এশিয়ায় ধর্মীয় সহিংসতার শংকা
প্রকাশ : ২৮ জুলাই ২০১৩, ২০:৫১
মিয়ানমারের বন্দর শহর সিত্তুয়ের জীবনযাপন এখন বৌদ্ধ রাখাইন ও মুসলিম রোহিঙ্গাদের উপর অনেকাংশে নির্ভর করছে। গত বছরের জুন পর্যন্ত আরাকানের এই রাজধানীতে দুই ধর্মীয় জনগোষ্ঠী অনেকটা পাশাপাশি থেকে জীবন যাপন করে আসছিলো। কিন্তু গত একবছরে বিভিন্ন দাঙ্গার কারণে শহরের অনেক জায়গা এখন মুসলিম শূন্য হয়ে গেছে। এখন শহরের বাইরে বিভিন্ন ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছে সেই মুসলিমরা। গত প্রায় একবছরে রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতনে প্রায় ১০০ জন মুসলিম মারা গেছে এবং ১ লাখের বেশি মুসলিম বাস্তুচ্যুত হয়েছে। অনেকে দাঙ্গার হাত থেকে বাঁচতে মাছধরা নৌকায় পাড়ি জমিয়েছে অজানার উদ্দেশে। গাদাগাদি করে নৌকায় যাওয়ার সময় অনেকেই নদীতে ডুবে মারা যাচ্ছে। যে কারণে মিয়ানমারের অন্য অংশেও এ দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়েছিলো। আর বৌদ্ধদের হাতে মুসলিমদের নির্যাতনের ঘটনা এখন শুধু মিয়ানমারেই ছড়িয়ে পড়ছে তা নয় বরং তা ছড়িয়ে পড়ছে সমগ্র অঞ্চলে। এশিয়ার বিভিন্ন দেশেই এখন এ ধরনের নির্যাতনের ঘটনা ঘটতে পারে।
রোহিঙ্গা ও আরাকানের স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে এ দ্বন্দ্ব হলো ঔপনিবেশিক ও পূর্ব ঔপনিবেশিক বসতি স্থাপনের পরিণতি। এটি খুবই পুরোনো ও স্থানীয় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে যা আগামীদিনেও অব্যাহত থাকতে পারে। মিয়ানমারের পরিস্থিতি এখন অনেকটা শান্ত। দেশটির মোট ছয় কোটির ৫ শতাংশই হলো মুসলিম। কট্টর বৌদ্ধভিক্ষুরা এখন অন্ধ স্বদেশ প্রেমের মতবাদ প্রচার করছে। উত্তরাঞ্চলীয় শহর মান্দালেই এর আশ্রম থেকে উইরাথু নামের ভিক্ষুর এই মতবাদে তারা বৌদ্ধধর্মের সার্বজনীন সমবেদনা ও অহিংসতার মতবাদকে অস্বীকার করছে। তদের কাছে বৌদ্ধ মতবাদ এখন সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের সমান। তাদের বক্তব্য হলো, বৌদ্ধরা এখন লড়াই না করলে মুসলিমরা একসময় পুরো মিয়ানমার ছেয়ে ফেলবে। গত ২২ জুলাই উইরাথুর গাড়ির কাছে একটি ছোট বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। তার দাবি এ ঘটনা মুসলিম চরমপন্থিরা ঘটিয়েছে।
ঊনবিংশ ও বিংশ শতকে এসব মুসলিম মিয়ারমারে আসতে শুরু করে। তারাই মিয়ানমারের অর্থনীতি ও বাণিজ্যের বেশির ভাগ নিয়ন্ত্রণ করতো। যদিও বার্মিজরা এটা পছন্দ করতো না। ১৯৩০ সালে তত্কালীন রেঙ্গুনে প্রথম ভারতীয় ও মুসলিমদের সঙ্গে বার্মিজদের দাঙ্গার ঘটনা ঘটে। তখন থেকেই এ ঘটনা ঘটে আসছে। বর্তমানে উইরাথু ও তার সমার্থকরা বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে বিয়ের প্রথা চালুর জন্য চেষ্টা চালাচ্ছেন। যাতে করে বৌদ্ধ নারীরা অন্য ধর্মের ছেলেকে বিয়ে করতে পারে। এক্ষেত্রে স্বামীকে অবশ্যই বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করতে হবে। মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকারের সময় এ আইন পাসের সামান্যই সম্ভাবনা ছিলো। কিন্তু এখন গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে সে সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে।
এশিয়ার আরেকটি দেশেও একই ধরনের বৌদ্ধ ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক মানসিকতা দেখা দিচ্ছে। সেটি হলো শ্রীলঙ্কা। সেখানে বধু বালা সেনা (বিবিএস) মূলত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের সংগঠন। যার সদস্যরা সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলীজ গোষ্ঠীর। তারা সংখ্যালঘু মুসলিমদের প্রতি সহিষ্ণুতা না দেখানোর মতবাদ গ্রহণ করেছে। যদিও শ্রীলঙ্কায় মোট জনগোষ্ঠীর ১০ শতাংশ মুসলিম। বিবিএস’র নেতাদের দাবি, মুসলিমদের জন্মহার অনেক বেশি। এখানে রয়েছে সিনহালা বৌদ্ধ সংস্কৃতি। এটা সৌদি আরব নয়। তাই এ সংস্কৃতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এমন কিছু মানা হবে না। কয়েকটি নির্দিষ্ট ইস্যুতে তারা ইসলামের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাচ্ছে। তারা মুসলমানদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও মসজিদে হামলার জন্য উস্কানি দিচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের উপর হামলাকে তারা আত্মরক্ষা বলে প্রচার করে। এখন মিয়ানমারেও বিবিএসের মতো সংগঠন চালানোর জন্য আনেক রাজনীতিবিদ প্রস্তুত রয়েছেন।
মিয়ানমার ও শ্রীলঙ্কার মধ্যে যে অন্ধ দেশপ্রেমের মতবাদ রয়েছে তা হয়তো থাইল্যান্ডে স্থায়ী হবে না। তবে মুসলিমরা সংখ্যালঘু থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলীয় চারটি প্রদেশে এ সংঘাত বাড়ছে। ২০০৪ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত সেখানে ৫ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। থাই সেনারা এখানে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে গেছে। মন্দিরগুলো সেনাঘাঁটি হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে। এছাড়া অস্ত্রধারী বৌদ্ধ সংগঠন তো রয়েছেই। চীনেও সংখ্যালঘু উইঘুররা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। তবে দেশে দেশে রোহিঙ্গা ও মুসলিমদের প্রতি সংহতি জানিয়ে আন্দোলন করছে মুসলমানরা। সম্প্রতি ভারতের বিহারে একটি বৌদ্ধ মন্দিরে হামলা মুসলমানরা করেছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ অঞ্চলে ইন্দোনেশিয়ায় সবচেয়ে বেশি মুসলিমের বসবাস। তারা দানের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের সহায়তা করছে।
বর্তমানে ধর্মীয় সংহতির বিষয়টি সহিংসতার রূপ নিচ্ছে। গত মে মাসে জাকার্তায় মিয়ানমার দূতাবাসে হামলার পরিকল্পনার জন্য কয়েকজনকে আটক করা হয়। সম্ভবত তারা কারাবন্দি মুসলিম নেতা আবু বকর বুসেইর সমার্থক। যিনি মিয়ানমারের বৌদ্ধদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেছিলেন। গত ১৯ জুন কিছু চরমপন্থি ইসলামী সংগঠনের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে রোহিঙ্গা নেতারাও ছিলো। আবু সাফিয়া নামে এক রোহিঙ্গা নেতা বলেন, তাদের লোকজন দুর্বল এবং নিরস্ত্র। তাই তাদের বিস্ফোরক এবং প্রশিক্ষণ জরুরি। তার দাবি অস্ত্রধারী ৩শ’ লোক আছে তাদের। জাকার্তাভিত্তিক এক বিশেষজ্ঞের দাবি রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের মতো দলগুলো প্রতিরোধ সংগ্রামে নামতে পারে। যেটা অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়।
চলতি বছরের শুরুর দিকে থাইল্যান্ডে মুসলিম ও সরকারের মধ্যে আনুষ্ঠানিক শান্তি আলোচনা শুরু হয়েছে। শান্তি আলোচনা ও উদার ধর্মীয় চিন্তায় এ ধরনের সহিংসতা পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে। নয়তো অদূর ভবিষ্যতে গোটা এশিয়াকে এর জন্য চরম মূল্য দিতে হবে।