মুম্বাইয়ের ঝুঁকিপূর্ণ বাড়ি
প্রকাশ : ২৮ জুলাই ২০১৩, ২০:৫৩
চলতি বছরের জুলাই থেকে এপ্রিল— এ তিন মাসে ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাইতে ভবনধসে অন্তত একশ’রও বেশি লোক মারা গেছে। ভবন ধসের কারণ খুঁজতে গিয়ে ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসির রিপোর্টার কিনজাল পান্ডে চমকে যাওয়া খবর উদঘাটন করেছেন। এই রিপোর্টে উঠে এসেছে মুম্বাই-এর অধিবাসীরা কেন মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোতে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। বিরাজ ভূষন চুবে মুম্বাইয়ের একটি মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে বাস করেন। মুম্বাই নগর কর্তৃপক্ষের ভাষায় এ ভবনটি অনেক আগেই পরিত্যক্ত। এর পাশ দিয়ে যে কেউ চলতে গেলে ভয়ে তার গা শিরশির করে উঠবে। ইতিমধ্যে নগর কর্তৃপক্ষ ভবনের বাসিন্দাদের সতর্ক করে দিয়েছেন যাতে তারা সেখান থেকে সরে যায়। কিন্তু চুবে এবং অন্য প্রায় ৫০ জন বাসিন্দা এখনো রয়ে গেছেন সেখানে। ১৫০ বর্গফুটের একটি ছোট বাড়িতে সাত বছরের মেয়ে এবং স্ত্রীসহ চুবের বাস। ইতিমধ্যে ভবনটির আস্তর খসে পড়েছে। ছোট রান্নাঘরে তারা যেতে পারেন না কারণ সেখানে গেলেই উপর থেকে ছাদের আস্তর খুলে খুলে পড়ছে। কিন্তু এ কঠিন অবস্থার মধ্যেও চুবে সেখানে বাস করছেন কেন? চুবে বলছেন, ‘আমি এখানে থাকতে বাধ্য হচ্ছি। একটি নতুন বাসা কেনার সামর্থ্য আমার নেই। কারণ আশেপাশের বাড়িগুলো কিনতে গেলে আমার অনেক অর্থ লাগবে। আর এখান থেকে আমার মেয়ের স্কুল অনেক কাছে। এজন্য বাধ্য হয়েই আমি এখানে থাকছি।’
মুম্বাইতে আপনি ভাড়া থাকেন বা নিজে বাড়ি কিনে থাকেন- দুটোতেই খরচ পড়বে বেশি। এশিয়ার অন্যান্য দেশের মতো এখানে জায়গা এবং ফ্লাটের দাম বাড়ছে হু-হু করে। এজন্য অপেক্ষাকৃত কম ভাড়ায় জীর্ণ বাড়িগুলোতে থাকছেন অনেকে। আর এক কোটি ৮০ লাখ অধিবাসীর ৬০ শতাংশই থাকছেন বস্তিতে। এখানকার ১৪ হাজার বাড়ি ৭০ বছরেরও বেশি পুরোনো। চুবে যে বাড়িতে থাকেন এরকম বাড়ির সংখ্যা এক হাজারের মতো। নগর কর্তৃপক্ষ এ বাড়িগুলোতে বসবাসের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে নোটিস দিয়েছে। প্রতিবছরই এরকম বাড়িগুলোর কয়েকটি ধসে পড়ছে। মারা যাচ্ছে অনেকে। ২০০৮ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত মোট একশ’ বাড়ি ধসে পড়েছে শুধু মুম্বাইতে। এতকিছুর পরও অনেকে ঝুঁকিপূর্ণ এসব ভবনে থাকছেন শুধুমাত্র কম খরচের কারণে।
ঘনবসতিপূর্ণ মুম্বাই শহরে থাকা অনেক ভারতবাসীর স্বপ্ন হলেও অনেকের সে স্বপ্নে ফিকে রঙ লাগে যখন দেখা যায়, এখানকার জীবনযাত্রা অনেক কঠিন। রাস্তায় চলাচলের পরিবেশ নেই। ভবনগুলো ধসে পড়ছে। তখন হয়তো অনেকে তাদের আগের জায়গায় ফিরে যেতে চান। কিন্তু তখন আর উপায় থাকে না। কারণ তারা অনেক কিছু ছেড়ে দিয়ে এখানে আসেন। অবশ্য এর উল্টো চিত্র দেখা যায় মুম্বাই শহরে। সারি সারি এ্যাপার্টমেন্ট তৈরি করা আছে সেখানে বিক্রির জন্য। হাউজিং কোম্পানিগুলো চটকদার বিলবোর্ড সাজিয়েছে এ্যাপার্টমেন্টের ছবি দিয়ে। চুবেদের মতো লোকেরা সেগুলো দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন। ধনীরা এসব এ্যাপার্টমেন্ট কিনতে পারলেও অনেক সময় মধ্যবিত্তদেরও নাগালের বাইরে থাকছে তা।
মুম্বাই-এর জীর্ণ বাড়িগুলো ভেঙে ফেলা হচ্ছে না কেন? এর উত্তরও সোজা। এসব বাড়ির মালিকরা অনেক সময় ঘুষ দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছেন। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো ভেঙে ফেলার আন্দোলনের সাথে জড়িত চন্দ্রশেখর প্রভু বলেন, হাউজিং কোম্পানিগুলো নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার করছে। এসব সামগ্রী যথাযথ কর্তৃপক্ষ থেকে অনুমোদন নিয়ে রাখার কথা থাকলেও তা করা হয় না। এজন্য নগর কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদের ঘুষ দিতে হয়। তিনি বলেন, ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হলে নগর কর্তৃপক্ষ বাসিন্দাদের নোটিস দিচ্ছে তা ছেড়ে দেয়ার জন্য। কিন্তু তারা কেউ ভবনটির মালিক নন। এক্ষেত্রে ভবন মালিকদের নোটিস দেয়া উচিত। কারণ ভবন মালিকরা তাদের ভাড়াটিয়াদের বের করে দিতে পারে। কিন্তু এমনটি কখনোই এখানে হচ্ছে না।