শিক্ষায় বৈষম্যের শিকার নারী ও শিশু

বাংলাদেশে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার খুবই কম। প্রতি ১০ জনের মধ্যে মাত্র দুই জন শিশু প্রাক-বিদ্যালয়ে যাচ্ছে। ছয় থেকে ১০ বছর বয়সী প্রায় ২৩ শতাংশ শিশু স্কুল বহির্ভূত। এক্ষেত্রে ছেলে ও মেয়ে শিশুর মধ্যে সামান্যই পার্থক্য বর্তমান। যেসব উপজেলাতে অগ্রগতি লাভ করে সেখানেও ১০০ জনের মধ্যে ১০ জন শিশু স্কুলে যায় না। পিছিয়ে পড়া উপজেলাগুলোতে ১০০ জনের মধ্যে ৪৫ জন শিশু স্কুলে যায় না। বাংলাদেশে স্কুল বহির্ভূত শিশুদের মধ্যে (ছয় বছর বয়সে) প্রতি চারজন শিশুর মধ্যে একজন এখনো স্কুলে যায় না, যা সবার জন্য শিক্ষা নীতিটি অর্জনের পথে এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। শিশু সমতা মানচিত্র:সামাজিক বঞ্চনার ক্ষেত্রসমূহ প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়। গতকাল ইউনিসেফের সহযোগিতায় বাংলাদেশ ব্যুরো অফ স্ট্যাটিস্টিকস (বিবিএস) এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ডেভলপমেন্ট স্টাডিস (বিআইডিএস) যৌথভাবে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো মিলনায়তনে প্রতিবেদনটি প্রকাশকালে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা মন্ত্রী এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) একে খন্দকার, মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকী এবং বাংলাদেশে ইউনিসেফ প্রতিনিধি প্যাসকেল ভিলনোভ। প্রতিবেদনে বলা হয়, শিক্ষা, বিদ্যালয়ে ভর্তি ও যুব-সাক্ষরতা বিষয়ে নারী-পুরুষ সমতার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লক্ষ্য করা গেলেও, সমতা অর্জনে বাংলাদেশের অগগ্রতি এখনো অসম পর্যায়ে রয়েছে। ভৌগোলিক অঞ্চল, গ্রাম ও শহর, সম্পদ, নৃতাত্ত্বিক অবস্থা এবং মৌলিক বিভিন্ন সামাজিক সেবার ক্ষেত্রে নারী ও শিশুরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। সমতা মানচিত্রপ্রাপ্ত তথ্য: সামাজিক বঞ্চনার ক্ষেত্রসমূহ বিষয়ক প্রতিবেদনে উপযুক্ত নীতিমালা গ্রহণ এবং বর্ধিত বাজেট বরাদ্দের মাধ্যমে সবচে বঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের আওতায় আনার লক্ষ্যে ভৌগোলিক লক্ষ্য নির্ধারণ এবং বিভিন্ন খাত ও উন্নয়ন অংশীদারদের মধ্যে সহযোগী প্রচেষ্টার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করে। প্রতিবেদনে ২০১১ সালের আদমশুমারির তথ্য বিশ্লেষণ করে সামাজিক অসমতার ধরন সর্ম্পকে বলা হয়, অগ্রগতির ক্ষেত্র এবং সামাজিক বঞ্চনার ক্ষেত্রসমূহ চিহ্নিত করা হয়। সেই সাথে ২০০১ ও ২০১১ সালের আদমশুমারি থেকে প্রাপ্ত তথ্য ও উপাত্ত তুলনা করে শিশু, যুব সম্প্রদায় ও নারীরা প্রধানত যেসব মৌলিক সামাজিক বঞ্চনা অতিক্রম করে যে উন্নতি করেছে তাও উপস্থাপন করা হয়। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, ১৮ বছরের নিচে জনগোষ্ঠী হচ্ছে ৩৯.৭ শতাংশ, যা ২০০১ এর গণনার চেয়ে ৫ শতাংশ। নারী প্রধান পরিবার ২০০১ সালের ১৩.৮ শতাংশ থেকে ২০১১ সালে বেড়ে হয়েছে ১৫.৬ শতাংশ। শহর ও গ্রামাঞ্চলে এ অনুপাতের ব্যবধান খুব কম, শহরে ১৪ ও গ্রামে ১৬ শতাংশ। প্রতিবেদনটিতে দেখা গেছে যে, বাংলাদেশে মাধ্যমিক ও যুব সাক্ষরতা-উভয় ক্ষেত্রেই নারী শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের উপস্থিতি ছিল বেশি, ছেলেদের ৭২ শতাংশের বিপরীতে মেয়েদের ৮০ শতাংশ, যা শিক্ষা ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ সমতা নিশ্চিত করে। নারীদের ক্ষেত্রে যুব সাক্ষরতার হার পুরুষদের হারের তুলনায় বেশি, পুরুষদের ৭৪ শতাংশের বিপরীতে নারীদের ৭৬ শতাংশ। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের জন্য বাল্যবিবাহ এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ, কারণ এখানে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নারীরই বিয়ে হয় ১৫-১৯ বছর বয়সে, যা সারা পৃথিবীর মধ্যে সর্ব্বোচ্চ। ১৫-১৯ বছর বয়সী বিবাহিত নারীর সংখ্যা গত ১০ বছরে পাঁচ শতাংশ কমেছে। ২০০১-এ এ সংখ্যা ছিল ৩৭.৫ শতাংশ যা ২০১১-তে দাঁড়িয়েছে ৩২.৫ শতাংশে। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, নারী শিক্ষার হার যত বাড়ছে, কম বয়সী মেয়েদের বিয়ের হার তত কমছে। শিশু শ্রমের ক্ষেত্রে, প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, প্রকৃত শিশু শ্রমিকের (১০-১৪ বছর বয়সী) সংখ্যা বর্তমানে ছয় শতাংশ যা গত দশকের তুলনায় হ্রাস পেয়েছে চার শতাংশের কিছু বেশি, উল্লেখ্য, ২০০১-এ ছিল ১০ শতাংশ। ছেলেদের মধ্যে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা (৯.১ শতাংশ) মেয়েদের সংখ্যার (২.৬ শতাংশ) চেয়ে বেশি। শিশু শ্রমিকের সংখ্যা গ্রামাঞ্চলের (পাঁচ শতাংশ) তুলনায় শহরাঞ্চলে বেশি (নয় শতাংশ)। জাতিসংঘের পক্ষ থেকে বলা হয় এই শিশু সমতা মানচিত্রটি তৈরির কাজ মূলত করা হয়েছিল তিনটি বিশদ লক্ষ্য অর্জনের কথা মাথায় রেখে। প্রথমত বাংলাদেশের উন্নয়নের ধারা বিশ্লেষণ এবং শিশু, যুব সম্প্রদায় ও নারীরা যে সব সামাজিক বঞ্চনার শিকার সে ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিতকরণ ও মানচিত্রে তা তুলে ধরা। দ্বিতীয়ত দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিরাজমান অসমতার ধরন বিশ্লেষণ ও সম্মিলিত প্রচেষ্টা গ্রহণের উদ্যোগের মাধ্যমে জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিরাজমান বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে পদক্ষেপ গ্রহণ। তৃতীয়ত শিশু সমতা বিষয়ক বিশ্লেষণ নীতিমালা নিয়ে আলোচনায় অবদান রাখতে পারবে বলে আশা করে। চাইল্ড ইক্যুইটি অ্যাটলাস:পকেটস অফ সোশ্যাল ডিপ্রাইভেশন ইন বাংলাদেশ রিপোর্ট-এর কপি পাওয়া যাবে: www.unicef.org.bd ওয়েবসাইটে।