জাল টাকায় তিন বিয়ে এবং ১০ মাসের শিশুর কারাবাস

শিশু সীমান্ত। বয়স দশ মাস। মহানগর গোয়েন্দা দফতরে একজন মহিলা কনস্টেবলের কোলে কাঁদছিল। আর পাশের রুমে একটি টেলিভিশনের ক্যামেরার সামনে সাক্ষাত্কার দিচ্ছিলো মা শারমিন আক্তার । শিশুটির কান্না থামার নিরন্তর চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন মহিলা কনস্টেবল। এক পর্যায়ে তিনি দুই হাতে বুকে জড়িয়ে পায়চারি করায় কান্না থামে সীমান্তের । আধা ঘন্টা পর ফিরে আসে মা। এ দৃশ্যটি মহানগর গোয়েন্দা দফতরের। জালটাকা তৈরির অভিযোগে গোয়েন্দা পুলিশ গ্রেফতার করে সীমান্তের মা শারমিন আক্তার ও সত্মা নার্গিস আক্তারসহ তিনজনকে। তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে গোয়েন্দারা। রিমান্ড শেষে আজ শুক্রবার তাদের পাঠানো হবে আদালতে। হয়তো আদালতের নির্দেশে পাঠানো হবে কারাগারে। মায়ের সঙ্গে শিশু সীমান্তকে থাকতে হবে কারাবাসে। গোয়েন্দা দফতরে প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় সীমান্তের মা শারমিন আক্তারের। বিশ বছর বয়সী সীমান্তের মা কথা বলতে গিয়ে জানালের তার স্বামী মোহাম্মদ পলাশ মিয়ার নানা অপকর্মের কথা। অবশ্য জালটাকা প্রস্তুতকারী পলাশকে গতকাল পর্যন্ত পুলিশ গ্রেফতার করতে পারেনি। শারমিন আক্তার বলেন, তারা মিরপুরের স্থায়ী বাসিন্দা। তাদেরই মহল্লায় এক সময় ভাড়া থাকতো পলাশ। দেড় বছর আগে প্রেম করে তাকে বিয়ে করেন। কিন্তু বিয়ের পর জানতে পারেন পলাশ আরও দুটি বিয়ে করেছে। নিজেকে ধনাঢ্য ব্যবসায়ি পরিচয় দিলেও আসলে সে একজন জালটাকার ব্যবসায়ি। জালটাকাসহ আগেও একাধিকবার পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে জেলে গেছে। এসব কথা জানার পর তখন আর বাবা মার ঘরে ফিরে যাওয়াও সম্ভব ছিল না। শেষটায় স্বামীর কারণেই জড়িয়ে পড়েন জালটাকার ব্যবসায়। শারমিনের সঙ্গে কথা বলার সময় পাশেই বসাছিলেন পলাশের প্রথম স্ত্রী নার্গিস আক্তার। চার সন্তানের মা। স্বামীর কথা বলতে গিয়ে তিনি একই ধরনের অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, প্রায় দশ বছর ধরে পলাশ জালটাকার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। বিয়ের আগে তিনি কিছুই জানতেন না। পলাশের চালচলন আর কথাবার্তা শুনে তিনিও প্রেমে পড়ে বিয়ে করেন। কিন্তু পলাশের অপকর্মের কথা যখন জানলেন, তখন আর ফেরার কোন পথ ছিল না। মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এডিসি মশিউর রহমান জানান, পলাশ এক সময় জালটাকা সংগ্রহ করে বাজারজাত করতো। পরবর্তীতে সে নিজেই জালটাকা তৈরি শুরু করে। ২০১১ সালে ৫২ লাখ টাকার জালনোটসহ গ্রেফতার হয়েছিল। পরে জামিনে ছাড়া পেয়ে আবার শুরু করে জালটাকার ব্যবসা। আর এই জালটাকার ব্যবসা করে তিনটি বিয়ে করেছে। তার প্রথম স্ত্রী নার্গিস আক্তার, দ্বিতীয় স্ত্রী সুমা আক্তার ও ছোট স্ত্রী শারমিন আক্তার। এরমধ্যে প্রথম স্ত্রী ও ছোট স্ত্রী থাকে কল্যাণপুরের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে। দ্বিতীয় স্ত্রীর বাসাও ঐ এলাকায়। জালটাকা বাজারজাত করতে তিন স্ত্রীকে ব্যবহার করতো। এছাড়া রয়েছে তার বেশ কয়েকজন রক্ষিতা। মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার এ কে এম মাহবুবুর রহমান বলেন, শারমিন আক্তার ও নার্গিস আক্তারের হেফাজত থেকেই উদ্ধার করা হয় ২৩ লাখ জালটাকা, প্রায় দেড় কোটি জালটাকা বানানের উপযোগী জলছাপ, বাংলাদেশ ব্যাংকের মনোগ্রাম সম্বলিত বিশেষ কাগজ, একটি ডেক্সটপ, একটি মনিটর, ৪টি প্রিন্টার, ইপসন রংয়ের বিভিন্ন ধরনের তিন হাজার কার্টিজ, বিভিন্ন বোর্ড ৫টি, স্ক্রিন প্রিন্টের রং টানার রাবার ৩টি, জালটাকা ছাপানোর কাজে ব্যবহূত নেগেটিভ, কার্টার ব্লেড, তরল রিডিউচারসহ বিভিন্ন সরঞ্জামাদি। তিনি আরও বলেন, দশ মাসের শিশুকে তো কারো কাছে রেখে আসা সম্ভব না। বরং শিশুটির জন্য পুলিশকে পড়তে হয়েছে সমস্যায়। তার জন্য ব্যবস্থা করতে হয়েছে দুধ ও ফিডারের। আজ রিমান্ড শেষে শারমিন আক্তার, নার্গিস আক্তারকে আদালতে পাঠানো হবে। গত ২২ তারিখ ডিবি এডিসি মশিউর রহমান ও সহকারী পুলিশ কমিশনার এ কে এম মাহবুবুর রহমানের নেতৃত্বে পল্টন এলাকা থেকে দুই লাখ টাকার জালনোটসহ গ্রেফতার করা হয় পলাশের সহযোগী ইব্রাহিমকে। তার দেয়া তথ্যমতে কল্যাণপুর থেকে গ্রেফতার হয় নার্গিস আক্তার ও শারমিন আক্তারকে।