জেলায় জেলায় নির্বাচনী প্রস্তুতি

বরিশাল :আওয়ামী লীগে হতাশা, চাঙ্গা বিএনপি

আগামী সংসদ নির্বাচন নিয়ে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি’র কেন্দ ীয় নেতৃবৃন্দ সংশয়ের মাঝে থাকলেও তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত। জেলায় জাতীয় সংসদের ৬টি আসনের মধ্যে গত নির্বাচনে বিএনপি দু’টি, জাতীয় পার্টি (এ) সমর্থিত দু’টি ও আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা দু’টি আসনে জয় পেয়েছিল। ছয়টি আসনের মধ্যে মর্যাদার আসন হিসাবে পরিচিত সদর আসন কিন্তু সদ্য সমাপ্ত সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের শক্তিশালী প্রার্থী শওকত হোসেন হিরন বিএনপি’র দুর্বল প্রার্থী আহসান হাবিব কামালের কাছে হেরে যাওয়ায় নেতা-কর্মীরা হতাশ হয়ে পড়েছেন। সিটি নির্বাচনের প্রভাব শুধু জেলার ৬ আসন নয়, পুরো দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি আসনের উপরই পড়তে পারে- এমন আশংকা করছেন খোদ ক্ষমতাসীন দলের এমপিরা। বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সংসদ সদস্য তালুকদার মোহম্মদ ইউনুচ ও সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল-ইসলাম জ্যাকব জানান, সিটি নির্বাচনে শওকত হোসেন হিরনের পরাজয় তাদের চরম হতাশ করেছে। এত উন্নয়নের পর মেয়র প্রার্থীর পরাজয়ে নেতাদের পাশাপাশি হতাশ হয়েছেন মাঠ কর্মীরা। এরমধ্যে প্রার্থী নিয়ে চরম মতানৈক্য বিরাজ করছে দলের অভ্যন্তরে। শওকত হোসেন হিরন পরাজিত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে ঢাকায় গিয়ে সাক্ষাত্ শেষে জানিয়েছিলেন তাকে সদর আসনের প্রার্থী হওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী প্রস্তুত হতে বলছেন। এর পরে অবশ্য হিরন তার ঘনিষ্ঠজনদের বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনি সদর আসনের প্রার্থী হবেন না। এ অবস্থায় জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাবেক চীফ হুইপ আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর নাম শোনা গেলেও তিনিও এ আসনে প্রার্থী হবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন। হেভিওয়েট দুই প্রার্থী যখন বিএনপি’র বর্তমান এমপি মজিবর রহমান সরোয়ারকে মোকাবিলা করতে রাজি নন তখন মনোনয়ন পেতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন বরিশাল চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি সাইদুর রহমান রিন্টু, মশিউর রহমান খান, বিগত নির্বাচনের পরাজিত প্রার্থী কর্নেল (অব:) জাহিদ ফারুক শামীম। এদের বাইরে শোনা যাচ্ছে মাহবুব উদ্দিন আহমেদ (বীর বিক্রম) ও তালুকদার মোহম্মদ ইউনুচসহ কয়েকজন বর্ষীয়ান নেতার নাম। গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের গণজোয়ারের মাঝেও সদর আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী কর্নেল (অব:) জাহিদ ফারুক শামীম পেয়েছিলেন ৯৯ হাজার ৩৯৩ ভোট। তখন বিএনপির মজিবর রহমান সরোয়ার ১ লাখ ৫ হাজার ৬৯৪ ভোট পেয়ে টানা চতুর্থবারের মত সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ সালের নির্বাচনে সরোয়ার আওয়ামী লীগ প্রার্থী শওকত হোসেন হিরনকে ৫৮ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন। ১৯৯৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে অনুষ্ঠিত উপ-নির্বাচনেও তত্কালীন ক্ষমতাসীন দলীয় প্রার্থীকে পরাজিত করে বিজয়ী হয়েছিলেন সরোয়ার। বিএনপি’র দুর্গ হিসাবে পরিচিত এ আসনে ১৯৯৬ সালে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতির ছেলে বিএনপি নেতা ডা: এহতেশামুল হক নাসিম বিশ্বাস, ১৯৯১ সালে এমপি হয়েছিলেন আবদুর রহমান বিশ্বাস এবং একই বছর উপ-নির্বাচনে পিতার চেয়ে বেশি ভোট পেয়ে এমপি নির্বাচিত হন পুত্র নাসিম বিশ্বাস। এবারও মজিবর রহমান সরোয়ারই প্রার্থী হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন বিএনপি’র নেতৃবৃন্দ। বরিশাল-৫ (সদর) আসনে সর্বশেষ হালনাগাদ ভোটার রয়েছে ৩ লাখ ১২ হাজার ৬০৬ জন। এরমধ্যে সিটি করপোরেশন এলাকায় ২ লাখ ১১ হাজার ২৫৭ ভোটারের মধ্যে এক লাখ ৫৫ হাজার ১২৬ জন সিটি নির্বাচনে ভোট প্রদান করেছেন। সদ্য সমাপ্ত ভোট যুদ্ধে ১৭ হাজার ১০ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী মেয়র আহসান হাবিব কামাল জানান, আগামী সংসদ নির্বাচনে তারা আরো অনেক বেশি ভোটের ব্যবধানে আওয়ামী লীগকে পরাজিত করবেন। সিটি নির্বাচনে বিএনপির নেতা-কর্মীরা র্যাব-পুলিশের হয়রানির কারণে সঠিকভাবে কাজ করতে পারেনি। এখন তারা পুরোদমে চাঙ্গা। তিনি বলেন, এ আসনে সরোয়ার প্রার্থী হবেন। নির্বাচনে সরোয়ারকে বিপুল ভোটে বিজয় করার লক্ষ্য নিয়ে নেতা-কর্মীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে মাঠে কাজ করছে। মহানগর সভাপতি মজিবর রহমান সরোয়ার এমপি জানান, আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার জন্যই মাঠের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের ব্যাপারে সরোয়ার বলেন, আমি কাউকে শক্তিশালী বা দুর্বল প্রার্থী মনে করি না। একমাত্র জনগণই হচ্ছে সকল ক্ষমতার উত্স। তাদের রায় পেতেই কাজ করছি। বরিশাল-১ (গৗরনদী-আগৈলঝাড়া) আসন থেকে গত নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগ প্রার্থী তালুকদার মোহম্মদ ইউনুছ কোন আসন থেকে মনোনয়ন পাবেন তা চূড়ান্ত হয়নি। গত নির্বাচনে আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর অনুপস্থিতিতে তিনি প্রার্থী হয়েছিলেন। এবার হাসানাত ঐ আসন থেকে নির্বাচন করবেন বলে দলীয় সূত্র আভাস দিয়েছে। এই আসনে বিএনপি’র প্রার্থীও চূড়ান্ত হয়নি। বিগত নির্বাচনের পরাজিত প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সোবহান ও উত্তর জেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান যখন মনোনয়ন পাওয়ার চেষ্টা করছেন তখন দলের সংস্কারপন্থী নেতা সাবেক এমপি জহির উদ্দিন স্বপনও দলে ফিরতে মরিয়া হয়ে উঠছেন। বরিশাল-২ (বানারীপাড়া- উজিরপুর) আসন থেকে গত নির্বাচনের বিজয়ী আওয়ামী লীগের মনিরুল ইসলাম মনি সেখানকার আওয়ামী লীগ ও মহাজোটের শরীকদের সাথে মহা-গণ্ডগোলে জড়িয়ে পড়েছেন। তার হাতে উজিরপুর উপজেলা চেয়ারম্যান জাসদের কেন্দ ীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ বাদল প্রহূত হন। শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের নাতী ফায়াজুল হক রাজু’র সাথে একাধিকবার অপ্রীতিকর ঘটনায় জড়িয়ে পড়েন তিনি। রাজু ঐ আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে আগ্রহী। স্থানীয় আওয়ামী লীগেও চরম কোন্দল বিরাজ করছে। গত নির্বাচনে বরিশাল-১ ও বরিশাল-২ আসন দু’টি আওয়ামী লীগ পেয়েছিল। এবার দু’টি আসনের মধ্যে একটি আসন হাতছাড়া হওয়ার আশংকা করছেন দলের নেতা-কর্মীরা। বরিশাল- ৩ (বাবুগঞ্জ-মুলাদী) আসনে মহাজোটের অন্যতম শরীক জাতীয় পার্টির (এ) প্রেসিডিয়াম সদস্য গোলাম কিবরিয়া টিপু এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। এবার এরশাদ একক যে প্রার্থী ঘোষণা করেছেন তাতে ঐ আসনের প্রার্থী হিসাবে টিপুর নাম নেই। তার উপরে মহাজোটে থাকা না থাকা নিয়ে এরশাদের নানামুখী বক্তব্য মনোনয়ন প্রশ্নে স্থানীয় আওয়ামী লীগকে ভাবিয়ে তুলেছে। মহাজোটের এমপি বহাল থাকায় সেখানে অপর কোন মনোনয়ন প্রত্যাশীর তেমন কোন আনা-গোনা নেই। অথচ চারদলীয় জোটের প্রার্থী হিসাবে দলের ভাইস চেয়ারম্যান বেগম সেলিমা রহমান মাঠ গোছাচ্ছেন। তিনি গত নির্বাচনে টিপুর কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। মহাজোটের শরিক হিসাবে গত নির্বাচনে অপর আসন বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) থেকে জাপা মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। রুহুল আমিন হাওলাদারের সাথে স্থানীয় আওয়ামী লীগের বিরোধের পাশাপাশি উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র ও নারী সাংসদ পারভীন তালুকদারসহ কয়েকজন নেতার কয়েকটি গ্রুপ সেখানে মহাজোটের অবস্থান নড়বড়ে করে দিয়েছে। একই উপজেলায় নারী আসনের এমপি হিসাবে বহাল রয়েছেন রুহুল আমিন হাওলাদারের স্ত্রী নাছরিন জাহান রত্না আমিন। রুহুল আমিন হাওলাদার ইতিমধ্যেই ঐ আসন থেকে তার পরিবর্তে স্ত্রী রত্না আমিন প্রার্থী হবেন বলে ঘোষণা দিয়ে নিজে পটুয়াখালী থেকে প্রার্থী হওয়ার কথা জানিয়েছেন। বাকেরগঞ্জের আওয়ামী লীগ দলীয় সাবেক এমপি মাসুদ রেজার মৃত্যুর পর এখন মনোনয়ন পেতে লবিং করছেন মেজর জেনারেল (অব:) হাফিজ মল্লিক, জাসদের মোহম্মদ মহসিন, পারভীন তালুকদার ও উপজেলা চেয়ারম্যান শামসুল আলম চুন্নুসহ বেশ কয়েকজন। বরিশাল-৪ (হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ) আসনটি বরিশাল সদরের মতই বিএনপি’র দুর্গ হিসাবে পরিচিত। সেখান থেকে গত নির্বাচনের বিজয়ী বিএনপি দলীয় মেজবা উদ্দিন ফরহাদ পুনরায় নির্বাচিত হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আওয়ামী লীগের বিগত নির্বাচনের পরাজিত প্রার্থী মইদুল ইসলাম ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ ীয় সাধারণ সম্পাদক পংকজ দেবনাথসহ আরো কয়েকজন নেতা মনোনয়ন পাওয়ার চেষ্টা করছেন। সিটি নির্বাচনে মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের ভরাডুবির পর আগামী সংসদ নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা হতাশ। পাশাপাশি সিটি নির্বাচনের বিজয় চাঙ্গা করে তুলছে বিরোধী দল বিএনপিকে। তারা নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে মোকাবিলা করতে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নেমেছে। পক্ষান্তরে শাসক দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও সিটি নির্বাচনের পরাজয় কর্মী-সমর্থকদের হতাশ করে তুলেছে। পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটাতে না পারলে বিএনপিকে মোকাবিলা করা আওয়ামী লীগের জন্য মুশকিল হবে বলে দলের নেতা-কর্মীরা মনে করছেন।