প্রসঙ্গ :নির্বাচনকালীন সরকার ও সংসদ

নির্বাচন করতে সংবিধান সংশোধন অপরিহার্য

আগামী জাতীয় নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনে সরকার বিরোধী দলের দাবি না মানলেও অনেক প্রশ্নের উত্তর এখনও অস্পষ্ট। নির্বাচনের সময় সংসদ বহাল থাকবে কি থাকবে না, বর্তমান সংসদের সদস্যরা নির্বাচনের সময়ও এমপি থাকবেন কি থাকবেন না, বর্তমান মন্ত্রিসভা বহাল থাকবে, না এর কলেবরে পরিবর্তন আসবে, কলেবরে পরিবর্তন আনা হলে কিভাবে আনা হবে এবং সেই সরকারের ক্ষমতা কি থাকবে- ইত্যাদি প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব এখনও মিলছে না। এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে যে বলা হচ্ছে, নির্বাচনের আগেই সংসদ ভেঙ্গে দেয়া হবে, ছোট আকারের একটি মন্ত্রিসভা অন্তর্বর্তী সরকার হিসেবে দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করবে। আর এসব বক্তব্যের সঙ্গে সংবিধানের স্পষ্ট অসামঞ্জস্য রয়েছে। তবে নির্বাচন করতে হলে সংবিধান সংশোধন অপরিহার্য। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি সংসদের ভেতরে-বাইরে একাধিকবার বলেছেন, ‘নির্বাচনের আগেই সংসদ ভেঙ্গে দেয়া হবে। সময়মত তিনি সংসদ ভেঙ্গে দেয়ার জন্য রাষ্ট্রপতিকে অনুরোধ জানাবেন, রাষ্ট্রপতি তখন সংসদ ভেঙ্গে দেবেন। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছেন, নির্বাচনের সময় ছোট আকারের একটি মন্ত্রিসভা থাকবে, তারা শুধু রুটিন ওয়ার্ক করবে, নির্বাচন করবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)’। তবে সংবিধানের দিকে তাকালে প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের সঙ্গে অমিল পরিলক্ষিত হয়। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পর সংবিধানে বলা আছে ‘মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভাংগিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাংগিয়া যাইবার পূর্ববর্তী নব্বইদিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে।’ যার সরল অর্থ দাঁড়ায়, বর্তমান মহাজোট সরকারের মেয়াদের শেষ ৯০ দিনে দশম জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সেক্ষেত্রে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী, তার মন্ত্রিসভা ও বর্তমান সংসদ সদস্য সবাই ওই ৯০ দিনে স্বপদে বহাল থাকবেন। স্ব-স্ব পদে বহাল থেকেই তারা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা সম্পর্কে সংবিধানের অনুচ্ছেদ এবং সরকারের বক্তব্য সম্পর্কে ড. কামাল হোসেন গতকাল শুক্রবার লন্ডন থেকে টেলিফোনে ইত্তেফাককে বলেন, ‘সরকার এসব বক্তব্য বানাচ্ছে, যা স্ববিরোধী ও সংবিধানের সঙ্গে মিল নেই। এসব প্রশ্ন নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টির মাধ্যমে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, এসব বিতর্ক থেকে জনগণকে মুক্তি দিতে হবে। সরকার যেসব কথা বলছে এবং সংবিধানে যা বলা রয়েছে তা গ্রহণযোগ্য কিনা, সে বিষয়ে জনমত নেয়া উচিত। বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়া স্পষ্ট করেই বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচন হতে দেয়া হবে না, নির্বাচন হতে হবে নির্দলীয় সরকারের অধীনেই’। জবাবে সরকার বলছে, ‘এক ঘণ্টার জন্যও অনির্বাচিত কোনো সরকারের হাতে ক্ষমতা দেয়া হবে না’। সরকারের এই বক্তব্য সম্পর্কে অনেকের প্রশ্ন, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী যদি নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙ্গে দেয়া হয় তাহলে তো তিনি (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা)সহ তার মন্ত্রিসভার সকল সদস্যই তখন অনির্বাচিত হয়ে যাবেন। তাছাড়া সংসদ ভেঙ্গে দেয়া হলে তো সরকারই থাকে না, আর আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে যে অন্তর্বর্তী সরকারের কথা বলা হচ্ছে সংবিধানের কোথাও সে বিষয়ে কিছুই বলা নেই। এ প্রসঙ্গে ব্যারিস্টার আমীর উল ইসলাম গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, সংবিধান অনুযায়ীই নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙ্গে দেয়া যাবে, এনিয়ে কোনো জটিলতা নেই। সংসদ ভেঙ্গে দেয়া হলে বর্তমান এমপিরা আর কেউ এমপি থাকবেন না। তবে প্রধানমন্ত্রী ও তার মন্ত্রিসভা বহাল থাকবে। সংসদ না থাকলেও তাদের অনির্বাচিত বলা যাবে না, যেহেতু জনগণের ভোটে তারা পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত। কিন্তু পাঁচ বছর পূরণ হবার আগেই অর্থাত্ ৪ বছর ৯ মাসেই তারা সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে নির্বাচন করবেন। সেজন্য এরপরেও যে কিছুদিন তারা থাকবেন তা তাদের মেয়াদেরই ধারাবাহিকতা। বিষয়টিকে সে হিসেবেই আমাদের চিহ্নিত করতে হবে। এটিই হচ্ছে নির্বাচিত সরকারের অধীনে নির্বাচনের মূল স্পিরিট। তবে ড. শাহ্্দীন মালিকের মতে, বর্তমান সংবিধানে নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের বাইরে অন্যকোন ব্যবস্থা নেই। নির্বাচিত এমপি ছাড়া কোন সরকার ব্যবস্থা এতে রাখাও হয়নি। নির্বাচিত সংসদ মানে দলীয় সরকার। বিএনপি দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবে না বলেছে। এখানে ‘তত্ত্বাবধায়ক’ বা ‘অন্তর্বর্তী’ নাম মুখ্য নয়। মুখ্য হল দলীয় নাকি নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে। দলীয় সরকার না হলে সেক্ষেত্রে সংবিধান সংশোধন করতেই হবে। তিনি আরও বলেন, এখন সংবিধানে যেটি আছে তা হল কেউ এমপি থেকেই নির্বাচন করবে, আবার কেউ এমপি না হয়ে নির্বাচন করবে। এই ব্যবস্থা দুনিয়ার কোথাও নেই। তাছাড়া দুই প্রতিদ্বন্দ্বির একজন এমপি, আরেকজন এমপি নন-এক্ষেত্রে নির্বাচনের জন্য সমতল মাঠ তৈরি করতে নির্বাচন কমিশনকেও জটিলতায় পড়তে হবে। এদিকে সংবিধান সংশোধন করা না হলে বর্তমান সরকারের মেয়াদের শেষ ৯০ দিনে জাতীয় সংসদের অধিবেশন ডাকার ক্ষেত্রে কী হবে তাও স্পষ্ট নয়। কারণ সংবিধান অনুযায়ী একটি অধিবেশন শেষ হবার ৬০ দিনের মধ্যে পরবর্তী অধিবেশন আহ্বানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।