নানা সমস্যায় বিপর্যস্ত চট্টগ্রামের ২২ চা বাগান

চট্টগ্রামে ২২টি চা বাগান বিভিন্ন সমস্যায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে ৩/৪টি ছাড়া বাকি চা বাগানগুলোতে নিজস্ব বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছে। এছাড়া সরকারের ন্যূনতম অবকাঠামো সুবিধা নিশ্চিত করতে না পারায় চা বাগানে উত্পাদন বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি উপজেলায় ১৭টি, রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় ৩টি, বাঁশখালী উপজেলায় ১টি এবং কাপ্তাই এলাকায় ১টি চা বাগান রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়—চা বাগানগুলোতে বিদ্যুত্ সংকট, গ্যাসের স্বল্পতা, সড়ক ও যোগাযোগে দুরাবস্থা প্রকট রূপ নেয়ায় উত্পাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাছাড়া চা শ্রমিক অপ্রতুলতায় অন্য জেলা থেকে শ্রমিকদের বেশি মজুরি দিয়ে নিয়ে আসতে হচ্ছে। এতে করে চা উত্পাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। তাছাড়া বৃষ্টি চা উত্পাদনের প্রধান নিয়ামক হলেও মাঝে-মধ্যে অনাবৃষ্টি কিংবা অপেক্ষাকৃত কম বৃষ্টি চা উত্পাদনে বিপর্যয় ডেকে আনে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এ বছর বাগানগুলোতে চায়ের উত্পাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশংকা করছেন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেখা যায়, শুধুমাত্র ফটিকছড়ি উপজেলার ২২টি চা বাগানে ২০১২ সালে চা উত্পাদন হয়েছিল প্রায় ৬০ লক্ষ কেজি। এবার উত্পাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬২ লক্ষ কেজি। কিন্তু এবার প্রাকৃতিক ও সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় নিলে ৪২/৪৩ লক্ষ কেজির বেশি উত্পাদন সম্ভব নাও হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। বাংলাদেশ টি এসোসিয়েশনের সভাপতি ও আছিয়া চা বাগানের ব্যবস্থাপক মমতাজুল হাসান মন্টু বলেন, অনাবৃষ্টির কারণে এবার চা উত্পাদন কমে যাবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরো জানা যায়, গত বছর এ সময় পর্যন্ত বৃষ্টি হয়েছিল ৭২ ইঞ্চি। অথচ চলতি বছরে এ সময়ে বৃষ্টি হয়েছে মাত্র ৪২ দশমিক ৮৬ ইঞ্চি। কম বৃষ্টি হওয়ার কারণে বাগানগুলোতে নতুন কুঁড়ি বের হচ্ছে না। চায়ের উত্পাদন বেশি হতে হলে ৯০ থেকে ১০০ ইঞ্চি বৃষ্টিপাতের প্রয়োজন। চট্টগ্রামের অধিকাংশ চা বাগানের যাতায়াত ব্যবস্থা খুবই নাজুক। চা বাগান মালিকরা নিজস্ব উদ্যোগেই অধিকাংশ অভ্যন্তরীণ ও সংযোগ সড়ক নির্মাণসহ সংস্কার করে থাকে। এমনকি স্থানীয় প্রশাসনেরও সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে বরাদ্দ নেই বললেই চলে। ফলে অনেকগুলো চা বাগান এক প্রকার বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, আধারমানিক ও মোহাম্মদনগর এলাকায় বর্ষাকালে যাওয়াই যায় না। অথচ চা বাগান থেকে প্রতি বছর সরকার ভ্যাট ও অন্যান্য কর পেয়ে থাকে। শুধু চা বিক্রির ভ্যাট বাবদ গত বছর সরকার ১৮ কোটি টাকা পেয়েছে। কিন্তু চা বাগানগুলোর উন্নয়ন, সড়ক উন্নয়ন বা যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে তেমন একটা বরাদ্দ দেখা যায় না। ২০০৩ সালে শুধুমাত্র কর্ণফুলী চা বাগানের ৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য সড়ক উন্নয়নে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ১০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ১/১১’র পর সড়ক উন্নয়নের কাজ মাঝপথে বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর হালদা ভ্যালি চা বাগান সড়কটির ইট বসানোর কাজ হলেও অন্য কোন বাগানের সড়ক উন্নয়নে কোন বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। ফলে বাগান মালিকরা তাদের নিজস্ব প্রয়োজনে যতদূর সম্ভব সড়ক সংস্কার বা উন্নয়নের কাজ করে থাকে। চায়ের উত্পাদন বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে থাকে বিদ্যুত্। চা বাগানগুলোতে বিদ্যুতের বর্তমান নাজুক অবস্থায় চায়ের উত্পাদনে ধস নামার আশংকা করা হচ্ছে। চট্টগ্রামের ২২টি চা বাগানের মধ্যে শীর্ষ অবস্থানে থাকা হালদা ভ্যালি চা বাগানের ম্যানেজার জাহাঙ্গীর আলম ইত্তেফাককে বলেন, বিদ্যুত্ সমস্যাকে আমরা সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে দেখছি। বর্তমানে ২৪ ঘণ্টা সময়ের মধ্যে চা বাগানগুলো ৬ ঘণ্টাও বিদ্যুত্ সরবরাহ পায় না। চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতেই রয়েছে সেমুতং গ্যাস ফিল্ড। ১৭টি চা বাগানের মালিকরা দীর্ঘদিন ধরে এই ফিল্ড থেকে গ্যাস সরবরাহের দাবি জানিয়ে আসছে। কিন্তু নেপচুন নামে একটি চা বাগানে গ্যাস সংযোগ দেয়ার পর অন্য কোন বাগানে এখন পর্যন্ত সংযোগ দেয়া হয়নি। বর্তমানে সেমুতং গ্যাস ফিল্ড থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। অথচ সিলেটে বেশিরভাগ চা বাগানে গ্যাস সংযোগ রয়েছে। গ্যাস সংযোগ থাকলে প্রতি কেজি চায়ের উত্পাদন ব্যয় ১৫/২০ টাকা কম হবে বলে মালিকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়।