সাব সাহারায় বছরে ১০ লাখ শিশু মাকে হারায়
প্রকাশ : ২৮ জুলাই ২০১৩, ২০:৫৩
ব্রিটিশ রাজপরিবারের শিশুর জন্মকে কেন্দ্র করে বিশ্বব্যাপী উত্সবে মাতোয়ারা। কিন্তু পৃথিবীর দরিদ্র দেশগুলোতে শিশুর জন্ম মানে একটি প্রাণের মৃত্যু। সাব সাহারা আফ্রিকায় প্রতি বছর প্রায় ১ লাখ ৬২ হাজার মা গর্ভাবস্থায় এবং প্রসবকালে মারা যায়। বিশ্বব্যাপী মাতৃমৃত্যুর প্রায় ৫৬ শতাংশই আফ্রিকার। একজন আফ্রিকান নারীর ক্ষেত্রে সন্তান জন্ম দেয়া যেমনি খুব স্বাভাবিক, ঠিক একইভাবে বিপজ্জনকও বটে। এর ফলে প্রতি বছর আফ্রিকার প্রায় ১০ লাখ শিশু মাতৃহীন হচ্ছে। স্টিভ মুরিগি যুক্তরাজ্যের এএমআরইএফের যোগাযোগ বিষয়ক কনসালট্যান্ট। তিনি ২০০৭ সাল থেকে কেনিয়া ও উগান্ডায় এএমআরইএফে কাজ করছেন। স্টিভ মুরিগির মতে, এই মাতৃমৃত্যুর হার অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলেও এর প্রতিরোধ ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। আগের তুলনায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মাতৃমৃত্যু হার অনেকটা কমলেও, আফ্রিকাসহ অনেক উন্নয়নশীল দেশে এখনো আশানুরূপ হারে কমেনি। কার্যকর প্রজনন স্বাস্থ্য সেবার মাধ্যমে আফ্রিকান মায়েদের এই চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করতে দেশটির সরকার ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো একযোগে কাজ করে যাচ্ছে। গত ২০ বছর আগের তুলনায় আফ্রিকায় মাতৃমৃত্যু হার বহুলাংশে কমেছে। তবে এই মাতৃমৃত্যু রোধের সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এখনো দীর্ঘ পথ বাকি। সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ব্যর্থতাই এর মূল কারণ।
২০০১ সালের আবুজা ঘোষণা অনুযায়ী আফ্রিকার দেশগুলো স্বাস্থ্য খাতে জাতীয় বাজেটের ১৫ শতাংশ বরাদ্দ করার অঙ্গীকার করে। কিন্তু এতে অগ্রগতির হার খুবই কম। এ কারণে আফ্রিকার অনেক নারীই গর্ভধারণ এবং বাচ্চা প্রসবের সময় স্বাস্থ্যসেবা ইউনিটগুলোতে সেবা নেয়ার সুযোগ পায় না। সুযোগ পেলেও মাইলকে মাইল পথ পাড়ি দিয়ে নিকটবর্তী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে হয়। সুনির্দিষ্ট পরিবহনের অভাবে অধিকাংশ প্রসূতি মহিলা বাড়িতে অথবা হাসপাতালে নেয়ার পথে বাচ্চা প্রসব করে। বিভিন্ন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে চিরাচরিত প্রাকৃতিক নিয়মে বাচ্চা জন্মদানের প্রথা এখনো বিদ্যমান রয়েছে। সাধারণ লোকই সন্তান জন্মদানে সহায়তা করে। তাদের আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি না থাকায় অধিকাংশ সময় মা ও শিশুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। সন্তানসম্ভবা মায়েরা হাসপাতালে ভর্তির সুযোগ পেলেও হাসপাতালের বিছানাগুলো এতো ছোট যে, বেশিরভাগ সময়ই হাসপাতালের ফ্লোরে বাচ্চা প্রসব করতে হয়। আফ্রিকান মেডিক্যাল এন্ড রিসার্স ফাউন্ডেশনের (এএমআরইএফ) একজন ধাত্রী ইস্থার মাদুদু বলেন, উগান্ডার হাসপাতালগুলোতে বাচ্চা প্রসব করাতে তারা মোবাইল ফোনের আলো বা টর্চ লাইট এবং গ্লাভস হিসেবে প্লাস্টিকের ব্যাগ ব্যবহার করে থাকে। মাদুদু আরো বলেন, স্বাভাবিকভাবে বাচ্চা প্রসব করতে গিয়ে আফ্রিকায় গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৪৪০ জন মা প্রাণ হারান।
মাদুদুর গল্প কাহিনীটি আর দশটা সাধারণ ঘটনা থেকে অনেকটা বেদনাদায়ক। কারণ হাসপাতালগুলোতে বেশিরভাগ সময়ই ডাক্তার থাকে না, ফলে কিছু সংখ্যক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ধাত্রীই প্রসবের কাজ সম্পন্ন করে থাকেন, যা অনেকটা বিপজ্জনক। কম বেতন এবং অধিক খাটাখাটনির ফলে হাসপাতালের কর্মীরা রোগীদের প্রতি খুব একটা আন্তরিক হয় না। ফলে অনেক সময় রোগীরা ভুল চিকিত্সার শিকার হয়। এ কারণে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মায়েরা বাড়িতে বসে বাচ্চা প্রসবকে নিরাপদ বলে মনে করেন। পক্ষান্তরে পশ্চিমা দেশগুলোতে বাচ্চা প্রসবের ৮ থেকে ৯ মাস পূর্বেই প্রসূতি মা এবং তার অনাগত বাচ্চার নিয়মিত চেকআপ থেকে শুরু করে সব ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করা হয়। বাচ্চাকে কত নিরাপদ ভাবে পৃথিবীর আলো দেখানো যায় তা নিয়ে রীতিমত হুলস্থূল লেগে যায়। শুধু এখানেই শেষ নয়, বাচ্চা জন্মের সাথে সাথে চলতে থাকে হাজারো আয়োজন। এএমআরইএফের মতে, আফ্রিকার মতো দেশগুলোর ধাত্রীদের সঠিক প্রশিক্ষণ দিতে পারলে অনেক প্রসূতি মা বেঁচে যাবেন। আর সে লক্ষ্যে এএমআরইএফ ২০১৫ সালের মধ্যে প্রায় ১৫ হাজার ধাত্রীকে সঠিক প্রশিক্ষণ দানের কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। ব্রিটিশ রাজ পরিবারের নবজাতকের জন্ম উত্সব পালন করবো কিন্তু সাব সাহারা আফ্রিকা জুড়ে নিরাপদ মাতৃত্ব ও সুস্থ শিশুর জন্ম নিশ্চিত করা উচিত।