হেপাটাইটিস বি ও সি টাইম বোমার মত
প্রকাশ : ২৮ জুলাই ২০১৩, ২২:৩৬
হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাস সংক্রমণ আশংকাজনক হারে বেড়ে চলেছে। এটি নীরব ঘাতক যাকে বিশেষজ্ঞগণ টাইম বোমার সঙ্গে তুলনা করেছেন। এতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা বুঝতে পারেন না তিনি এতে আক্রান্ত হয়েছেন কিনা অথবা কখন কিভাবে তার দেহে এই ভাইরাস প্রবেশ করেছে। এই রোগ টাইমবোমার মত হঠাত্ বিস্ফোরণ ঘটায় অর্থাত্ আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যু নিশ্চিত করে বলে বিশেষজ্ঞগণ জানিয়েছেন। গতকাল রবিবার ‘বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস’ উপলক্ষে হেপাটোলজি সোসাইটি ও লিভার ফাউন্ডেশন কর্তৃক আয়োজিত আলোচনাসভায় বক্তাগণ ঘাতক ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাস সম্পর্কে এসব তথ্য জানান। তারা বলেন, এই নীরব ঘাতক সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্য সরকার কিংবা অন্য দায়িত্বশীল মহল তেমন এগিয়ে আসে না। একটু সচেতন হলে এই মরণব্যাধি থেকে সহজেই রক্ষা পাওয়া সম্ভব। রাষ্ট্রপতি এডভোকেট আব্দুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস উপলক্ষে পৃথক বাণী দিয়েছেন।
হেপাটোলজি সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মবিন খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় অধ্যাপক ও বিশিষ্ট শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এমআর খান ও বিশেষ অতিথি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম। বক্তব্য রাখেন, বিএসএমএমইউ’র হেপাটোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. একেএম খোরশেদ আলম, বারডেমের লিভার বিশেষজ্ঞ ডা. মো. গোলাম আযম, বিএসএমএমইউ’র সহযোগী অধ্যাপক ডা. শাহিনুল আলম ও ডা. গোলাম মোস্তফা এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. আবু সাইদ।
বক্তাগণ বলেন, জন্ডিস নিয়ে যারা হাসপাতালে চিকিত্সা নিতে আসেন, তাদের ৪৩ ভাগই হেপাটাইটিস ‘ই’ ভাইরাস, ২২ ভাগ ‘বি’ ভাইরাস, ৮ ভাগ ‘এ’ ভাইরাস, ৩ ভাগ ‘সি’ ভাইরাসে আক্রান্ত। ২৪ ভাগের দেহে অন্যান্য কারণ পাওয়া গেছে। শুষ্ক ও বর্ষা মওসুমে জন্ডিসের প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা যায়। এদেশে মোট জনগোষ্ঠীর ৪ দশমিক ৪ থেকে ৭ দশমিক ৮ ভাগ লোক হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাস বহন করে বলে বক্তারা জানান।
সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ জেলার আড়াইহাজার থানার এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, যারা গ্রামাঞ্চলে বসবাস করে, তাদের মধ্যে ৪.১৮ ভাগ লোকই হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাস বহন করে। গাজীপুর জেলার মাওনা এলাকায় এক পরিসংখ্যান চালিয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা দেখেন, সেখানে ০.৫ ভাগ লোক হেপাটাইটিস ‘সি’ ভাইরাস বহন করে। যারা যৌনকর্মী তাদের মধ্যে ৯.৭ ভাগ, শিরায় মাদকাসক্ত গ্রহণকারীদের মধ্যে ৮.৮ ভাগ হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাস রয়েছে। শিশুদের মধ্যে ১৫.৪ ভাগ ও পল্লী চিকিত্সকদের মধ্যে ৩৫.৫ ভাগ হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাস বহন করে। হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাস বহনকারীদের মধ্যে ৪০ ভাগ দীর্ঘমেয়াদী হেপাটাইটিস ও ৪১ ভাগ লিভার সিরোসিসে ভোগে। লিভার ক্যান্সারের জন্য হেপাটাইটিস বি ভাইরাস ২৫ থেকে ৫০ ভাগ ক্ষেত্রে দায়ী। ‘বি’ ভাইরাসে আক্রান্ত গর্ভবতী মায়েদের শেষ তিন মাস থেকে প্রসবকালীন সময়ে ৩১ ভাগ থেকে ৮৫ ভাগ ক্ষেত্রে নবজাতকের দেহে সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে। হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাসের সংক্রমণ সময় থাকতে প্রতিরোধ না করলে অদূর ভবিষ্যতে মহামারী আকারে এই নীরব ঘাতক দেখা দেবে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দেন।
যেভাবে ছড়ায়
রোগাক্রান্ত মায়ের দেহ থেকে শিশু, রক্তের মাধ্যমে, ইনজেকশনের সুচ যদি একাধিক দেহে ব্যবহার করা, দাত ও অপারেশনের ব্যবহূত যন্ত্রপাতি জীবাণুমুক্ত না করে ব্যবহার করলে, দূষিত রক্ত (পেশাদার ডোনার), দাঁতের ব্রাশ, রেজার ব্লেড ইত্যাদি এবং অনিরাপদ যৌন ক্রিয়ার মাধ্যমে হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাস সংক্রমিত হয়।
উপসর্গ
হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাস অনেক ক্ষেত্রে তুষের আগুনের সাথে তুলনা করা হয়ে থাকে। কেননা তুষের আগুনে শিখা নেই অথচ সবকিছুই পুড়তে পারে। ল্যাবরেটরিতে রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে একমাত্র এসব ভাইরাস সনাক্ত করা সম্ভব। তবে যে ধরনের উপসর্গ দেখা যায় সেসব হচ্ছে-
সামান্য জ্বর, শরীর ব্যথা ব্যথা, ক্ষুধা মন্দা, বমি ও বমি বমি ভাব ইত্যাদি। শুরুতে চোখ বা পস াব হলুদ হয় না। যখন চোখ বা পস াব হলুদ হয় তখন সচেতন যে কেউ বুঝতে পারে, তার জন্ডিস হয়েছে। ক্রনিক হেপাটাইটিস হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোন উপসর্গ থাকে না। তবে শারীরিক দুর্বলতা ও মনোযোগহীনতা ইত্যাদি হতে পারে।
লিভার ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মির্জা মাজহারুল ইসলামের সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথি সাবেক উপদেস্টা ও জাতীয় অধ্যাপক ব্রিগেডিয়ার (অব.) আব্দুল মালিক এবং বক্তব্য রাখেন ফাউন্ডেশনের মহাসচিব অধ্যাপক মো. আলী, অধ্যাপক একিউএম মোহসেন, মেজর জেনারেল মো. রবিউল হোসেন, অধ্যাপক এম আনিসুর রহমান, অধ্যাপক ডা. ফারুক আহমেদ প্রমুখ।
এবারে বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয়ঃ এই হলো হেপাটাইটিস, জানুন ও প্রতিরোধ করুন।
ল্যাব এইডে র্যালির আয়োজন
বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস উপলক্ষে ল্যাব এইড হাসপাতাল হতে সচেতনতামূলক একটি র্যালির আয়োজন করা হয়। সকাল ৮টায় প্রায় তিনশতাধিক মানুষ এ র্যালিতে অংশগ্রহণ করেন। নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি বিভিন্ন স্বাস্থ্য বিষয়ক দিবসে জনসাধারণের মাঝে সচেতনতা গড়ে তুলতে এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। র্যালিতে উপস্থিত ছিলেন হাসপাতালের বিপণন পরিচালক আল এমরান চৌধুরী, লিভার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সেলিমুর রহমান ও সহযোগী অধ্যাপক মামুন আল মাহাতাব স্বপ্নীলসহ অন্যান্য চিকিত্সক ও হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারিগণ। র্যালি শেষে সকলের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক সেলিমুর রহমান।