মেঘনার অব্যাহত ভাঙনে বিলীন হচ্ছে হাতিয়া
কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার, হাতিয়া (নোয়াখালী) সংবাদদাতা
প্রকাশ : ৩০ জুলাই ২০১৩, ২১:৪০
মেঘনা নদীর অব্যাহত ভাঙ্গনে হাতিয়ার উল্লেখযোগ্য অংশ মেঘনা গর্তে বিলীন হয়েছে। নদী ভাঙ্গনের কারণে সহায়-সম্বল হারিয়ে অসংখ্য মানুষ আশ্রয় নিয়েছে নতুন জেগে উঠা চরসহ বেড়ি বাঁধে। হাতিয়ার ছয় লাখ লোকের আর্থ-সামাজিক মুক্তি ও অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে নদী ভাঙ্গন রোধ একান্ত জরুরী।
১৯৬০ সাল থেকে হাতিয়া নদী ভাঙ্গনের শিকার হচ্ছে। ১৯৬৮ সালে হাতিয়ার নদী ভাঙ্গন আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করে। বর্তমানে হাতিয়ার আয়তন ২১০০ বর্গ কিলোমিটার। ১৯৬৮ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত হাতিয়া প্রায় ২৫০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা মেঘনায় বিলীন হয়েছে। সবচেয়ে মারাত্মক ভাঙ্গনের শিকার হয় হরণী-চানন্দী, সুখচর ও নলচিরা ইউনিয়ন। ১৯৬০ সালে হাতিয়ার ইউনিয়ন ছিল ১১টি। ৪০ বছরে হাতিয়ার ২টি ইউনিয়ন নীললক্ষ্মী ও হরণী সম্পূর্ণভাবে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। পরবর্তীকালে নদী ভাঙ্গনের কারণে হাতিয়া উপজেলা পরিষদসহ বিভিন্ন অফিস ওছখালীতে স্থানান্তর করা হয়।
উল্লেখ্য, ভূমি পুনরুদ্ধার ও হাতিয়া ভাঙ্গন রোধ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ১৯৭৫ সালের ২৯ অক্টোবর বাংলাদেশ সরকার ও নেদারল্যান্ড সরকারের মধ্যে একটি চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল। ১৯৮৪ সালের এপ্রিলে হাতিয়া ভাঙ্গন রোধ বিষয়ে ‘ভাঙ্গন রোধের সুপারিশমালা’ শিরোনামে একটি রিপোর্ট বাংলাদেশ সরকারের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছিল। রিপোর্ট অনুযায়ী হাতিয়ার ভাঙ্গন রোধে দীর্ঘমেয়াদী সুপারিশসহ বাঁধ নির্মাণের সুপারিশ করা হয়। অদ্যাবধি ভাঙ্গন প্রতিরোধে কোন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।
হাতিয়ার ৫৫ ভাগ ৩৫-৭০ বছর বয়সী মানুষ ৪/৬ বার নদী ভাঙ্গনের শিকার হয়েছেন। প্রতিবার নদী ভাঙ্গনের কারণে হাতিয়ার ৫৫ ভাগ মানুষ ১২ লাখ টাকা হারে ক্ষতির সম্মুখীন। হাতিয়ার ৮০ ভাগ লোক কৃষক এবং দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করেন। ব্যাপকহারে কৃষি জমি ভেঙ্গে যাওয়ার কারণে হাতিয়ার অনেক কৃষক বেকার হয়ে পড়েছেন। হাতিয়ার ভূমিহীনদের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক। এসব কারণে কেউ কেউ হাতিয়া ছেড়ে সদর উপজেলা চরমজিদ, চরমহিউদ্দিন, নিঝুমদ্বীপসহ বিভিন্ন চরে আশ্রয় নিচ্ছে।
হাতিয়া নদী ভাঙ্গনের জন্য প্রাকৃতিক এবং মানবসৃষ্ট দুটো কারণই দায়ী। ১৯৬৪ সালে ভবানীগঞ্জ চর লরেন্সে একটি ক্রস ড্যাম এবং ১৯৬৭ সালে আট্কপালিয়া মান্নান নগরে আরেকটি ক্রস ড্যাম নির্মাণ করা হয়। এই দুটি ক্রস ড্যাম নির্মাণের পর হাতিয়ার নদী ভাঙ্গনের মাত্রা বহুগুণে বেড়ে যায়। এছাড়া সন্দ্বীপ চ্যানেল, হাতিয়া চ্যানেল, কুতুবদিয়া চ্যানেল এবং নাফ নদীর জোয়ারের পানি হাতিয়া ও তত্সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় বেশি ক্রিয়াশীল। এছাড়া নদীতে চর সৃষ্টির ফলে নদীর পানি প্রবাহ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। হাতিয়া উপকূলে গড়ে ৩০ হাজার ৮শ’ ৬৮ ঘনমিটার পানিস্রোত আঘাত হানে। এ বিশাল পানি স্রোত আঘাতের কারণে হাতিয়া মূল ভূ-খণ্ড প্রতিনিয়ত মেঘনা নদীতে ভেঙ্গে পড়ছে।