পঙ্গু হাসপাতালে আসা গ্রামের সরল রোগীদের টার্গেট করেন দালালরা
প্রকাশ : ২৫ জুলাই ২০১৩, ২২:৫১
দুর্ঘটনায় হাত-পা ভাঙ্গা, অঙ্গহানি ও স্পাইনাল কডে আঘাতসহ বিভিন্ন ঘটনায় আহতদের চিকিত্সা দেয়া হয় রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের পঙ্গু হাসপাতালে। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কয়েকশ হাত-পা ভাঙ্গাসহ বিভিন্ন ধরনের আঘাতপ্রাপ্ত রোগী চিকিত্সার জন্য আসে এ হাসপাতালে। হাসপাতালের প্রবেশ গেট, জরুরী বিভাগ ও বহির্বিভাগ দালাল দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
গ্রামাঞ্চলের সহজ সরল রোগীরা দালালদের টার্গেট। এমন পরিস্থিতিতে পুরা হাসপাতাল দালাল সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি। স্বয়ং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এই সত্যতা স্বীকার করে বলেছেন, বহুদিন ধরে একটি শক্তিশালী দালাল গ্রুপ রোগী ভাগিয়ে পঙ্গু হাসপাতালের আশেপাশে গড়ে উঠা বেসরকারি হাসপাতাল কিংবা ক্লিনিকে নিয়ে যাচ্ছে। এ সকল বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক দালালের উপর নির্ভরশীল। এসকল ক্লিনিক ও হাসপাতালের রয়েছে ভুয়া অর্থোপেডিক প্রফেসর। ইতিমধ্যে একজন আটক হয়েছেন। এগুলো ‘দালাল মার্কা’ হাসপাতাল বলে সকলের কাছে পরিচিত। পঙ্গু হাসপাতালের বেশ কয়েকজন ডাক্তার ও কর্মচারী ওই দালাল চক্রের সঙ্গে জড়িত।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে রয়েছে দালালদের যোগাযোগ। পান নিয়মিত মাসোহারা। দালালদের মধ্যে খুনের মামলার আসামি, পেশাদার কিলার ও সন্ত্রাসী রয়েছে। এদের বিরুদ্ধে গ্রামাঞ্চলে খুন, ডাকাতিসহ নানা অপরাধের ঘটনায় মামলা আছে। ঢাকায় এসে পঙ্গু হাসপাতালে রোগী ভাগিয়ে নেয়ার ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছে তারা। গড়ে তুলেছে পঙ্গু হাসপাতাল ও আশেপাশের এলাকায় শক্তিশালী অপরাধ নেটওয়ার্ক। তাদের কাছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অসহায়। কর্তৃপক্ষের চোখের সামনে তারা রোগী ভাগিয়ে নিয়ে যায়। তখন কর্তৃপক্ষ জীবন রক্ষার্থে নিরব দর্শকের মত তাকিয়ে থাকেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার সরেজমিনে পঙ্গু হাসপাতালে রোগী, চিকিত্সক, নার্স ও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপকালে তারা দালালদের দীর্ঘদিন রোগী ভাগিয়ে নেয়ার পুরা কাহিনীসহ বিস্তারিত তথ্য জানান।
কেরানীগঞ্জ কলাতিয়ার নাজিরপাড়া এলাকার গীতা রানির ছেলে আপনের (১১) দুর্ঘটনায় ডান হাত ভেঙ্গে যায়। দুই সপ্তাহ আগে পঙ্গু হাসপাতালে ছেলেকে নিয়ে আসেন। দালাল জাফর জরুরি বিভাগে গীতা রানিকে বলেন, এখানে চিকিত্সা ভাল হয় না। ডাক্তার থাকে না, ছাত্ররা অপারেশন করে। আপনার ছেলের হাত কেটে ফেলবে। বাইরে আমেরিকার ডিগ্রীধারী বড় ডাক্তার রয়েছে। দ্রুত আপনার পুত্রের হাত ভাল হয়ে যাবে। দালারের কথায় গীতা রানি রাজি হয়।
দালাল জাফরের কথামত তার সঙ্গে পুত্র আপনকে নিয়ে আগারগাঁও মরিয়ম অর্থোপেডিক এন্ড জেনারেলে নিয়ে যায়। সেখানে ভুয়া অর্থোপেডিক প্রফেসর আকরাম হোসেন আপনের হাতের ব্যান্ডেজ করে। ভিজিট নেয় ৬শ’ টাকা এবং ব্যান্ডেজ করতে ৪শ টাকা নেয়। পুরা টাকা না থাকায় দালাল গীতা রানির কানের দুল রেখে দেয়। দুই সপ্তাহ পর গতকাল আসতে বলে। ভুয়া প্রফেসর আকরামের কথামত গতকাল তারা আগারগাঁও হাসপাতালে গিয়ে গীতা রানি দেখে হাসপাতাল বন্ধ। পরে পঙ্গু হাসপাতাল বহির্বিভাগে এসে দালাল জাফরকে গীতা রানি জানায়, ডাক্তার আকরাম তার ছেলের ব্যান্ডেজ করার পর হাত ফুলে গেছে। উত্তরে দালাল জাফর গীতা রানিকে জানায় যে, প্রফেসর আকরাম এখন জেলে রয়েছে। জেল থেকে বের হয়ে আসলে আপনার পুত্রের চিকিত্সা করবেন।
ইতিমধ্যে র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আনোয়ার পাশা অভিযান চালিয়ে ভুয়া অর্থোপেডিক প্রফেসর আকরামকে আটক করে এবং ২ বছর কারাদণ্ড দিয়ে জেলে পাঠিয়ে দেন। তিনি সেই ভুয়া অর্থোপেডিক প্রফেসর মাত্র মেট্রিক পাস। গতকাল দালাল জাফরের কাছ থেকে অন্য রোগীর অভিভাবকের সহযোগিতায় কানের দুলের পরিবর্তে তার মোবাইল ফোনটি নিয়ে নেয় গীতা রানি। শেওড়াপাড়ার আরেক রোগী হূদয় বহির্বিভাগে দালালের খপ্পরে পড়েন। দালাল তাকে একই কথা বলে স্থানীয় সেবিকা হাসপাতালে নিয়ে যায়। তার ভাগ্যে কি ঘটেছে জানা যায়নি।
পঙ্গু হাসপাতালে চিকিত্সাধীন ৫ জন রোগী ইত্তেফাককে জানান, পরীক্ষা করতে দালালরা বাইরে নিয়ে ড্রেসিং করতে দালালের মাধমে টাকা দিতে হয়। কর্মচারীদের বেশিরভাগ দালাল ব্যবসায় জড়িত। দালালদের নিয়ন্ত্রণে চলে সব বলে রোগীরা জানান।
পঙ্গু হাসপাতালে আশেপাশে একডজন বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক রয়েছে। এসকল ক্লিনিক ও হাসপাতালে আকরামের মত ভুয়া প্রফেসর দ্বারা চিকিত্সা সেবা চলছে। রোগীদের ভাগ্যে কি ঘটছে আল্লাহ জানে বলে পঙ্গু হাসপাতালের দুই জন অধ্যাপক জানান। দালালদের দৌরাত্ম্যে তারা অসহায়। পঙ্গু হাসপাতাল পরিচালক অধ্যাপক ডা. আব্দুল আউয়াল রিজভি বলেন, দালাল চক্র এখানে খুব শক্তিশালী। প্রশাসনে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়ে কোন লাভ হয়নি বলে তিনি জানান।
অভিযোগ উঠেছে, হাসপাতাল প্রবেশ গেটে গড়ে উঠেছে দালাল চক্রের অবৈধ দোকানপাঠ। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা প্রতিমাসে পাচ্ছেন মোটা অংকের চাঁদা। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা হচ্ছে দালালদের নেপথ্যে ক্ষমতার উত্স। পঙ্গু হাসপাতালের কিছু সংখ্যক চিকিত্সক দালালদের মাধ্যমে রোগী ভাগিয়ে নেয়ার বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। এমন তথ্য এক কর্মকর্তা জানান। আগত রোগীদের নিরাপত্তা ও হয়রানি বন্ধে দালালদের বিরুদ্ধে র্যাবের মাধ্যমে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।