তবুও নির্বাচন নিয়ে সংশয় কেন
জামাল উদ্দীন ও শামছুদ্দীন আহমেদ
প্রকাশ : ৩০ জুলাই ২০১৩, ২২:৪২
জাতীয় নির্বাচন আসি আসি করছে। সরকারের মেয়াদকাল যতই কমছে ততই সরকারি দল বা বিরোধী শিবিরেও আশার সঞ্চার হচ্ছে। নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে তাই ঘর গুছাতে ব্যস্ত তারা। সবাই নেমে পড়েছেন নির্বাচনী প্রচারে। মনোনয়ন প্রত্যাশীদের এলাকায় চলতি রমজান মাসজুড়ে যে সরব উপস্থিতি, তা দেখে জনসাধারণ সহজেই আঁঁচ করতে পারে যে, নির্বাচন হবেই। তবু কোথায় যেন বিঁধে আছে দ্বন্দ্বের কাঁটা। বিরোধী শিবিরের মতে এই কাঁটা ‘নির্দল-নিরপেক্ষ’ সরকার, আর সরকারি দলের মতে ‘সাংবিধানিক অন্তর্বর্তী সরকার’। কি হবে শেষ পর্যন্ত, যথাসময়ে নির্বাচন হবে কি—এমন নানা সংশয় কাটেনি রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে।
ফলে, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েই যাচ্ছে। অনেকে আশাবাদী হলেও কেউ কেউ বরং বলেছেন, মহাজোট সরকারের মেয়াদ যতই ফুরিয়ে আসছে এবং সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে, এই সংশয় ততই প্রগাঢ় হচ্ছে।
অপরদিকে, জেলা পর্যায়ে সম্ভাব্য মনোনয়ন প্রত্যাশীদের গণসংযোগ উভয় জোটেরই নির্বাচন প্রস্তুতিকে দৃশ্যমান করে তুলেছে। ‘গৃহবিবাদ’ থাকলেও সম্ভাব্য প্রার্থীদের তত্পরতা বলতে গেলে গোটা দেশেই নির্বাচনের আবহ তৈরি করেছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক-বিশ্লেষকসহ অনেকেই মনে করছেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে সৃষ্ট সংশয়ের কিছু যৌক্তিক কারণও রয়েছে। পঞ্চদশ সংশোধনীর পর বর্তমানে যে সংবিধান রয়েছে, তা নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করলে প্রথমত সেখানেই বড় ধরনের হোঁচট খেতে হয়। সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ ভেঙ্গে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। বর্তমান সংসদ, প্রধানমন্ত্রীসহ তার মন্ত্রিসভা সবকিছুই এখন যেভাবে আছে, নির্বাচনের সময় সে রকমই থাকবে—সংবিধানে সোজাসাপটা এ কথাই বলা আছে। সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে এ-ও বলা আছে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী পরবর্তী নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন।
কিন্তু সংসদ ভেঙ্গে নির্বাচন করতে হলে কীভাবে কখন নির্বাচন হবে, নির্বাচনকালীন সরকার কেমন হবে, সেই সরকারের হাতে কি কি ক্ষমতা বা দায়িত্ব থাকবে, এর কোনকিছুই স্পষ্ট নয়। যদি কোনো কারণে যথাসময়ে কিংবা কয়েক বছরেও নির্বাচন না হয় তাহলে কী হবে, সে ব্যাপারেও কিছু উল্লেখ নেই বলে অভিমত পোষণ করেছেন বিশ্লেষকরা।
নির্বাচন নিয়ে সংশয়ের অন্যতম কারণ নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা প্রশ্নে সরকার ও বিরোধী দলের অনড় অবস্থান। সরকারি দল প্রতিদিনই বলছে, সংবিধান অনুযায়ীই নির্বাচন হবে, এর বাইরে কিছু মানা হবে না। পক্ষান্তরে বিরোধী দল বলছে, নির্দলীয় সরকার ছাড়া তারা নির্বাচনে যাবে না। এমনকি দলীয় সরকারের অধীনে দেশে নির্বাচন হতে দেয়া হবে না বলেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে যাচ্ছে বিরোধী দল।
নির্বাচনের সময় যত কাছে আসছে ততোই দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল তাদের অনড় অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করছে। এছাড়াও বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক কারণে বহিঃশক্তির প্রভাব কি হবে— সেটিও সৃষ্ট সংশয়কে মজবুত করেছে বলে অভিজ্ঞমহলের ধারণা।
অন্যদিকে, সীমানা পুনর্নির্ধারণ ইস্যুতে নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক ক্ষমতা নিরঙ্কুশ। এরপরও কমিশনের এ সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে কেউ কেউ উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন দায়ের করেছেন। যদিও নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের কোন আদালতে প্রশ্ন উত্থাপনের সুযোগ নেই বলে সংবিধান বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।
তবে মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি ভিন্ন। জাতীয় পর্যায়ে নির্বাচন নিয়ে সংশয় থাকার পরও বসে নেই কোন দল। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট, বিএনপির নেতৃত্বে থাকা ১৮ দলীয় জোট এবং এ দুটি জোটের বাইরে থাকা নিবন্ধিত অন্যান্য রাজনৈতিক দলও নির্বাচনী প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিভিন্ন মাধ্যমে আসনভিত্তিক কয়েক ধরনের জরিপ কার্যক্রম চালাচ্ছে বড় দলগুলো। কোন আসনে দলের কোন নেতার কী অবস্থা, কাকে মনোনয়ন দেয়া হলে ফল ঘরে আসবে, কাকে দেয়া হলে জয় অনিশ্চিত হতে পারে, কোন এলাকায় সংগঠনের কি কি দুর্বলতা বা সমস্যা রয়েছে, বিরাজমান সমস্যা কীভাবে দূর করা সম্ভব—এসব নিয়ে কাজ করছে প্রায় সব দল। এমনকি নির্বাচনকে সামনে রেখে নিজেদের বর্তমান জোটেও নতুন মেরুকরণের উদ্যোগ নিয়েছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। কে কার জোট থেকে কাকে ভাগিয়ে নিজ জোটে সম্পৃক্ত করতে পারে, কে কার জোট থেকে কাকে বের করে এনে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ভোটের অঙ্কে দুর্বল করতে পারে- প্রধান দুই দলে বর্তমানে ভেতরে ভেতরে সেই প্রতিযোগিতা চলছে।
এর বাইরে যেসব দল রয়েছে তারাও নির্বাচনকে সামনে রেখে হিসাব কষছে। কোন দল বা জোটের সঙ্গে গেলে ক্ষমতায় যাওয়া নিশ্চিত হবে তার হিসাব কষছে তারা। কোনো কারণে বড় দুই জোটে যুক্ত হতে না পারলে এককভাবে কিভাবে নির্বাচন করা যায়, কিংবা সমমনাদের নিয়ে পৃথক কোনো জোট গঠন করা যায় কিনা, এরকম তত্পরতা চলছে প্রধান দুই জোটের বাইরের দলগুলোর মধ্যে।
আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দু’দলই নির্বাচনের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখন যেখানেই দলীয় সমাবেশ করছেন, সেখানেই নৌকায় ভোট প্রার্থনা করছেন। আজ বুধবার তিনি যাচ্ছেন রংপুরের পীরগঞ্জে। সেখানেও মূলত তিনি ‘নির্বাচনী সমাবেশ’ করবেন। দলটির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম গত সোমবার ঢাকায় এক ইফতার পার্টিতে সাংবাদিকদের কাছে বলেছেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে ঈদের পর তারা বিভিন্ন টিমে ভাগ হয়ে সারাদেশে সাংগঠনিক সফর শুরু করবেন।
অন্যদিকে বিরোধী দলীয় নেতা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে দলীয় নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘আন্দোলনের পাশাপাশি এখন থেকে নির্বাচনের প্রস্তুতিও নিন।’ নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থার দাবি আদায়ে আসন্ন রোজার ঈদের পর আন্দোলন তীব্র করার ঘোষণা দেয়ার পাশাপাশি নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত হবার কথাও বলেছেন তিনি। শীর্ষ পর্যায় থেকে এমন কথা শোনার পর সম্ভাব্য প্রার্থীদের মাঠে না নেমে উপায় কি! তারা এলাকায় ইফতার পার্টি আয়োজন এবং বিভিন্ন সভা-সমাবেশ ও মতবিনিময় অনুষ্ঠান করা ছাড়াও এলাকাবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে নিজ নির্বাচনী আসনে ব্যাপক পোস্টারিং করেছেন, লাগিয়েছেন ব্যানার, ঘরে ঘরে পাঠাচ্ছেন ঈদের শুভেচ্ছা কার্ড। এর বাইরে নেতা-কর্মীদের খুশি রাখতে দিচ্ছেন ঈদে নানা উপহারও।
সম্ভাব্য প্রার্থীরা এতটাই তত্পর হয়ে উঠেছে যে, কোথাও কোথাও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে, আবার কোথাও নিজ দলের মনোনয়ন প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে কাউকে কাউকে সংঘর্ষে জড়াতে দেখা যাচ্ছে। এত কিছুর পরও কেন নির্বাচন নিয়ে সংশয় কিংবা কখন নির্বাচন হবে—এমন প্রশ্নের উত্তরে বিশেষজ্ঞরা বলেন, সময়ই বলে দেবে ভবিষ্যতের কথা। তবে গণতন্ত্র সমুন্নত রাখতে হলে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিকল্প নেই।