প্রকৌশলী, ব্যাংকারসহ চারজন গ্রেফতার

ক্রেডিট ?কার্ড জালিয়াতি করে বিভিন্ন ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে কোটি টাকা তুলে নেয়ার অভিযোগে চারজনকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। এদের মধ্যে দুইজন ইঞ্জিনিয়ার ও একজন ব্যাংকের কর্মকর্তা। অপরজন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেষ্ট্রি বিভাগ থেকে পাস করেছেন। ইঞ্জিনিয়ার মো. সেলিম ১৯৮৯, ১৯৯০ ও ১৯৯১ সালে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় থেকে ‘তরুণ উদ্ভাবক’ হিসাবে প্রায় ১৪ লাখ টাকা পুরস্কার পেয়েছিলেন। তিনিই এই চক্রের প্রধান। আর মঞ্জুরুল ইসলাম মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের আইটি বিভাগের কর্মকর্তা। গ্রেফতারকৃত অপর দু’জন আরিফ হোসেন খান ও আসাদুল ইসলাম তাদের সহযোগী। এর মধ্যে আসাদুল খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করেছেন। আর আরিফ হোসেন খান খুলনা বিআইটি (বর্তমানে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়) পাস করে এডভান্স ডাটা নেটওয়ার্ক (এডিএন) নামে একটি বেসরকারি কোম্পানির ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত। ক্রেডিট কার্ড জালিয়াত চক্রের চার সদস্যকে গ্রেফতার করে গতকাল বুধবার সকালে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের মিডিয়া এন্ড পাবলিক রিলেশন বিভাগে এক সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর গুলশান উত্তরা ও মতিঝিল এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়। তিনি বলেন, গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে সেলিম এই চক্রের প্রধান। এই চক্রটি বিভিন্ন ব্যাংকের ডেবিট ও ক্রেডিক কার্ড জালিয়াতি করে দুই কোটি টাকারও বেশি তুলে নিয়েছে। এর আগে একবার ব্যাংকে চাকরি করার সময় তথ্য চুরির অভিযোগে গ্রেফতার হয়ে জেলও খেটেছেন সেলিম। এছাড়া দীর্ঘ সময় ধরে তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেছেন। সাংবাদিকের কাছে সেলিম জানান, রংপুরের কারমাইকেল কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর শেষে তিনি ১৯৯৫ সালে সাইটেক ইলেকট্রনিক্সে যোগ দেন। এর মধ্যে তিনি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের উপর বিভিন্ন ডিগ্রী অর্জন করেছেন। কয়েকটি ডিপ্লোমাও রয়েছে তার। ২০০০ সালে তিনি যোগ দেন টেক্সাস ইলেকট্রনিক্সের এটিএম বিভাগে। এরপর ডাচ বাংলা ব্যাংকের গ্রাহকদের তথ্য চুরি করে জালিয়াতি করতে গিয়ে জেলে যান তিনি। ২০০৮ সালে জেল থেকে বেরিয়ে আরেকটি কোম্পানির ‘এটিএম রিপেয়ার’ (মেরামত) বিভাগে যোগ দেন তিনি। এছাড়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আইটি কর্মকর্তা হিসেবেও সেলিম দায়িত্ব পালন করেন। সেলিমের স্ত্রী আয়েশা বেগম আশা বলেন, ফেনসিডিলের টাকা যোগাড় করতে গিয়েই তার স্বামী অপরাধ জগতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মশিউর রহমান ও সিনিয়র সহকারী কমিশনার তৌহিদুল ইসলাম বলেন, গ্রেফতারকৃত আরিফ হোসেন খান সেলিমের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। এক সময় তারা একসঙ্গে চাকরিও করেছেন। তবে ফেনসিডিল আসক্ত হবার পর সেলিমের সঙ্গে তিনিও চাকরিচ্যুত হন। এরপর থেকেই তারা ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতিতে জড়ান বলে জানান তারা। তারা বলেন, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের আইটি বিভাগের কর্মকর্তা মঞ্জুরুল ইসলাম ও তার সহযোগী আসাদুলও বিভিন্ন সময়ে সেলিম ও আরিফকে সহযোগিতা করতেন। গ্রেফতারকৃতরা বিভিন্ন সময়ে রাজধানীর বিভিন্ন ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি করে দুই কোটি টাকার বেশি হাতিয়ে নিয়েছেন। ডাচ বাংলা ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংকের গ্রাহকেরা এই প্রতারণার শিকার হয়েছেন। এই চক্রে আরো কেউ আছে কি না- তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। গতকালই তাদের ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়েছে। যেভাবে জালিয়াতি করতেন তারা এটিএম বুথের সিপিইউ থেকে পেনড্রাইভের মাধ্যমে কাস্টমারের তথ্য চুরি করা হয়। উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ক্যামেরার মাধ্যমে কাস্টমারের পাসওয়ার্ড/পিনকোড চুরি, কার্ড রিডার অ্যান্ড রাইটারের মাধ্যমে ল্যাপটপের সহায়তায় সংগৃহীত তথ্য ব্যাংক কার্ডের ম্যাগনেটিক স্টিপে ধারণ করার মাধ্যমে নতুন কার্ড তৈরি করা হয়। তৈরি করা ক্লোন কার্ড ও গোপন ক্যামেরায় ধারণকৃত পাসওয়ার্ড দিয়ে টাকা উত্তোলন করা হয়। গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে ভুয়া ক্রেডিট/ডেবিট কার্ড জালিয়াতির বিভিন্ন সরঞ্জামাদি, যেমন- উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন গোপন ক্যামেরা, কম্পিউটার, কার্ড রিডার অ্যান্ড রাইটার (কার্ড তৈরির যন্ত্র) এবং ম্যাগনেটিক ব্ল্যাংক স্টিপ কার্ডসহ সংশ্লিষ্ট সরঞ্জামাদি উদ্ধার করা হয়। বাংলাদেশে এটিএম বুথ চালুর শুরু থেকে বিভিন্ন ব্যাংকের এটিএম বুথ সার্ভিসের ক্ষেত্রে আইটি সাপোর্ট প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান টেক্সাস ইলেক্টনিক্স পরবর্তী সময়ে নাম পরিবর্তন করে ‘আমরা টেকনোলজি’তে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে সেলিমের। অপর তিনজন সেলিমের সঙ্গে কাজ করতেন এবং ব্র্যাক ব্যাংকের এটিএম বুথসহ অন্যান্য ব্যাংকের এটিএম বুথগুলোতে আইটি সাপোর্ট ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করতেন বলে পুলিশকে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে। সেলিম ডাচ-বাংলা ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, প্রাইম ব্যাংকের এটিএম সার্ভিসের রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকির কাজ করতেন।