‘বাবা চেয়েছিল যেন শিক্ষক হই’

  শাহনেওয়াজ বাবলু

 

ছোটবেলা তেমন কোনো স্বপ্নই ছিল না তার। তবে বাবা-মা’ই তাকে স্বপ্নের বীজটা বুনে দিয়েছিল। পরিবারের অনেকে ছোটবেলায় ব্যারিস্টার বলে ডাকতেন। সবাই মনে করতেন বড় হয়ে সে একজন ব্যারিস্টার হবে। কিন্তু এইচএসসি পাসের পর ইচ্ছা ছিল অর্থনীতিতে পড়াশোনা করবে দেশের বাইরে। সুযোগও হয়েছিল দেশের বাইরে পড়ার কিন্তু  মায়ের ইচ্ছাতেই দেশে থেকে যাওয়া, ঢাবিতে ভর্তি হওয়া। আর বাবা ইচ্ছায় পাশ্চাত্যের অক্সফোর্ড খ্যাত এই বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষকতা পেশায় আসা। বেড়ে ওঠা রাজনৈতিক পরিবারে। কিন্তু কখনো রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হননি তিনি। তবে রাজনীতিটা রক্তে    আছে। বলছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস বিভাগের অধ্যাপক এবং ডিরেক্টর ড. চৌধুরী সায়মা ফেরদৌসের কথা। তিনি বলছিলেন, বাবা খুব করে চেয়েছিলেন যেন ঢাবির শিক্ষক হই।  তাই বাবার স্বপ্নটাই ছিল আমার স্বপ্ন। নিজের শৈশব নিয়ে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, আমার জন্ম ঢাকায়। তবে শৈশবের অনেকটা অংশ জুড়েই ছিল গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায়। সময় পেলেই গ্রামের বাড়িতে চলে যেতাম। 

আমার মেজো বোন দেশের বাইরে থেকে মেডিক্যালে পড়ালেখা করেছে। তাই আমার শখ ছিল বাইরে পড়াশোনা করার। আমার অর্থনীতিতে পড়ার খুব ইচ্ছা ছিল। ১৯৯৬ সালে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে পড়ার জন্য স্কলারশিপও পেয়েছিলাম। আমার মা  আমাকে যেতে দিলেন না। পরিবার সবসময় চাইতো আমি যেন বাংলাদেশেই পড়াশোনা করি। সেই সুবাদেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া। আর এখান থেকেই পড়াশোনা শেষ করা।

শিক্ষকতা পেশায় আসার আগে একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করেছি। কারণ গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করার পর আমি চেয়েছিলাম মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে জব করব। ২০০৩ সালে থেকে শিক্ষকতা পেশায় আছি। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেছি ২০০৫ সালে।

শিক্ষক হিসেবে যখন প্রথম ক্লাস নেই এই অনুভূতিটা অন্যরকম ছিল। তবে এটা নতুনভাবে আমাকে কোনো অভিজ্ঞতা দেয়নি। কারণ আমি এসএসসি’র পর থেকেই আমার ছোট ভাইবোনদের পড়াতাম। তখনকার সময় থেকে আমি শিক্ষক। তবে হ্যাঁ এই পেশায় এসে আমার তখনই খুব ভালো লেগেছিল যখন দেখলাম আমার গাড়ির সামনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক লেখা একটা স্টিকার।

আমি সবসময় প্রতিকূল পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করতে পছন্দ করি। বাস্তব দিক থেকে বলতে গেলে নারী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে আমি অনেক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছি। আমি যখন ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে জয়েন করি তখন আমি প্রথম মা হই। ওই সময় ডাক্তার আমাকে সম্পূর্ণ বিশ্রামে যাওয়ার জন্য বলেছিলেন। এই কারণে আমি কিছুটা পিছিয়ে পড়ি।

পেশায় এসে বিভিন্ন সময় বৈষম্যের শিকার হয়েছি। যখন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে জব করতাম সেখানে বৈষম্যের কিছু পাইনি। তবে শিক্ষকতা  পেশায় আসার পর কিছুটা পেয়েছি। সেটা ইনস্টিটিউশনে না, সমাজের        মানুষের কাছ থেকে। কারণ মানুষ মনে করে শিক্ষকতা হচ্ছে মেয়েদের পেশা। সমাজ থেকেই আমি অনেক বাধার সম্মুখীন হয়েছি। আমি সবসময় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলাম যত বাধাই আসুক আমি আমার সংগ্রাম চালিয়ে যাব। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে,  যেদিন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জয়েন করেছি সেদিনই আমার মেয়ের জন্ম হয়েছে। এখানে জয়েন করেই আমি অপারেশন থিয়েটারে গিয়েছিলাম।

যতই বড় হচ্ছি, ততই যেন নতুন কিছু করার ইচ্ছা বাড়ছে। গ্রামে আমার দাদার একটা স্কুল রয়েছে। আমার স্বপ্ন সেখানে মেয়েদের জন্য আরো একটা   স্কুল করার। শহরে মেয়েরা কমবেশি সুযোগ সুবিধা ভোগ করে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি সুবিধাবঞ্চিত হয় গ্রামের মেয়েরা। আমি তাদের নিয়ে কাজ করতে চাই। বিশেষ করে মা, মেয়ে এবং নারীদের নিয়ে।  মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছা করে              আরো যদি বেশি বেশি কাজ করতে পারতাম। আরো দ্রুত যদি কাজ করতে পারতাম। এর জন্য দুঃখ হয়। তবে স্বপ্ন না দেখে সেটাকে আরো বাস্তবে রূপ দিতে চাই।

একজন নারীকে সফল হতে হলে অবশ্যই তার লক্ষ্য ঠিক করতে হবে। আর দ্বিতীয়ত দেখতে হবে সমাজে এবং পরিবারে তার পরিস্থিতিটা কেমন। সেই হিসেব করেই একজন নারীকে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে এগোতে হবে। মেয়েরা এখন অনেকটাই এগিয়ে যাচ্ছে।