রমজানের উপলব্ধি
পবিত্র কুরআন বুঝে পড়ার গুরুত্ব
প্রকাশ : ২৫ জুলাই ২০১৩, ২০:৫৩
দেশের প্রায় প্রতিটি মসজিদেই এখন তারাবীহ নামাজে কুরআন খতম দেয়া হচ্ছে। উদ্দেশ্য, বছরে অন্তত একবার নামাজরত অবস্থায় শুদ্ধভাবে পবিত্র কুরআন শোনা এবং কুরআন থেকে আল্লাহর দেয়া নির্দেশনা গ্র্রহণ করা। আল্লাহতা’য়ালা সুরা বাকারায় বলেছেন, “রমজান মাসই হলো সে মাস, যাতে নাজিল করা হয়েছে কোরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্যপথযাত্রীদের জন্য সুস্পষ্ট পথনির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী।” (২ঃ১৮৫, অনুবাদ: মুহীউদ্দিন খান)। কিন্তু হাফেজ সাহেবের তেলোয়াত থেকে আমরা যা শুনছি তার কতটুকু আমরা বুঝতে পারি? কুরআন এসেছে আমাদের সঠিক পথ দেখানোর জন্য। সেই কুরআনের বাণীর মর্ম উপলব্ধি করতে না পারি তাহলে শুধু পাঠ করে কিংবা শ্রবণ করে কি আমরা আল্লাহর দেয়া দিকনির্দেশনার সন্ধান পাবো?
মুসলিম হিসাবে ছোটোবেলায় আরবী পড়া ও লিখা শিখেছি। কিন্তু ভাষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক অর্থাত্ ভাষার অর্থ বুঝে পড়াটাই শেখা হয়নি। আল্লাহতা’য়ালা পবিত্র কুরআনে প্রতিটি মুসলিমকে কুরআনের অর্থ বুঝে তার মর্মার্থ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন। “তারা কি কুরআন সম্পর্কে গভীর চিন্তা করে না? না তাদের অন্তর তালাবদ্ধ?” (৪৭:২৪, অনুবাদ: মুহীউদ্দিন খান)। বিশ্বের মুসলিম জনসংখ্যার মাত্র ১৫ ভাগ হলো আরব। আরবী জানেন এমন অনারব মুসলিমদের বাদ দিলে দেখা যায় মুসলিম জনতার প্রায় ৮০ ভাগই আরবী জানেন না। ফলে কুরআন বিশ্বের সর্বাধিক পঠিত পুস্তক হলেও দুঃখজনকভাবে সর্বাধিক না বুঝে পড়া গ্রন্থও বটে!
নামাজ পড়ার সময় আমরা দাঁড়িয়ে ইমামের তেলোয়াত শুনে যাই; কিন্তু কিরাতের অর্থ বুঝতে পারি না বলে আল্লাহর বাণী আমাদের হূদয়কে আলোড়িত করতে পারে না। নামাজের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে মনোনিবেশ করতে না পারার এটাও একটা অন্যতম কারণ বলে আমি মনে করি। অথচ রাসুল (সা.)-এর সাহাবীদের নামাজে মগ্ন হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেবার ঘটনা আমরা শুনেছি। নামাজের মধ্যে মনোনিবেশ করে তারা তুষ্টি পেতেন, আল্লাহর সান্নিধ্য পেতেন। নামাজের মধ্যে কি আমরা সেই তৃপ্তি খুঁজে পাই? তাই কুরআন বুঝতে হলে আরবী ভাষা শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। তবে কুরআনের বিশদ ব্যাখ্যা করার জন্য কেবল আরবী ভাষা জানাটাই যথেষ্ট নয়। কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ হবার প্রেক্ষাপট, যেমন প্রাসঙ্গিক রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি এবং হাদিস সম্পর্কেও বিস্তারিত জানতে হবে। আর এজন্য আলেম, ওলামা কিংবা কুরআন বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নেয়া যেতে পারে। কিন্তু তা বলে কুরআন বুঝে পড়ার দায়িত্ব কোনো মুসলিম এড়িয়ে যেতে পারেন না। বাড়তি কিছু ভাষা জানা থাকা কখনোই ক্ষতিকারক নয়। তবে ভাষা শেখার সর্বোত্তম সময় হলো শিশুকাল। ভাষাবিদদের মতে একজন শিশু একই সাথে ৫টি ভাষা রপ্ত করতে পারে। তবে ইচ্ছে থাকলে বয়সটা বাধা হবার কথা নয়।
পবিত্র কুরআনে অল্লাহতা’য়ালা বারবার বলেছেন (আল-কামার ৫৪: ১৭, ২২, ৩২, ৪০) “আমি কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি বোঝার জন্যে। অতএব, কোনো চিন্তাশীল আছে কি?” (অনুবাদ:মুহীউদ্দিন খান)। কুরআনের এই আয়াতটি পড়ার পর আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যাদের মাতৃভাষা আরবী নয় তাদের জন্যও কুরআন বুঝা কেমন করে সহজ হতে পারে? তার মানে আল্লাহর এই বাণীতে এমন কোনো ইঙ্গিত লুকিয়ে রয়েছে যা আমরা বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছি। ভারতের ভূ-পদার্থবিদ এবং বিশিষ্ট কুরআন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুল আজিজ আব্দুল রহীম দীর্ঘ ২০ বছর গবেষণা করে কুরআন শিক্ষার যে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রণয়ন করেছেন তার মাধ্যমে যে কোনো সাধারণ মুসলিমের পক্ষে খুব সহজেই কুরআনের অর্থ হূদয়ঙ্গম করা সম্ভব। ভারতের হায়দ্রাবাদ শহরে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন “আন্ডারস্ট্যান্ড কুরআন একাডেমী”।
কুরআনের মোট শব্দ সংখ্যা হলো প্রায় ৭৮,০০০। ড. আব্দুল আজিজ গবেষণা করে দেখেছেন, আমরা নিয়ত থেকে শুরু করে নামাজের মধ্যে যেসব দোয়া-দরুদ, সুরা ফাতিহাসহ কুরআনের শেষ পারার ছোট ছোট সুরা এবং কুরআনের সুপরিচিত আয়াত হামেশা তেলোয়াত করি, তাতে যতগুলো শব্দ রয়েছে সেগুলো কুরআনে ৫৫,০০০ বার এসেছে, যা কুরআনের মোট শব্দ সংখ্যার ৭০ শতাংশ।
কুরআনের মোট মৌলিক শব্দের সংখ্যা হচ্ছে প্রায় ১৮৫০। ড. আব্দুল আজিজের হিসাবমতে মাত্র ২৫০টি মৌলিক শব্দ শিখতে পারলেই কুরআনের ৭০ শতাংশ শব্দ জানা হয়ে যায়। সবচেয়ে আনন্দেন কথা হলো, নামাজের প্রয়োজনীয় দোয়া ও সুরা পড়তে গিয়ে আমরা প্রায় ৫০টি বাক্য তেলোয়াত করি, যার মধ্যে রয়েছে আনুমানিক ১৫০ থেকে ২০০টি শব্দ। কেবল এই বাক্যগুলো বোঝার চেষ্টা করলেই বাড়তি কোনো পরিশ্রম ছাড়া আরবী ভাষার কাঠামো সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়া যাবে। ড. আব্দুল আজিজ হিসেব কষে দেখিয়েছেন, মনোযোগ ও আন্তরিকতার সাথে তার পদ্ধতি অনুসরণ করলে মাত্র ২০০ ঘণ্টার মধ্যে পুরা কুরআনের অর্থ আয়ত্তে আনা যায়। কেউ যদি সপ্তাহে কুরআন শিক্ষার জন্য মাত্র ৪ ঘণ্টা করে সময় বের করতে পারেন তাহলে এক বছরের মধ্যে এই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব। আরো বিস্তারিত জানার জন্য উত্সাহী পাঠকদের অন্তর্জালে understandquran.com ওয়েবসাইটি দেখতে অনুরোধ করছি।
লেখক :সিডনি প্রবাসী প্রকৌশলী