রমজানুল মুবারকের গুরুত্ব ও তাত্পর্য
প্রকাশ : ২৫ জুলাই ২০১৩, ১৯:৪৪
আল্লাহ তা’য়ালা তার বান্দাদের কখনোই জাহান্নামে দিতে চান না। সে জন্য প্রত্যেক বছর রমজান মাস দিয়ে বান্দার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে নিষ্পাপ করেন। দোযখের আগুন থেকে নিষ্কৃতি দেন। যেমন— আবু হুরায়রাহ (রা.) এর বর্ণনায় রসূলুল্লাহ (স.) বলেন, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এবং এক জুমু’আহ থেকে অন্য জুমু’আহ আর এক রমজান থেকে অন্য রমজান-এর মাঝের পাপের খেসারতকারী হয়-যখন বড় বড় পাপ থেকে বিরত থাকা হয় (মুসলিম, সহীহুত তারগীব ওয়া আত তারহীব, ১ম খন্ড, ৪৮৮ পৃ:, হাদীস নং-৯৮০)। আমর ইবনে মুর্রাহ আলজুহানী (রা.) বলেন, একজন লোক নবী (স.)’র কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রসূল! আপনার রায় কি? আমি যদি এই সাক্ষ্য দিই যে, আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন ছাড়া’ ইবাদাতের যোগ্য কেউ নেই এবং আপনি আল্লাহর রসূল। আর আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করি ও যাকাত দান করি এবং রমজানের রোজা রাখি ও সেই রাতে নামাজে দাঁড়াই তাহলে আমি কাদের মধ্যে হতে পারি? তিনি (স.) বললেন, তুমি সিদ্দীক ও শহীদদের মধ্যে হতে পারবে (সহীহ ইবনে হিব্বান)। আবু হুরায়রাহ (রা.) বলেন, রসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন, রমজানের প্রথম রাত যখন আসে তখন শায়তানদের এবং জ্বীনের উদ্ধৃতদের কয়েদ করা হয়। আর জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়। অতঃপর তার মধ্যে কোন দরজাই খোলা হয় না। আর জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয়। তারপর তার মধ্যে কোন দরজাই বন্ধ করা হয় না। আর একজন আহ্বানকারী এ আহ্বান করে, হে ভাল কিছুর আকাঙ্ক্ষী এগিয়ে এসো এবং হে মন্দের উদ্যোগী পিছে ফিরে যাও। আর আল্লাহর জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্ত ব্যক্তিবর্গ রয়েছে (তুমি হয়তো তাদের মধ্যে হতে পার)। এ আহ্বান প্রত্যেক রাতেই হয় (তিরমিযী ৬৮২, ইবনে মাজাহ ১৬৪২, আহমাদ, মিশকাত-১৭৩ পৃষ্ঠা)। সাহল ইবনে সা‘দ (রা.) বলেন, রসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন, জান্নাতের আটটি দরজা আছে, তন্মধ্যে একটি দরজার নাম ‘রাইয়ান’ তা দিয়ে কেবলমাত্র সিয়াম পালনকারী ছাড়া আর কেউ প্রবেশ করবে না (বুখারী ৩২৫৭, মুসলিম ১১৫২, তাহকীক মিশকাত ১৯৫৭)। আবু হুরায়রাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (স.) বলেন, তাঁর উন্মতকে রমজানের শেষ রাতে ক্ষমা করে দেয়া হয়। বলা হল, হে আল্লাহর রসূল! সেটা কি লাইলাতুল ক্বদর? তিনি বললেন, না। বরং একজন মজদুর যখন তার কাজ শেষ করে তখন তাকে পুরোপুরি তার প্রাপ্য দেয়া হয় (আহমাদ, মিশকাত ১৭৪ পৃ:)। আরেক বর্ণনায় তিনি (স.) বদ দু’আ দিয়ে বলেন, সেই ব্যক্তির নাক মাটিতে মিশে যাক, যে রমজান পেল অথচ সে নিজেকে ক্ষমাপ্রাপ্ত করে নিতে পারলো না (তিরমিযী, মিশকাত, ৮৬ পৃষ্ঠা)। অন্য বর্ণনায় আছে, জিবরীল আমীন তাঁর ঐ বদ দু’আতে আমীন! আমীন! বলেছিলেন (ইবনে খুযাইমাহ, ৩য় খণ্ড, ১৯২ পৃষ্ঠা)। আবূ ‘উমামাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ (স.) বলেন, একদা আমি স্বপ্নে দেখলাম যে, একটি সম্প্রদায় উল্টোভাবে ঝুলছে। তাদের গালটি ফাঁড়া। তাত্থেকে রক্ত ঝরছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এরা কারা?- বলা হল, এরা তারা, রমজান মাসে বিনা ওজরে সিয়াম রাখে না যারা (সহীহ ইবনে খুযাইমাহ, ৩য় খণ্ড, ২৩৭ পৃষ্ঠা, ইবনে হিব্বান)। যে ব্যক্তি শরীয়তী ওজর ছাড়া এ মাসের একটি রোজাও ছেড়ে দিবে সে যদি সারা জীবনও সিয়াম পালন করে তবুও তার পাপের খেসারত হবে না (বুখারী)। যে ব্যক্তি এ মুবারাক মাসেও আল্লাহকে রাযী করতে পারল না, সে বড়ই অভাগা (ইবনে হিব্বান)। রমজানুল মুবারাকের কারণে জান্নাতকে সারা বছরের জন্য সাজানো হয় এবং রমজানের প্রথম রাতে ‘আরশ থেকে এক মনোরম বাতাস প্রবাহিত হয় যা জান্নাতের গাছের পাতাগুলো ছুঁয়ে যায়। ফলে এক সুমধুর ও মিষ্টি আওয়াজ সৃষ্টি হয়। তখন জান্নাতের হুরেরা ফরিয়াদ করে যে, এমন কেউ আছে কি, যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে আমাদের দরখাস্ত পেশ করে? রমজানের প্রত্যেক রাতে এক আহ্বানকারী এ আহ্বান করে, কোন প্রার্থনাকারী আছে কি? যাকে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন প্রতিদান দেবেন? কোন তওবাহকারী কাছে কি যার তওবাহ তিনি কবুল করবেন। কোন ক্ষমা প্রার্থনাকারী আছে কি? যাকে তিনি ক্ষমা করে দেবেন? এমন কেউ আছে কি যে, সেই আল্লাহকে ঋণ দেবেন যিনি কাঙ্গাল নন এবং কৃপণ নন, বরং পুরোপুরি দাতা এবং অধিক দাতা (ইবনে হিব্বান)। হে কল্যাণকামীগণ! এগিয়ে এসো এবং হে অন্যায়কারীগণ পিছনে সরে যাও আর বিরত থাকো (তাবারানী)। এ মাসে জিবরাঈল (রা.) রসূলুল্লাহ-এর কাছে আসতেন এবং তাঁর কাছ থেকে কুরআন শুনতেন (বুখারী)। রমজানে আল্লাহ তায়ালার জিকিরকারীর গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হয় এবং দু’আকারী বঞ্চিত হয় না (তাবারানী)। সিয়ামের এ গুরুত্বের কারণেই সাহাবায়ে কিরাম ছোট ছোট শিশুদেরকেও রোজা রাখার অভ্যাস করাতেন। যেমন রুবাইয়্যা বিনতে মু’আয (রা.) বলেন, আমরা আমাদের বাচ্চাদেরকে রোজা রাখাতাম এবং তাদের জন্য খেলনা রাখতাম। অতঃপর তাদের মধ্যে কেউ যখন খাবার জন্য কাঁদতো তখন আমরা তাকে খেলনাটি দিতাম। পরিশেষে ইফতারের সময় হয়ে যেত (বুখারী-২৬৩ পৃষ্ঠা)। সফরের এবং যুদ্ধের মত সংকটময় মুহূর্তেও সাহাবায়ে কিরাম সিয়াম ছাড়তেন না। যেমন আবু বকর (রা.)-এর যুগে ইমামার যুদ্ধে এক সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে মাখরামাহ (রা.) সিয়াম অবস্থায় যুদ্ধ করতে করতে খুব আঘাত পেয়ে যমীনে লুটিয়ে পড়েন। তাঁকে দেখে সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) তাঁর কাছে এলেন। তখন যখমে জর্জরিত ও পিপাসায় ব্যাকুলিত ইবনে মাখরামাহ (রা.) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, এমতাবস্থায় সিয়াম ভাঙ্গা যাবে কিনা? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তখন ইবনে মাখরামাহ (রা.) বললেন তাহলে ভাই! এ ঢালে করে একটু পানি নিয়ে এসো। ইবনে ওমর (রা.) গেলেন এবং একটি হাউজ থেকে আঁজল ভরে চামড়ার ঢালটি ভরলেন। অতঃপর পানি নিয়ে তিনি যখন এলেন তখন ইবনে মাখরামাহ (রা.) যখমে জর্জরিত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। ফলে তিনি রক্তাক্ত দেহে মাটিতে লুটোপুটি খেয়ে শহীদ হয়ে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীনের কাছে ইফতার করতে গেলেন (তারীখে বুখারী, ইসা-বাহ ৩য় খণ্ড, ২৬৬ পৃষ্ঠা)। তিনি (স.) বলেন, আমার উম্মাতকে রমজান মাসে পাঁচটি জিনিস দান করা হয়েছে, যা আমার আগে কোন নবীকেই দান করা হয়নি। প্রথম এই যে, রমজান মাসের প্রথম রাত যখন আসে তখন আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন তাদের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন। আর যার ওপর তাঁর দৃষ্টি পড়ে তাকে তিনি কখনো শাস্তি দেবেন না। দ্বিতীয় হল, তাদের মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট মেশেকর সুবাসের চেয়ে সুগন্ধময়। তৃতীয় হল, ফেরেশতারা তাদের জন্য প্রত্যেক দিন ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকে। চতুর্থ হল, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা জান্নাতকে নির্দেশ দিয়ে বলেন, তুমি আমার বান্দাদের জন্য তৈরী হও এবং সজ্জিত হও। অতি শীঘ্রই তারা দুনিয়ার ক্লান্তি থেকে আমার ঘরে ও আমার সম্মানে স্বস্তি চাইবে। পঞ্চম হল, যখন শেষ রাত আসে তখন তাদেরকে ক্ষমা করে দেয়া হয়। একজন লোক জিজ্ঞেস করল, এটা কি ক্বদরের রাত? তিনি বললেন, না। তুমি কি মজদুরদের দেখনি যে, তারা যখন কাজ থেকে অবসর পায় তখন তাদের মজুরী পুরোপুরি প্রদান করা হয় (বায়হাকীর শুআবুল ইমান, কানযুল উমমা-ল-৩০২ পৃষ্ঠা)। আবূ সাঈদ খুদরীর (রা.) বর্ণনায় রসূলুল্লাহ (স.) বলেন, নিশ্চয় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তালার জন্য (রমজানের) প্রত্যেক দিনে ও রাতে (জাহান্নাম থেকে) মুক্তি দেয়া অনেক দাস রয়েছে এবং প্রত্যেক দিন ও রাতে প্রত্যহ মুসলিমের জন্য কবুলযোগ্য একটি দু’আ অবশ্যই রয়েছে (মুসনাদে বাযযার, সহীহুত তারগীব, ১ম খণ্ড, ৪৯১ পৃষ্ঠা, হাদীস নম্বর-৯৮৮)।
e-mail : mzhazadi@yahoo.com