নামছে সহস্রাধিক ঝুঁকিপূর্ণ লঞ্চ
প্রকাশ : ২৭ জুলাই ২০১৩, ২৩:২৭
ঈদকে সামনে রেখে নৌপথে নামছে সহস াধিক ঝুঁকিপূর্ণ ও ফিটনেস বিহীন লঞ্চ। ঢাকার আশপাশের ডকইয়ার্ডগুলোতে কয়েক শ’ ফিটনেস বিহীন ও চলাচলের অযোগ্য লঞ্চ মেরামত করা হচ্ছে। রং আর তুলির আচড়ে ঈদ যাত্রী পরিবহনের জন্য এগুলোকে প্রস্তুত করা হচ্ছে। নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান অবশ্য নৌযাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছেন।
ঝুঁকিপূর্ণ লঞ্চের পাশাপাশি অতিরিক্ত যাত্রী বহন লঞ্চ দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরো বাড়াচ্ছে। ঈদের সময় ধারণ ক্ষমতার পাঁচ গুণ বেশি যাত্রী বহন করা হয়। এসব কারণে গত ১৩ বছরে নৌদুর্ঘটনায় মারা গেছে ছয় হাজার মানুষ। নৌদুর্ঘটনা রোধে গত ৩৩ বছরে পাঁচ শতাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও আলোর মুখ দেখেনি একটিও। এর ফলে দেশে প্রতি বছরই নৌদুর্ঘটনার সংখ্যা বাড়ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফিটনেসবিহীন ও চলাচলের অযোগ্য অনেক লঞ্চ মেরামত করা শুরু হয়েছে। ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের ২৭টি ছোটবড় ডকে এসব লঞ্চ মেরামত এবং রং করার কাজ চলছে। সদরঘাটের বিপরীত দিকে বুড়িগঙ্গার তীরের ডকগুলো খুবই ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। ঈদের আগ পর্যন্ত প্রত্যেকটি ডকই একাজের জন্য বুকিং দেয়া হয়েছে। ঈদের আগেই পানিতে ভাসানোর জন্য রাতদিন লঞ্চগুলো মেরামত আর রংয়ের কাজ চলছে। বেবি সাহেবের ডকের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ হোসেন বেবি বলেন, ঈদের আগে লঞ্চের মেরামতের কাজ বেড়ে যায়। ডক ভাড়া নেয়ার জন্য আগে থেকেই লঞ্চ মালিকরা যোগাযোগ করেন। তিনি বলেন, ফিটনেস থাকা এবং না থাকা সব ধরনের লঞ্চই ডকে আসে। চুক্তিতে লঞ্চ মেরামতকারীদের মধ্যে রয়েছেন ‘বিছমিল্লাহ মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের স্বত্বাধিকারী রফিক উদ্দিন ভুঁইয়া। তিনি বলেন, ঈদের আগে আমাদের অনেক চাপ থাকে। মালিকের মতামতের ভিত্তিতে আমরা লঞ্চ মেরামত করি।
কোকোসহ ডি ক্যাটাগরির পাঁচ শতাধিক লঞ্চকে নৌপথে চলাচলের অযোগ্য ঘোষণা করা হলেও কোন সরকারের আমলেই এদের গতিরোধ করতে পারেনি কোন সংস্থা। ২০০৫ সালের লঞ্চের সাথে মূল নকশার অমিল, তলদেশ হালকা, ত্রুটিপূর্ণ ও মরচে ধরার কারণে সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর কোকো নামের ৩টি লঞ্চকে চলাচলে অযোগ্য ও ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে। কিন্তু কোকোসহ অন্যান্য বেশ কয়েকটি লঞ্চকে একদিনের জন্যও চলাচল বন্ধ করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।
২০০৯ সালের ২৭ নভেম্বর নাজিরপুরে ডুবে যাওয়া এমভি কোকো-৪ লঞ্চের যাত্রী ধারণক্ষমতা ছিল ৪৪৬ জন। কিন্তু লঞ্চটিতে আড়াই হাজার যাত্রী বহন করা হয়েছিল। ২০০৫ সালের ১৫ মে আরিচার যমুনা নদীতে ৪শ যাত্রী নিয়ে ডুবে যাওয়া এমএল রায়পুরা লঞ্চের ধারণক্ষমতা ছিল একশ’রও কম। দুর্ঘটনায় পতিত এমএল প্রিন্স অফ পটুয়াখালী, চাঁনপুর, এমভি সালাহউদ্দিন, এমভি নাসরিন লঞ্চেও ধারণক্ষমতার মাত্রাতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করা হয়েছিল। অতি মুনাফার লোভে মালিকরা অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাইয়ে রীতিমতো প্রতিযোগিতায় নামেন। তাদের সিন্ডিকেট বাই রোটেশন পদ্ধতিতে প্রতিটা নদীবন্দর বা ঘাট থেকে লঞ্চ চলাচল নির্ধারণ করে।
শতকরা ৯০ ভাগ ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট তদারকি সংস্থার কর্মকর্তারা সরেজমিনে তদন্ত না করেই মোটা অংকের উেকাচের বিনিময়ে সার্ভে সনদ দিয়ে থাকেন। যাদের সার্ভে সনদ নেই তারা টাকার বিনিময়ে মাসিক বা বার্ষিক ভিত্তিতে টোকেন সংগ্রহ করে লঞ্চ পরিচালনা করেন। সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর, বিআইডব্লিউটিএ এবং বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার জরিপ রিপোর্ট থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
নৌপরিবহন মন্ত্রী শাহজাহান খান বলেন, আসন্ন ঈদ-উল ফিতরে ঘরে ফেরা যাত্রীদের হয়রানি ও দুর্ভোগ বন্ধে নানা কার্যক্রম গ্রহণ করেছে সরকার। ঈদ উপলক্ষে যাত্রী পরিবহন ভাড়া না বাড়াতে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় বিআইডব্লিউটিকে নির্দেশ দিয়েছে। সংস্থার পূর্বনির্ধারিত ভাড়াতেই যাত্রী পরিবহন করতে বলা হয়েছে। কারো বিরুদ্ধে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট লঞ্চ মালিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের জরিপ শাখার সরকারি হিসাব মতে, ৫ হাজার ২৭২টি লঞ্চকে ফিটনেস পরীক্ষার জন্য চিঠি দেয়া হয়। ২০৮২টি নৌযান পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য কাগজপত্র জমা দিলে ১৩৫৪টি লঞ্চকে ত্রুটিপূর্ণ হিসাবে চিহ্নিত করে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়। একই সাথে এদের সার্ভে সনদ ও রুট পারমিট বাতিলের জন্য সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন মহলে সুপারিশ পাঠালেও তা অজ্ঞাত কারণে কার্যকর হয়নি। ২০০৫ সালে কোকো-৪ লঞ্চসহ মোট ৫২৬টি লঞ্চকে ত্রুটিপূর্ণ হিসাবে নোটিস দেয়া হয়। আগের বছর ত্রুটিপূর্ণ ২৭৭টি লঞ্চকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসাবে ঘোষণা করা হয়। ২০০৬ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসাবে ঘোষণা করা হয় আরো ৫৫৪টি লঞ্চকে। ২০০৯ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ১০০৮টি লঞ্চকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়। সব মিলিয়ে সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের দেয়া তথ্যমতে প্রতিদিন নৌপথে গড়ে সহস্রাধিক ঝুঁকিপূর্ণ ও ফিটনেস বিহীন লঞ্চ চলাচল করছে।
বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান ড. শামছুজ্জোহা খন্দকার জানান, আসন্ন ঈদে জনদুর্ভোগ লাঘবে এবং দুর্ঘটনা এড়াতে লঞ্চের ছাদে যাত্রী পরিবহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে লঞ্চ মালিক ও শ্রমিকদের সহায়তা কামনা করা হয়েছে। ঈদে যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয়, বিআইডব্লিউটিএ এবং বিআইডব্লিউটিসি পৃথক পৃথক টাস্কফোর্স গঠন করেছে। উক্ত টাস্কফোর্সের সকল বিষয় তদারকিসহ জেল জরিমানা করার ক্ষমতা থাকবে। এছাড়া যাত্রীদের নিরাপত্তায় ঈদের আগে ও পরে নদীতে টহল ব্যবস্থা জোরদার করা হবে। লক্ষ্য বাস্তবায়নে পুলিশ, র্যাব ও কোস্টগার্ড সদস্যরা একযোগে কাজ করবে।
বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান এম. মজিবুর রহমান বলেন, ৩৫ থেকে ৪২ মিটার দীর্ঘ লঞ্চগুলো তিন তলা হওয়া উচিত নয়। এতে ওপরের দিক ভারি হয়ে যায়। তলদেশে গভীরতা কম থাকলে লঞ্চ হয় ঝুঁকিপূর্ণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. আতিকুর রহমান বলেন, লঞ্চের যে পরিমাণ অংশ পানিতে ডোবার কথা, সেই অংশ না ডুবলে লঞ্চের ভারসাম্য রক্ষা পায় না। ফলে ডুবোচরে ধাক্কা খেয়ে লঞ্চের তলা ফেটে যেতে পারে কিংবা ঝড়ে লঞ্চ উল্টে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশংকা থাকে। লঞ্চ মালিক সমিতির এক কর্মকর্তা বলেন, লঞ্চ মালিকরা লঞ্চের তলা ভারি করার জন্য কিছু কিছু লঞ্চের তলদেশ সিমেন্ট দিয়ে ভারি করলেও পরে ডুবোচরের কারণে মালিকরা তা অপসারণ করতে বাধ্য হন।
সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর, বিআইডব্লিউটিএ এবং বিআইডব্লিউটিসির এক জরিপ রিপোর্টে বলা হয়েছে, ১৯৭৭ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত দেশে ৫২৯টি নৌদুর্ঘটনা ঘটেছে। ১৯৯৬ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত নৌদুর্ঘটনায় মারা গেছে ছয় সহস্রাধিক যাত্রী। পঙ্গুত্বের অভিশাপ বয়ে বেড়াচ্ছে আরো ৫০ সহস্রাধিক মানুষ। বর্ষা মৌসুমে অরক্ষিত ও নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ে দেশের প্রায় পাঁচ হাজার কিলোমিটার নৌপথ। বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করে থাকে নৌপথে।