আবার চ্যাম্পিয়ন মোহামেডান
প্রকাশ : ২৪ জুলাই ২০১৩, ২২:০২
আশেপাশে সতীর্থদের আনন্দিত চিত্কার শোনা যাচ্ছিল। কণ্ঠে বোঝা গেল সালমা খাতুনও আনন্দিত, রোমাঞ্চিত। জোরে জোরে বললেন, ‘আমাদের সবার জন্যই খুব আনন্দের উপলক্ষ এটা। দলকে হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়ন করাতে চেয়েছিলাম। সেটা পেরেছি।’
হ্যাঁ, মহিলা ক্রিকেটের সেরা দল হিসেবে নিজের অবস্থানটা আরো দৃঢ় করল কাল সালমা খাতুনের দল মোহামেডান স্পোর্টিং। গতকাল ধানমন্ডি ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত মহিলা ক্লাব কাপ ফাইনালে শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাবকে ৭ উইকেটে হারিয়ে নিজেদের চতুর্থ ও টানা তৃতীয় শিরোপা জিতে নিল মোহামেডান। টুর্নামেন্টের ইতিহাসে পাঁচ আসরের সবকটিতে ফাইনাল খেলা এই ক্লাবটিকে আরো উঁচুতে নিয়ে গেলেন তাদের অধিনায়ক সালমা খাতুন নিজে।
মোহামেডানের চারটি ট্রফিই এসেছে এই সালমা খাতুনের অধিনায়কত্বে। ব্যাটে-বলে প্রতিটি টুর্নামেন্টের মতো এবারও প্রমাণ করেছেন তিনিই সেরা। গতকাল শেখ জামালকে হারানোর পথে ফাইনাল সেরা খেলোয়াড় হওয়ার পাশাপাশি টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ স্কোরারও হয়েছেন তিনি। আর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান করে এবং সর্বোচ্চ উইকেট নিয়ে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় সাথিরা জাকির।
গতকাল টসে জিতে আগে ব্যাট করতে নেমেছিল শেখ জামাল। কিন্তু মোহামেডানের ছয় বোলারের কার্যকর আক্রমণের সামনে সেভাবে প্রতিরোধই গড়তে পারেননি শেখ জামালের খেলোয়াড়রা। সাত ও আট নম্বরে নেমে রেশমা ও সুবর্ণা যথাক্রমে ২৪ ও ২২ রান করে প্রতিরোধের চেষ্টা করেছিলেন। লাভ হয়নি। নির্ধারিত ৪০ ওভারে ৮ উইকেটে ১২৯ রানে থেমে যায় তাদের ইনিংস।
জবাব দিতে নেমে শুরু থেকেই স্বচ্ছন্দ ছিল মোহামেডান। শুকতারা, শারমিন ও রুমানা ২১ রানের করে ইনিংস খেলে দলকে জয়ের দিকে এগিয়ে নিয়ে যান। আর অধিনায়ক সালমা অপরাজিত ৪৬ রান করে ট্রফি জিতিয়েই মাঠ ছাড়েন। ৩২.৩ ওভারে মাত্র ৩ উইকেট হারিয়ে জয়ের লক্ষ্যে পৌঁছে যায় মোহামেডান। পাশাপাশি বল হাতে এক উইকেট তুলে নেয়া সালমা ফাইনালের সেরা খেলোয়াড়ও হয়েছেন।
সালমা এই জয়ের পেছনে অবশ্য নিজের চেয়ে সতীর্থদের কৃতিত্বই বেশি দিতে পছন্দ করেন। ৪২.৮ গড়ে ৫ ম্যাচে ২১৪ রান করে সর্বোচ্চ রানের মালিক হওয়া খুলনার এই ক্রিকেটার বলছিলেন, ‘সতীর্থরা সবাই সমর্থন করেছে, সময়মতো ভালো খেলেছে বলেই আমরা এই জয় পেয়েছি। কোচ অনেক কষ্ট করেছেন। ক্লাব কর্মকর্তারাও এই শিরোপা জয়ের জন্য আমাদের সর্বোচ্চ সাপোর্ট দিয়েছেন।’
সালমা সবসময়ই অধিনায়ক হিসেবে অত্যন্ত সফল। জাতীয় দলের অধিনায়ক হিসেবে তার হাত ধরে এসেছে ওয়ানডে স্ট্যাটাস, মোহামেডানকে চারটি শিরেপা জিতিয়েছেন, খুলনাটাকে টানা চ্যাম্পিয়নশিপ জিতিয়েছেন। তারপরও অত্যন্ত বিনয়ীভাবেই বললেন, ‘সবাই সাপোর্ট দেয় বলেই এসব সাফল্য পাই। আমি অধিনায়ক হিসেবে, খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নিজের সেরা পারফরমেন্স করার চেষ্টা করি। তারপর বাকিটা ভাগ্য।’
খুলনার সাফল্যের এই রূপকার সালমার পাশাপাশি অবশ্যই টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় সাথিরা জাকিরও। তিনি ১৯৪ রান করে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্কোরার হওয়া সঙ্গে ১৩ উইকেট নিয়ে হয়েছেন সেরা বোলারও। আরেকজন খেলোয়াড়ের কথাও মনে রাখা উচিত। এবারের টুর্নামেন্টের একমাত্র সেঞ্চুরিটি করে খুলনাকে সেমিফাইনাল জেতানোর কারিগর ছিলেন শুকতারা রহমান।
তবে সবার চেয়ে বেশি করে উচ্চারিত হচ্ছে আজ ইমতিয়াজ হোসেন পিলুর নাম। নীরবে নিভৃতে মেয়েদের ক্রিকেট নিয়ে সেই শুরু থেকে কাজ করে যাওয়া খুলনার এই কোচই মোহামেডানের এই টানা সাফল্যের রূপকার। কাল দলের আরেকটি ট্রফি জয়ের পর শুরুতে অবশ্য বললেন, ‘এখন তো ট্রফি ব্যাপারটা অভ্যাস হয়ে গেছে। তারপরও প্রতিটা ট্রফিই একই রকম আনন্দের। মেয়েরা ওদের পরিশ্রমের এই পুরস্কার যখন পায়, দেখতেও ভালো লাগে। ওরা কতো কষ্ট করে খেলে; তার বদলে এই আনন্দটা ওদের প্রাপ্য।’
পিলুর একদিকে যেমন নিজের দলের জয়ে আনন্দ আছে, তেমনই এখনো বাংলাদেশের মহিলা ক্রিকেটাররা যে কষ্টের দিন কাটায় সে নিয়ে কষ্টও আছে, ‘মোহামেডান আমার দল। কিন্তু এর সব দলের খেলোয়াড়ের জন্যই আমার টান আছে। শেখ জামালেও আমার খুলনার তিনটি মেয়ে আছে। খুলনার হোক আর রাজশাহীর; ওদের কষ্টটা আমাকে সত্যিই কষ্ট দেয়।’
আর মেয়েদের ক্রিকেট এই যে কয়েকটা দলের মধ্যে আটকে আছে, মেয়েরা এখনো খেলার বিনিময়ে তেমন আয় করতে পারছে না; এ সবেরই তিনি একটা সমাধানই দেখেন। তিনি মনে করেন মেয়েদের ক্রিকেটটাকে বিসিবি গুরুত্ব দিলে তবেই সেটা সত্যিকারেই ছড়িয়ে পড়বে, ‘মেয়েদের ক্রিকেটকে বিসিবি থেকে স্বীকৃতিটা সেভাবে দিতে হবে। আজ যদি মেয়েদের ক্রিকেটে অংশ নেয়া সর্বোচ্চ লিগের ক্লাবগুলোর একটি করে কাউন্সিলরশিপ থাকতো, তাহলে সব ক্লাবই অনেক বেশি উত্সাহী হতো খেলার ব্যাপারে।’