রাঁধুনি অপি
প্রকাশ : ২৪ জুলাই ২০১৩, ১৯:৫৭
মাত্র আড়াই বছর বয়সে জনপ্রিয় টিভি নাটক ‘সকাল-সন্ধ্যা’র পারুলী চরিত্রটিতে অভিনয় করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন অপি করিম। অবশ্য টিভি মিডিয়ায় অপির প্রথম কাজ ছিল ‘কলকাকলী’ নামের একটি অনুষ্ঠানে। এ ছাড়া দুরন্ত কৈশোরে পা দেওয়ার আগেই অপি অভিনয় করেন ‘শুকতারা’ ও আপনজন’-এর মতো বিটিভির জনপ্রিয় দুটি ধারাবাহিকে। মাঝে কিছুটা বিরতির পর ছোটপর্দায় অপির পুনঃআগমন ঘটে ’৯৭ সালে হোয়াইট প্লাসের বিজ্ঞাপনচিত্রের মডেল হওয়ার মাধ্যমে। পরবর্তীতে ’৯৯ সালে টেলিফিল্ম ‘তেপান্তরের রূপকথা’তে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে অপি যাত্রা শুরু করেন অভিনয়ের মূলধারায়। আর ২০০০ সালে লাক্সের মডেল হওয়ার সুবাদে বড় ধরনের ব্রেক আসে অপির মডেলিং ক্যারিয়ারেও। এদিকে মঞ্চদর্শকদের মাঝেও অপি সমানভাবে আলোচিত হতে থাকেন ‘রক্তকরবী’ নাটকে তার করা নন্দিনী চরিত্রটির জন্য। এ যাবতকালে একাধিক একক, ধারাবাহিক ও মেগাসিরিয়ালে অভিনয় করলেও অপি সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছিলেন ‘৫১বর্তী’ নাটকে তার অভিনয়ের জন্য। এ ছাড়া ২০০৪ সালে অপি অভিনীত চলচ্চিত্র ‘ব্যাচেলর’ তাকে এনে দেয় জনপ্রিয়তা ও সমালোচকদের অকুণ্ঠ প্রশংসা। আর এ ছবিতে অভিনয়ের জন্য পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও। অপি আলোচিত হয়েছেন ভিন্নধারার টকশো ‘আমার আমি’ এবং ‘আয়নাঘর’-এ তার অনবদ্য উপস্থাপনার জন্যও। ক্যারিয়ারের বৃহস্পতি যখন তুঙ্গে ঠিক তখনি অপি উচ্চতর পড়াশোনার জন্য মিডিয়া থেকে সাময়িক বিরতি নিয়ে জার্মানিতে যান। পড়াশোনা শেষে দেশে ফিরে অভিনয় শুরু করেন বেছে বেছে। কেননা শিক্ষকতায় যোগ দিয়েছেন বলে অভিনয়ের জন্য সময় বের করাটা বেশ কঠিন। দীর্ঘ বিরতির পর অপি করিম আবারও নতুন মাত্রা যোগ করলেন উপস্থাপনায়। বর্তমানে প্রতিদিন সন্ধ্যায় ৮টি চ্যানেলে প্রচার হচ্ছে তার উপস্থাপনায় রান্না বিষয়ক অনুষ্ঠান ‘নর স্বাদে সুস্বাস্থ্যে’। এ অনুষ্ঠানে তিনি শুধু উপস্থাপিকা হিসেবে নন, সঙ্গে বিভিন্ন রেসিপি বানিয়ে দর্শকদের দেখাচ্ছেন। ইউনিলিভারের পৃষ্ঠপোষকতায় এই অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করছেন শাহরিয়ার শাকিল। এ রকম রান্নার অনুষ্ঠানের সাথে যুক্ত হওয়ার গল্প জানতে চাইলে অপি তার স্বভাবসুলভ মৃদু হাসলেন। এরপর শুরু করলেন তার কথার ঝাঁপি। তার ভাষ্যে, ‘রান্নার অনুষ্ঠান আমার এটাই প্রথম। এটা কখনোই হওয়ার কথা ছিল না। আমি রান্না করতে পছন্দ করি না, তা বলব না। কারণ রান্না হচ্ছে বেসিক নিড। না চাইলেও আপনাকে করতে হয়। আমি রান্না পারি না বা পারতাম না। সেই হিসেবে আমার কনফিডেন্স অনেক কম। তাই বলতাম রান্নার অনুষ্ঠান আমাকে দিয়ে হবে না। দেশের বাইরে থাকার সুবাদে অর্থাত্ জার্মানিতে পড়াশোনা করার সময় আমি একাই ছিলাম। তখন বাধ্য হয়ে নিজেকে, রান্না করতে হয়েছে। তা ছাড়া কখনও কখনও টাকা-পয়সাও ফ্যাক্টর। বাইরে খেলে বেশি খরচ হয়। তাই রান্না শেখা। আমি আগে পারতাম পুডিং, মুরগির মাংস, গরুর মাংস মানে আমার পছন্দের আইটেম ছাড়া কিছুই পারতাম না। জার্মানিতে যাওয়ার পর দেখা গেল আমি অনেক প্রকারের কেক বানানো শিখেছি। পিত্জা শিখেছি। সেখানে চাইনিজ বন্ধুদের কল্যাণে অনেক রকমের স্যুপ রান্না শিখেছি।
এই অনুষ্ঠানটি করছি প্রথমত—আমি মনে করি সবাই ধারণা শিক্ষিত মেয়েরা রান্না করবে না। সেটা সবাইকে সহজে বোঝাতে পারি না। যারা এটা বলে তাদের উত্তর দেওয়ার জন্য। রান্না আসলে শিক্ষিত বা অশিক্ষিতের জন্য না। রান্না হচ্ছে জীবন ধারণের জন্য। সুতরাং সবাইকেই রান্না করতে হয় বা সবাই রান্না পারে। দ্বিতীয়ত, আমি রান্না করতে পারি সেটা প্রমাণ করা। তৃতীয়ত, স্যুপটা মিলে গেছে আমার সাথে। অন্য কিছুর রেসিপি হলে আমাকে চিন্তা করতে হতো। চতুর্থত, ইউনিলিভারের সাথে অনেকদিন কাজ করি না। আমার শুরুটা যেহেতু তাদের সাথে। তাই এই প্রতিষ্ঠান নিয়ে আমার নস্টালজিয়া ও ইমোশন কাজ করে। সে জন্য ভালোলাগা থেকেই কাজটা করা। পঞ্চমত, দিয়া ও শাকিল। তারা আমাকে কাজ করার জন্য রাজি করিয়েছে। ষষ্ঠত, দিয়ার কিচেন যখন দেখলাম তখন ভালো লাগল। আমার মনের মতো কিচেন সেটা। আর আমার কনফিডেন্স থাকায় করেছি। কেননা আমি সেটা করি সিরিয়াসলি করি। শুটিংয়ের আগে একটা রিপারেশন নিয়েছি। সাথে ইন্ডিয়া থেকে আগত দীপঙ্কর নামের একজন শেফ আছেন। তিনি আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছেন। তারা আমাকে সবকিছু শিখিয়ে পরিয়ে তারপর শুটিং করিয়েছে। যেমন—যেসব কথা স্ক্রিনে বলি না, তাও তারা বলেছে যেন আমি জানতে পারি। মাশরুম ও পাস্তা কত রকমের হয়, মিট কত রকমের হয়, কেকের ক্ষেত্রে যা বলিনি তাও শিখতে পেরেছি। বলতে গেলে ৩০টা আইটেমের স্যুপ নিয়ে মাস্টার্স হয়ে গেছে আমার।’ কাজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘প্রথম দুইটা পর্বে আমার কিছুটা ভয় লাগছিল। কেননা কাটাকাটিসহ আরও নানা বিষয় থাকে। পরে সেগুলো জেনেছি শিখেছি। আমি দেখলাম আমার কাটাকাটি করার একটা স্টাইল আছে। এটা শিখেছি চাইনিজদের কাছে এবং দীপঙ্করও কিছু বলেছে। যখন দেখলাম আমি পারছি স্ক্রিনে, তখন আমার নিজেকে কনফিডেন্ট মনে হয়। আমি যা করছি কনফিডেন্টলি করছি। আর একটা কথা যোগ না করলেই নয়। সেটা হচ্ছে, এখন নাটক কম মানুষ দেখে। আগে একটা নাটক প্রচার হলে অনেক রেসপন্স পাওয়া যেত। অথচ এখন আমরা নিজেদের প্রোমো ফেসবুকে ট্যাগ করে লাইক দিচ্ছি। আমরা আমরাই বলি। এখন চ্যানেল বেশি, তাই আগের মতো ফিডব্যাক পাওয়া যায় না। সত্যি বলতে আমি এই রান্নার অনুষ্ঠান করে যে ফিডব্যাক পেয়েছি ও পাচ্ছি তা দেখে আমি নিজেই অবাক হয়েছি। সেটা শুধু কাছের মানুষদের কাছ থেকে নয়, দূরের মহল এবং অপরিচিত ও দেশ-বিদেশ সব জায়গা থেকে দারুণ রেসপন্স পাচ্ছি। আরেকটি কথা আমি বলতে চাই, তা হলো—এই অনুষ্ঠান করার আগে শাকিলের সাথে কোনো কাজ করিনি। দেখা হলে শুধু হাই-হ্যালো হতো তার সাথে। আমার আয়ত্তের বাইরে হলেও সে আমাকে দিয়ে করিয়ে নিয়েছে। এটা আসলে তারই কৃতিত্ব বলা যায়। সেই সাথে এ রকম পরিপাটি কিচেনে পুরো রান্না করা বিশাল ব্যাপার। সবার সহযোগিতায় আমি ভালো করেছি। আর আমিও অবাক হয়েছি যে, খারাপ পরীক্ষা দিয়ে যেন আমার ভালো রেজাল্ট হয়েছে।’ কিছুটা দম নিয়ে অপি আবারও বলা শুরু করলেন, ‘প্রথমে আমার মনে হয়েছিল শুটিংয়ে সারাক্ষণ কথা বলতে হবে। কেননা আমি তো একা। পুরো অনুষ্ঠান ওয়ান ম্যান শো। যারা এতে এক্সপার্ট; তারা অনেক ইনফরমেশন জানে। তাদের জন্য সহজ হলেও আমার জন্য তা ছিল না। তবু ভালো করতে পেরেছি বলে আমি হ্যাপি। আর স্যুপগুলো টেস্ট করি, সেটা সত্যিই মজা হয়েছে। সবাই অপেক্ষায় থাকত কখন প্রোগ্রাম শেষ হবে এবং স্যুপ টেস্ট করতে পারবে। যে পর্বগুলো ইফতারির মধ্যে হয়েছে তখন ইউনিটের অনেকে বলত অপি আপা ভালো স্যুপের আইটেমগুলো ইফতারের পর করবেন। কেননা তারা রোজা রাখে বলে সেটা টেস্ট করতে পারে না। বিশেষ করে শাকিল, দিয়া, পঙ্কজ, জিমির প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। তাদের উত্সাহ ও সহযোগিতার জন্য এই অনুষ্ঠান করা আমার পক্ষে সম্ভব হয়েছে। তারা না থাকলে আমার মতো একজনকে দিয়ে প্রফেশনাল কাজ হতো না। সেই সাথে কৃতজ্ঞ ফ্যাশন ডিজাইনার এমদাদ ভাইয়ের প্রতি। তিনি অনুষ্ঠানের জন্য ভালো কিছু সুতির শাড়ি পাঠিয়েছেন। সেগুলো পরার পর মনে হয় আমি ঘরোয়া পরিবেশে আছি ও রান্না করছি। এটাও একটা ব্যাপার। আর পুরো অনুষ্ঠানের সব কিছুই ছিল অনেক সাজানো গোছানো। আমি সেখানে যা যা করছি তাই দেখানো হচ্ছে। বলতে গেলে ক্যাজুয়াল ব্যাপারটা রান্নার ঘরে ছিল। সাথে ইউনিলিভারের সহযোগিতা তো আছেই। সব মিলিয়ে অনুষ্ঠান ভালো হয়েছে। পুরো টিম ভালো কিছু দিতে পেরেছি। এর সফলতা একার কারও নয়। পুরো টিমের। বিশেষ করে—নরের যে পাউডারগুলো আমরা ব্যবহার করেছি, তা সত্যিই অনেক ভালো এবং খেতেও সুস্বাদু।’ এবার অভিনয়ের প্রসঙ্গ উঠতেই অপি বললেন, ‘আমি এখন বেছে বেছে কাজ করছি। ঈদের কাজ করব না বললেও বেশ কিছু নাটকে অভিনয় করলাম। সামনে আরও কয়েকটি নাটকের শুটিং আছে। এরমধ্যে শেষ করেছি সাগর জাহান পরিচালনায় একখণ্ডের নাটক ‘জেসমিন ও তার একগুচ্ছ ফুল’, চয়নিকা চৌধুরীর ‘উত্তম কুমার সুচিত্রা সেন’ ও নিয়াজ মাহবুবের একটি। সামনে শুটিং আছে নুজহাত আলভী আহমেদের ‘দেয়ালের ওপারে আছে আকাশ’সহ আরও বেশ কয়েকটি নাটকের কাজ।’