নির্বাচনে প্রার্থিতা বাতিল করতে পারবে না ইসি

জাতীয় সংসদের নির্বাচনে আচরণবিধি লংঘন করলেও কোন প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করতে পারবে না নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বিদ্যমান গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে প্রার্থিতা বাতিলের সুযোগ থাকলেও এবার সংশোধনীতে শুধু আর্থিক জরিমানা এবং ৬ মাসের দণ্ডের বিধান থাকছে। প্রার্থিতা বাতিল সংক্রান্ত ৯১ঙ ধারাটিই বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। নিজেদের ক্ষমতা খর্ব করে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধন করে এ ধরনের প্রস্তাব গতকালই অনুমোদন করেছে কমিশন। কমিশন বৈঠক শেষে দু’জন নির্বাচন কমিশনার ও একাধিক কর্মকর্তা বিষয়টি ইত্তেফাককে নিশ্চিত করেছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোঃ জাবেদ আলী ইত্তেফাককে বলেন, বিদ্যমান আরপিও’র ৯১ঙ ধারাটি বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। কোন প্রার্থী আচরণবিধি লংঘন করলে শাস্তি হিসাবে ৬ মাসের দণ্ড ভোগ করতে হবে। তবে প্রার্থিতা বাতিল করার সুযোগ থাকছে না। আরপিওতে ১৪, ১৭ ও ১৯ ধারা বহাল থাকলে ৯১ঙ ধারার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। কারণ ২০০৮ সালে আরপিওতে ৯১ঙ ধারাটি অন্তর্ভুক্ত করা হলেও এর প্রয়োগ করা হয়নি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন নির্বাচন কমিশনার ইত্তেফাককে জানান, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধনীতে নির্বাচনে আচরণবিধি ভঙের কারণে কোনো প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল হলে এবং এরপর একজন মাত্র প্রার্থী অবশিষ্ট থাকলে তাকে বিজয়ী ঘোষণা করার সুযোগ রাখা হয়। এমনকি আরপিও’র আলোকে সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধির ২৮ ধারায়ও প্রার্থিতা বাতিলের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু প্রধান বিরোধী দল বিএনপির আপত্তির কারণে ধারাটি বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে কমিশন। দলটির অভিযোগ ওই ধারা বজায় থাকলে আগামী নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীদের উপর তা প্রয়োগ করা হতে পারে। এই সংশয় থেকে এ ধারাটি বাতিল করা হয়েছে। এখন কোন জটিলতার সৃষ্টি হলে তা আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী সমাধান করা হবে। সংসদ নির্বাচন পরিচালনার জন্য ১৯৭২ সালে প্রণীত হয় গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের বেশকিছু বিধান সংশোধন করা হয়। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালের ১২ নভেম্বর এই অধ্যাদেশ সংসদে পাস হয়। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২ এর ২০০৯ সালের সংশোধিত বিধানের ৯১ঙ ধারায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থিতা বাতিলের সুযোগ রাখা হয়। তবে বর্তমান কমিশন আরপিও সংশোধনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। এর অংশ হিসাবে গত মে মাসে পাঠানো হয় আইন মন্ত্রণালয়ে। গত ১৪ মে আইন মন্ত্রণালয় প্রস্তাবিত সংশোধনী পর্যালোচনা করে। ২১ মে আরপিও সংশোধনী প্রস্তাবটি ব্যাখ্যা চেয়ে নির্বাচন কমিশনে ফেরত পাঠানো হয়। প্রস্তাবনাটিতে ইসি ৪১টি বিধিমালা সংশোধনের প্রস্তাব করে। এরপর ২৫ জুলাই আরপিও-র সংশোধনী প্রস্তাব বর্তমান কমিশনের আমলে দ্বিতীয় দফায় আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। কমিশনের ওই প্রস্তাবে বলা হয়েছিল-আচরণবিধি লংঘনের দায়ে প্রার্থিতা বাতিলের কারণে একজন প্রার্থী অবশিষ্ট থাকলে তাকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা হবে। বিদ্যমান আইনে ওই আসনে পুন:তফশিল ঘোষণার বিধান রয়েছে। মাত্র দু’দিনের মাথায় কমিশনের প্রার্থিতা বাতিল সংক্রান্ত ৯১ঙ ধারা বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্ত পরিবর্তনকে বাঁকা চোখে দেখছেন বিশিষ্টজনেরা। গণপতিনিধিত্ব আদেশের ৯১ঙ (১) তে বলা আছে, ‘এই অধ্যাদেশ বা ইহার অধীন প্রণীত বিধিমালায় যা কিছুই থাকুক না কেন, যদি কোন উত্স হতে প্রাপ্ত রেকর্ড কিংবা লিখিত রিপোর্ট হতে কমিশনের নিকট প্রতীয়মান হয় যে, প্রতিদ্বন্দ্বী কোন প্রার্থী বা তার নির্বাচনী এজেন্ট বা তার নির্দেশে বা তার পক্ষে তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্মতিতে অন্য কোন ব্যক্তি গুরুতর বেআইনী কার্যে লিপ্ত হয়েছেন বা লিপ্ত হওয়ার চেষ্টা করছেন বা এই অধ্যাদেশ বা এর অধীন প্রণীত কোন বিধিমালা বা আচরণ বিধিমালার কোন বিধান লংঘন করেছেন বা লংঘনের চেষ্টা করছেন এবং অনুরূপ বেআইনী কার্যে লিপ্ত হওয়া বা লিপ্ত হওয়ার চেষ্টা বা লংঘন বা লংঘনের চেষ্টার জন্য তিনি সদস্য নির্বাচিত হওয়ার বা থাকার অযোগ্য হতে পারেন, সেই ক্ষেত্রে কমিশন সংশ্লিষ্ট প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থীকে শুনানির যুক্তিসংগত সুযোগ প্রদান করে বিষয়টি তদন্তের আদেশ দিবেন। (২) উপধারা (১) এর অধীন অনুষ্ঠিত তদন্তের রিপোর্ট প্রাপ্তির পর কমিশন যদি এই মর্মে সন্তুষ্ট হন যে, রিপোর্টটি সত্য, তা হলে কমিশন যথাযথ কারণ প্রদর্শন পূর্বক লিখিত আদেশ দ্বারা তদ্রুপ প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করিবে এবং তদাবস্থায় সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকার অপর প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থীদের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে; এবং এ ক্ষেত্রে অপর প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থী অবশিষ্ট থাকে সেই ক্ষেত্রে ঐ নির্বাচনী এলাকার নির্বাচন ১৭ এর অধীন (পুনরায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে) অনুষ্ঠিত হবে। (৩) উপধারা (২) এর অধীন প্রদত্ত কোন আদেশ সংশিষ্ট প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থী বা তার নির্বাচনী এজেন্টকে হাতে হাতে বা ফ্যাক্স, ই-মেইল বা কুরিয়ার সার্ভিস এর মাধ্যমে বা অবস্থা অনুযায়ী সম্ভব অন্য কোন পন্থায় জানিয়ে দেয়া হবে। (৪) উপধারা (২) এর অধীন প্রদত্ত আদেশ অবিলম্বে রিটার্নিং অফিসার, প্রিজাইডিং অফিসার এবং অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থিগণকে এবং অনুরুপ প্রার্থীকে মনোনয়ন প্রদানকারী রাজনৈতিক দলকে অবহিত করা হবে। (৫) উপধারা (২) এর অধীন প্রদত্ত আদেশ সরকারি গেজেট এবং কমিশন কর্তৃক উপযুক্ত বিবেচিত অন্য কোন প্রকারেও বিজ্ঞাপিত হবে। সর্বশেষ আরপিও’র সংশোধনীতে উপরের বিধানটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি আব্দুর রউফ ও এম এ সাঈদ আচরণবিধি লংঘনের জন্য প্রার্থিতা বাতিলের শতচেষ্টা করেও শেষপর্যন্ত সফল হননি। তবে ২০০৮ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এটিএম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধিন কমিশন গঠিত ফলে ৯১ঙ ধারা অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সেই সময়ও বিএনপি এই ধারা অন্তর্ভুক্তের তীব্র বিরোধীতা করেছিল। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে খুশি করা ইসির কাজ নয়। নির্বাচনের অবাধ পরিবেশ ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করাই তাদের কাজ। তিনি বলেন, কোন উদ্দেশ্যে তারা এটা করছে তা বুঝতে পারছি না। তারা কিভাবে রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের মোকাবিলা করবেন?’