পঙ্গু হাসপাতালের চিকিত্সক পরিচয়ে ২০ বছর ধরে প্র্যাকটিস
প্রকাশ : ২৩ জুলাই ২০১৩, ২৩:২৬
রাজধানীর আগারগাঁও। পঙ্গু হাসপাতালের কাছ থেকে একটু দূরে মরিয়ম অর্থপেডিক্স এন্ড জেনারেল হাসপাতাল। হাসপাতালের প্রধান চিকিত্সক ‘প্রফেসর’ আকরাম হোসেন। নিজেকে পঙ্গু হাসপাতালের চিকিত্সক হিসেবে পরিচয় দেন। নামের পাশে দেশি বিদেশি অনেক ডিগ্রি। প্রতিদিন প্রচুর রোগী আসে এই প্রফেসর আকরামের কাছে। তিনি আবার তাদের অপারেশনও করেন। এভাবেই কেটে গেছে বিশ বিশটি বছর। কত শত রোগীকে যে তিনি অপারেশন করেছেন তার হিসাব নেই। বিধি বাম। তার দীর্ঘদিনের প্র্যাকটিস নষ্ট করে দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। বেরিয়ে এসেছে তিনি অর্থপেডিক্স চিকিত্সক তো দূরের কথা কোনরকমে টেনেটুনে মেট্রিক পাস করেছেন।
গতকাল মঙ্গলবার র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এইচএম আনোয়ার পাশার নেতৃত্বে একটি টিম হানা দেয় তার হাসপাতালে। ঠাকুরগাঁও থেকে আসা দুলাল নামে এক রোগীর অপারেশন করা হাতের সেলাই কাটছিলেন তিনি। মোবাইল কোর্ট তাকে আটক করে দুই বছরের কারাদণ্ড দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে।
দুলাল মোবাইল কোর্টকে জানান, ঠাকুরগাঁও সরকারি হাসপাতাল থেকে চিকিত্সকরা তার হাতের চিকিত্সার জন্য ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে পাঠিয়েছিল। হাসপাতালের গেটে আসার পর কয়েক জন লোক তাকে বলে, এখানে ভালো চিকিত্সা হয় না। চিকিত্সক থাকে না। এখানে চিকিত্সা করালে চিরতরে হারাতে হবে হাত। আমাদের সঙ্গে আসেন, আপনাকে নিয়ে যাব অর্থপেডিক্সের একজন নামকরা প্রফেসরের কাছে। দালালরা তাকে নিয়ে যায় আকরাম হোসেনর কাছে।
দালালদের এসব কথা শুনে দুলাল বুঝতে পারছিলেন না কি করবেন। চলে যান ওই হাসপাতালে। এভাবে দুলালের মতো পঙ্গু হাসপাতালে আসা অনেক রোগীকে দালালরা ভাগিয়ে নিয়ে যেত আকারামের কাছে। আর আকরাম চিকিত্সার নামে তাদের মৃত্যুর দুয়ারে ঠেলে দিতেন।
এর আগে মোবাইল কোর্ট ২০১০ সালে শ্যামলী এলাকা থেকে ‘প্রফেসর’ আকরাম হোসেনকে আটক করে। তখনও তাকে দুই বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছিল। কয়েক মাস জেল খেটে ছাড়া পেয়ে পুরনো জায়গায় ফিরে আসেন আকরাম হোসেন।
৫ বছর আগে আকরামের শ্যামলী জেনারেল হাসপাতালে ভুল অপারেশনে এক রোগী মারা যায়। এর পর তিনি ওই হাসপাতাল বন্ধ করে পালিয়ে যান। কয়েক মাস পর পুনরায় আগারগাঁও এলাকায় মরিয়ম অর্থপেডিক্স এন্ড জেনারেল হাসপাতাল নামে চালু করেন নতুন এই হাসপাতালটি।
নড়াইলের দাগী অপরাধী আকরাম এলাকায় টিকতে না পেরে পাড়ি জমান ঢাকায়। পঙ্গু হাসপাতালের দালালদের সঙ্গে গড়ে তুলেন সখ্যতা। ওষুধ চুরি ও রোগী ভাগিয়ে নেয়া বাণিজ্যের পাশাপাশি আগারগাঁও এলাকার বিভিন্ন ক্লিনিকে চাকরি শুরু করেন তিনি। ডাক্তারদের অপারেশন করা দেখে ও তাদের চিকিত্সা দেখে তিনি নিজেই বনে যান চিকিত্সক। নামের আগে নেন প্রফেসর পদবী।
এর পাশাপাশি আকরাম গড়ে তুলেন দালালদের একটি শক্তিশালী চক্র। দালাল চক্রকে ৬০ ভাগ কমিশন দিয়ে থাকেন আকরাম। প্রতিটি অপারেশনের জন্য ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেন রোগীদের কাছ থেকে। রোগীদের বেশিরভাগই গ্রামের লেখাপড়া না জানা মানুষ। ঢাকায় পরিচিত মানুষজন না থাকায় তারা আবারো ফিরে যান গ্রামে। এরপর তাদের ভাগ্যে কি ঘটে কেউ বলতে পারে না।
পঙ্গু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আব্দুল আওয়াল রিজভী বলেন, এখানে রোগী ভাগিয়ে নেয়ার শক্তিশালী দালাল চক্র রয়েছে। তাদের প্রতিরোধ করা কঠিন। এদের পেছনে রয়েছে নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের এক শ্রেণীর ঘুষখোর কর্মকর্তা।