায়ী শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করবে না। দেশ থেকে নিয়ে যাবে বিশাল অংকের রেভিনিউ। সস্তা নীতিতে শতভাগ গুণগত মানের নিশ্চয়তা দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই বড় একটা ভোক্তা শ্রেণি তৈরি করবে। আবার গ্রামের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে ইউনিক্লো সদস্য করে তাদের কর্মসংস্থানের মাধ্যমে সদস্যপদের অর্থ, ফান্ড সংগ্রহের মাধ্যমে রেভিনিউ আয়টাও ত্বরান্বিত হবে। বিশ্বায়নের এই অবাধ যুগে ব্যবসা এখন অনেক উন্মুক্ত। আর কোটি কোটি টাকার ফ্যাশন বিশ্বে বিনিয়োগ সকলের কাছেই লোভনীয় একটা ক্ষেত্র। এখানে এখন সরকারের নজরটাই কাম্য। দেশীয় পোশাকে ভ্যাট, শোরুম ভাড়ার ওপর ভ্যাট, অগ্রিম আয়কর প্রভৃতি দিয়ে জর্জরিত ফ্যাশন হাউজগুলোর জন্য এখন আলাদা নীতিমালা তৈরি করার সময় এসেছে। সঙ্গে ফ্যাশন হাউজগুলোকেও তাদের পোশাকের মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়াকে পুনর্বিবেচনা করতে হবে। কারণ শুধুমাত্র ব্র্যান্ড ইমেজ দিয়ে বাজারে টিকে থাকার যুগ অনেক পুরোনো হয়ে গেছে। সস্তায়ও এখন ব্র্যান্ড ইমেজসহ একই পণ্য বাজারে চলে আসছে। আবার দেশের শিল্প রক্ষায় সামাজিক ব্যবসাকে একটা নির্দিষ্ট আইনের আওতায় নিয়ে আসার ব্যাপারেও সরকারকে সজাগ হতে হবে।
ঢাকা