বাঙালি নারীর কাছে শাড়ির আবেদন চিরকালের

ঈদের পোশাকের মধ্যে বাঙালি নারীর কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় শাড়ি। বর্তমানে বাঙালি নারীদের ইন্ডিয়ান, পাকিস্তানি ও ওয়েষ্টার্ণ পোশাকে দেখা গেলেও শাড়ির আবেদন একটুও কমেনি। তবে শাড়ি পড়ার ধরন, শাড়ির পাড়, রং, কারুকাজ ও জমিনে বৈচিত্র্য এসেছে। কিন্তু বাঙালি নারীর শাড়ির প্রতি চাহিদা ও আকর্ষণ একটুও বদলায়নি। বরং দিন দিন তা বেড়েই চলেছে। বাঙালি নারীর কাছে শাড়ির আবেদন চিরকালের। শাড়ি ছাড়া যেন বাঙালি নারীর উত্সব উদযাপন পূর্ণতাই পায় না। তাইতো বাঙালির যে কোন উত্সবকে ঘিরে শাড়ির বাজার থাকে সবচেয়ে জমজমাট। এ বছর ঈদে জনপ্রিয়তার শীর্ষে রয়েছে দেশি শাড়ি। নব্বইয়ের দশকে দেশে ভারতীয় শাড়ির বাজার কিছুটা বিস্তৃতি লাভ করে। এরপর সেই বাজার দখল করে নেয় দেশি বুটিক হাউজগুলো। তাদের নিজস্ব ডিজাইন, দেশি রং, হাতের কাজ আর সাধ্যের মধ্যে দাম বলে দেশি তাঁতের শাড়ির চাহিদা হয় আকাশ ছোঁয়া। শাড়িপ্রেমী নারীদের কাছে তাই টাঙ্গাইল, তাঁত ও জামদানী শাড়ির কদর সবসময় বেশি। আর এই তাঁতের শাড়ি ক্রেতাদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলতে দেশের বুটিক হাউজগুলো অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। শাড়ির প্রচলন কখন কোথায় কীভাবে শুরু হয়েছিল, এর সঠিক ইতিহাস জানা না গেলেও অনুমান করা যায়—বাঙালির নারীর জীবনে শাড়ির আবেদন অনেক পুরনো। আজও বাঙালি নারীর প্রথম পছন্দের পোশাক শাড়ি। একজন বাঙালি নারীর পরিচয় ফুটে ওঠে এই ১২ হাতের পরিধেয় শাড়ির ভেতর দিয়ে। রাজধানীর শপিং মল ও বুটিক হাউজগুলো গতকাল শুক্রবার ঘুরে দেখা যায় শাড়ি কেনায় পিছিয়ে নেই মেয়েরা। এবার গরমের সময় ঈদ হওয়ায় দেশি তাঁতের শাড়ি, টাঙ্গাইল ও জামদানীর বাজার বেশ চড়া। ঈদকে ঘিরে শাড়ি বিক্রিও বেড়েছে বলে ব্যবসায়ীরা জানান। তারা বলেন, হাল্কা সবগুলো রংয়ের শাড়িই চলছে বেশি। এদিকে দেশের সবগুলো নামিদামী বুটিক হাউজ বাজারে এনেছে সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে আভিজাত্য আর রকমারি সব ডিজাইনের তাঁতের শাড়ি। যা রীতিমত আধুনিকতার চমক নিয়ে এসেছে। দেশি বুটিক হাউজ আড়ং, নিত্যউপহার, দেশাল, কে ক্রাফট, রঙ, প্রবর্তনা, অরণ্য, অঞ্জনস, বাংলার মেলা, নগরদোলা, সাদাকালো, গাঁওগেরামসহ সব বুটিক হাউজগুলো তাঁতের শাড়ি নিয়ে প্রতিনিয়ত করছে নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা।ফ্যাশন হাউসগুলো ঈদ আয়োজনে রেখেছে শাড়ির রকমারি সংগ্রহ। শাড়িতে এপ্লিকের কাজ, পুঁতি ও চুমকি বসানো, কুরুশ কাটার কাজও রয়েছে। সুতি বা এন্ডি সুতির শাড়িতে এপ্লিকের ব্যবহার করা হয়েছে সফট সিল্ক কাপড় দিয়ে ও সিল্ক সুতার বুননে। আর সিল্ক বা এন্ডি সিল্কের কাপড়ে এপ্লিকের ব্যবহার করা হয়েছে ম্যাট সুতি কাপড় দিয়ে। ফলে প্রতিটি কাপড় ক্রেতাদের কাছে উপস্থিত হয়েছে এক ভিন্ন মাত্রার সৌন্দর্য নিয়ে। বেইলি রোড়ের টাংগাইল শাড়ি কুটিরের এক বিক্রয়কর্মী বলেন, এবার ঈদের বিক্রয়ের শীর্ষে রয়েছে জামদানী শাড়ি। এই শাড়ি তরুণী থেকে শুরু করে মা-খালারা সবাই স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যবহার করতে পারেন। এছাড়া সব ধরনের উত্সব ও অনুষ্ঠানে এই শাড়ি পড়া যায় বলে জামদানী শাড়ির চাহিদাই বেশি। ধানমণ্ডি থেকে বেইলি রোডে শাড়ি কিনতে এসেছেন জান্নাতুন ফেরদৌস। তিনি বলেন, আমি যখন ছোট ছিলাম তখন মায়ের সঙ্গে এখানে শাড়ি কিনতে আসতাম। এখন আমার মেয়েকে নিয়ে এসেছি জামদানী শাড়ি কিনতে। আমরা মা-মেয়ে একই শাড়ি পড়তে পারি। কারণ আমার মেয়ের সব ধরনের হাল্কা রংয়ের শাড়ি পছন্দ। আমরা সবসময় বেইলি রোড থেকেই শাড়ি কিনি। বেইলি রোডের শাড়ির দোকান অনন্যা, বুনন, বেইলি শাড়ি কুটির, উত্সব, বধুয়া, সজনী, বৈশাখী, তাঁত সম্ভার, পলক, ঝলক, নোলক, রমণী প্রভৃতি দোকানেও বিক্রি বেশ ভাল বলে বিক্রয় প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন। তবে মেয়েদের শাড়ির মূল বাজার রাজধানীর গাউছিয়া ও ধানমন্ডি হকার্স মাকের্ট। সব শ্রেণীর সব ক্রেতার জন্য এখানে রয়েছে নানা ধরন ও দামের শাড়ি। ঈদ উপলক্ষে এ মার্কেটের ব্যবসায়ীরা ইতিমধ্যেই জামদানী, কাতান, সিল্ক, তসর, তাত, জর্জেট, বেনারসী, টিসু কাতান, ফুলপরী, টাঙ্গাইল ও রাজশাহী সিল্ক, বালু চুরি, রকমারি শাড়ি তুলেছেন দোকানে। এগুলোর মূল্য ৫৫০ টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকার মধ্যে। এছাড়া সাধারণ সুতির শাড়িও পাওয়া যাচ্ছে ২৫০টাকা থেকে ১৫০০ টাকায়। এছাড়া দেশি শাড়ির পাশাপাশি ভারতীয় শাড়ির বিক্রিও বেড়েছে। জর্জেট, সিল্ক, শিফন প্রভৃতি শাড়িতে জমকালো ডিজাইনের শাড়িও ঈদ উপলক্ষে ভাল বিক্রি হচ্ছে। শিফন শাড়িতে ষ্টোন বসানো এবং ভেলভেটের শাড়িতে ষ্টোনের কাজের শাড়ি বিক্রি বেশি। রাজধানীর গাউছিয়া মার্কেট, নিউ মার্কেট, বসুন্ধরা সিটি শপিং মলসহ প্রতিটি অভিজাত মার্কেট, মল ও দোকানে রয়েছে এসব শাড়ির কালেকশন। এসব শাড়ির দাম পড়ে ১৫০০ টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত। বসুন্ধরা সিটির লেভেল ফোরে ‘নিউ দুলহান শাড়িস’র বিক্রয়কর্মী মো. জামান বলেন, আমাদের দোকানে সব ভারতীয় শাড়ির সংগ্রহ। কারণ ক্রেতারা এই মার্কেটে আসেন ভারতীয় শাড়ি কিনতে। তাই তাদের কথা চিন্তা করে এসব শাড়ি দোকানে রাখা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, বেশি চলছে শিফন শাড়িতে ষ্টোন বসানো এবং ভেলভেটের শাড়ির ওপরে ষ্টোনের কাজ করা শাড়িগুলো।