নারীদের সুরক্ষায় স্বর্ণজয়ী ‘কাইজেন’
সারারা মুশাররাত তূর্ণা এবং মীর রায়হান মাসুদ
প্রকাশ : ২৮ জুলাই ২০১৩, ১৯:৫১
সম্প্রতি হংকংয়ের পলি ইউ বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয় ‘গ্লোবাল স্টুডেন্ট চ্যালেঞ্জ-২০১৩’। এই প্রতিযোগিতায় সারাবিশ্বের ৭০টি দেশের ২২৮টি দল অংশগ্রহণ করে। সেখানে বাংলাদেশ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ’র একটি দল অংশগ্রহণ করে এবং বিজয় ছিনিয়ে আনে। এই প্রতিযোগিতায় তারা কীভাবে অংশগ্রহণ করলেন এবং বিজয় ছিনিয়ে আনলেন কীভাবে তাই নিয়েই আমাদের এই প্রতিবেদনটি লিখেছেন— সারারা মুশাররাত তূর্ণা এবং মীর রায়হান মাসুদ
‘পুরুষের সহধর্মিণী হিসেবে নহে পুরুষের সহকর্মী হিসেবে ধরণীতে আমরা বিচরণ করতে চাই’ ঊনিশ শতকের শেষে ও বিংশ শতকের শুরুর দিকে যে মহীয়সী নারী এই মূলমন্ত্রে সমগ্র নারী জাতিকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন তিনি বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। আজ নারীরা শুধু পুরুষের সহকর্মী হিসেবেই না, কিছু কিছু ক্ষেত্রে তারা পুরুষের চেয়েও এগিয়ে— এই দৃশ্য বেগম রোকেয়া দেখতে পেলে নিশ্চয় অনেকটা নির্ভার হতেন। শুধু রন্ধনশৈলী আর গৃহস্থালীর গন্ডিতে আবদ্ধ নেই বাঙালি নারী। সে আজ বিশ্বজয়ের স্বপ্নে মগ্ন। গৃহকোণে পড়ে না থেকে সে আজ বিশ্বজয় করার পর চন্দ্রজয়ের স্বপ্নে বিভোর।
আমরা স্বপ্ন দেখি নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার জন্য সুন্দর ও নিরাপদ কর্মক্ষেত্রের। যেখানে তারা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে চলেছে। চোখে ভেসে ওঠে এক সমৃদ্ধ বাংলাদেশের ছবি। সেই লক্ষ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ’র ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থী সুমাইয়া তাবাসসুম, সাবরিনা আফরোজ ও দেবজিত্ সাহা তৈরি করেন এমন একটি মডেল যা বাস্তবায়ন করা হলে আপামর বাংলার পোশাকশ্রমিক তো বটেই, সমস্ত তুলনামূলক কম সচ্ছল ও কায়িক শ্রম দেয়া পেশাজীবী নারীদের জন্য বয়ে নিয়ে আসবে স্বস্তি।
বাংলাদেশের রপ্তানি বাজারের চালিকাশক্তি পোশাক শিল্প। এই পোশাক শিল্প থেকে দেশের মোট জিপিডির ১৪ শতাংশ আসে। এই পোশাক শিল্পের সাথে জড়িয়ে আছে ৪০ লক্ষ মানুষের জীবন। জীবন শব্দটা শুনতে যতটা সহজ, বাস্তবে তাদের জন্য জীবন ততোটাই কঠিন সংগ্রামের। খাওয়া দাওয়া, সংসার খরচ, বস্ত্র এসব চাহিদা মেটাতে গিয়ে স্বাস্থ্যের ব্যাপারটা তাদের অগোচরেই থেকে যায়। অনেকেই এমন ধারণা পোষণ করেন, স্বাস্থ্য সেবা শুধুমাত্র সমাজের উঁচুস্তরের জন্যই বরাদ্দ।
এই মেহনতি মানুষের ৮০ ভাগই হচ্ছে নারী পোশাক শ্রমিক। তাদের অস্বাস্থ্যকর জীবনাচরণের দরুন নানান মেয়েলি সমস্যায় ভুগতে হয়। ফলে তারা প্রায়ই তার কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করতে পারে না। এছাড়া মাসিক ঋতুকালীন তাদের স্বাস্থ্যগত অজ্ঞতা ও অসচেতনতার দরুন বেছে নেয় নানা অস্বাস্থ্যকর উপায়। এতে করে তাদের কর্মজীবনে পড়ে বিরূপ প্রভাব, বেতন কেটে নেয়া থেকে শুরু করে চাকরিচ্যুত করে দেয়া হয় অনেককেই। এই সমস্যার কথা চিন্তা করেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ’র তিন শিক্ষার্থী তাদের প্রতিযোগিতার মডেল তৈরি করেন। তারা তাদের এই মডেলের নাম দেন ‘সুরক্ষা’।
মঞ্চটা ছিলো বৈশ্বিক, সম্প্রতি হংকং-এ পলি ইউ গ্লোবাল স্টুডেন্ট চ্যালেঞ্জে অংশ নিয়ে আইবিএর শিক্ষার্থী সুমাইয়া তাবাসসুম, সাবরিনা আফরোজ ও দেবজিত্ সাহা জিতে নেন ২০১৩ সালের ‘গোল্ড মেডেল’। মূলত প্রতিযোগিতাটি ছিলো সৃজনশীলতার মাধ্যমে ব্যবসায়িক প্রকল্প ফুটিয়ে তোলা, যেখানে আমাদের দেশ থেকে একমাত্র গ্রুপ হিসেবে যোগ দেন ‘কাইজেন’। হ্যাঁ, ‘কাইজেন’ একটি জাপানিজ শব্দ, যার বাংলা পরিভাষা হচ্ছে ‘প্রতিনিয়ত উন্নয়ন’। তাদের সাফল্যই বলে দিচ্ছে তারা এখানেই থেমে থাকবেন না।
প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য— কম খরচে ও সহজে নারী পোশাক শ্রমিকদের জন্য স্যানিটারি ন্যাপকিন তৈরি ও বাজারজাতকরণ। যেহেতু পোশাক শ্রমিকেরা স্বাস্থ্যসচেতন নয়, এবং তারা অনেক ক্ষেত্রেই রক্ষণশীল, স্যানিটারি ন্যাপকিনের কথা জানলেও তারা দোকানে গিয়ে পুরুষ দোকানির কাছে বলতে সংকোচ বোধ করে। আর এই সমস্যা দূরীকরণে থাকবে ‘তথ্য পরী’ নামের একটি দল। বিপণনের দায়িত্বটাও থাকবে তাদের উপর। এ প্রসঙ্গে সুমাইয়া বলেন, ‘আমরা শুধু প্রকল্প নিয়েই থেমে থাকছি না, আমাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে পোশাক শ্রমিক, এরপর আমরা অন্যান্য ক্ষেত্রেও নানা শ্রেণির শ্রমিক ও নারীদের হাতে এই পণ্য সুলভে পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা করবো। এই ব্যাপারে অনানুষ্ঠানিকভাবে কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আমাদের সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছেন।’ সাবরিনা বলেন, ‘অন্যান্য দেশ শুধু একটি ক্ষুদ্র বিষয়ের দিকে নজর দিয়েছেন, আমরা আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট বিচার করে সামগ্রিকভাবে শ্রমিক জনগোষ্ঠীর কথা মাথায় রেখে প্রকল্পটা নিয়ে এগিয়েছি, আর এই ব্যাপারটাই বিচারকদের নজর কেড়েছে।’
এই অনবদ্য প্রকল্পের হাত ধরে ‘কাইজেন’ বিচারকদের কাছ থেকে অর্জন করে বিশ্বসেরার পুরস্কার ‘গোল্ড মেডেল’। ‘হেলথ এন্ড ওয়েলনেস’, ‘করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি’, ‘লাইফস্টাইল, এনভায়রনমেন্ট এন্ড সাসটেনেবিলিটি’ এই তিনটি থিমের উপর মূলত পলি ইউ গ্লোবাল স্টুডেন্ট চ্যালেঞ্জে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিটি থিমের জন্য একটি করে দল পুরস্কার লাভ করে এবং সব মিলিয়ে চ্যাম্পিয়ন দলকে দেওয়া হয় গোল্ড মেডেল। বাংলাদেশ প্রথমে পুরস্কার লাভ করে হেলথ ও ওয়েলনেস বিভাগের থিম পুরস্কার এবং সবশেষে চ্যাম্পিয়ন হিসেবে অর্জন করে গোল্ড মেডেল। প্রকল্পটি নিঃসন্দেহে সৃজনশীল ও অত্যন্ত বাস্তবসম্মত। অন্যান্য দেশের প্রতিযোগীরাও আইবিএ’এর এই তিন কৃতী শিক্ষার্থীর প্রকল্পের ভাবনার ভূয়সী প্রশংসা করেন। আর এখানেই সমগ্র বাংলাদেশের নারীদের গর্ব। এখানে ব্যবসায়ী মনোভাবের চেয়ে অনেক বেশি আন্তরিকতা ও নারীত্বের টানের পরিচয় দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। এখন শুধু বাস্তবায়নের অপেক্ষায়। এটি বাস্তবায়ন হলে, শুধু যে নারীদেরই সুবিধা তা নয়, অনুপস্থিতির হার কমে যাওয়ার ফলে গার্মেন্টস মালিকদেরও অনেকটা স্বস্তি দিবে এই প্রকল্প।