যুবলীগ নেতার মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে হত্যা

সাদা রঙের পাজামা-পাঞ্জাবি পরা এক ব্যক্তি মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে এগিয়ে আসছেন। সামনে একটি পাজেরো গাড়ি থেকে পাঞ্জাবি পরিহিত আরেক ব্যক্তি নেমে এলেন। মোবাইল ফোনে কথা বলা ঐ ব্যক্তি গাড়ি থেকে নেমে আসা ব্যক্তির মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করলেন। গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়লে সেখানেও কয়েকদফা গুলি চালান ওই ব্যক্তি। এসময় আরো এক যুবক এসে পেছন থেকে আরো কয়েক রাউন্ড গুলি করে। মিশন শেষে পাশে দাঁড়ানো মোটর সাইকেলের পিছনে উঠে পালিয়ে গেলেন গুলি করা ওই ব্যক্তি। লুটিয়ে পড়ে থাকে একজনের লাশ। এটি নাটক বা সিনেমার কোন দৃশ্য নয়। বাস্তবেই গুলশান-২ নম্বরে শপার্জ ওয়ার্ল্ডের সামনে এভাবেই গুলি করে হত্যা করা হয় যুবলীগ নেতা রিয়াজুল হক খান মিল্কীকে। সোমবার রাত দেড়টার দিকে এই ঘটনা ঘটে। আর শপার্জ ওয়ার্ল্ডের সিসিটিভিতে ধরা পড়েছে এই দৃশ্য। নিহত রিয়াজুল হক খান মিল্কী ঢাকা মহানগর যুবলীগের (দক্ষিণ) সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। তিনি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগের পক্ষে সম্ভাব্য ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থীও ছিলেন। ঘটনার পর র্যাব শপার্জ ওয়ার্ল্ডের সিসিটিভি ক্যামেরা থেকে পাওয়া ভিডিও ফুটেজ দেখে উত্তরার জসীম উদদীন রোডের নেপচুন হাসপাতাল থেকে এইচএম জাহিদ সিদ্দিক তারেককে (৪০) গ্রেফতার করে। পরে তার দেয়া তথ্য থেকে র্যাব এ হত্যার সঙ্গে জড়িত তারেকের সহযোগী তুহিনুর রহমান (২৫), সৈয়দ মোস্তফা আলী রুমি (৩৩), রাসেদ মাহমুদ (২৫), সাইদুল ইসলাম নূরু (২২) ও সুজন হাওলাদারকে (২২) গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে তারেক ঢাকা মহানগর যুবলীগের (দক্ষিণ) কার্যনির্বাহী সদস্য। অন্যরা যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। প্রত্যক্ষদর্শী, পুলিশ ও র্যাব থেকে পাওয়া ভিডিও ফুটেজ অনুযায়ী, মিল্কী তার পাজেরো গাড়ি নিয়ে গুলশান শপার্জ ওয়ার্ল্ডে ঈদের কেনাকাটার জন্য রাত দেড়টায় উপস্থিত হন। রাস্তায় গাড়ি থেকে নেমে শপার্জ ওয়ার্ল্ড মার্কেটের প্রবেশের মুখে একজন সাদা পাঞ্জাবি-পাজামা ও টুপি পরিহিত ব্যক্তি মোবাইল ফোন নিয়ে কথা বলতে বলতে তার দিকে এগিয়ে আসেন। ডান হাত দিয়ে পিস্তল মিল্কীর মাথায় ঠেকিয়ে গুলি করেন। মুহূর্তের মধ্যে মিল্কী ছিটকে রাস্তায় পড়ে যান। সেখান থেকে বাঁচার জন্য উঠে দৌড়ানোর চেষ্টা করতেই ঐ ব্যক্তি পরপর কয়েক রাউন্ড গুলি করেন। এসময় এক যুবক মিল্কীর লুটিয়ে পড়া দেহের সামনে এগিয়ে এসে আরো কয়েক রাউন্ড গুলি করে। একটু দূরে দাঁড়ানো একটি মোটর সাইকেলের পিছনে উঠে ওই ব্যক্তি পালিয়ে যান। ঐ যুবকও পাশে দাঁড়ানো আরো একটি মোটর সাইকেলে করে পালিয়ে যায়। অন্যদিকে, পথচারীরা গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মিল্কীকে উদ্ধার করে গুলশান শাহাবুদ্দিন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিত্সকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে পুলিশ হাসপাতাল থেকে লাশ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে পাঠায়। এদিকে, ঘটনার পর র্যাবের গোয়েন্দা শাখার একটি টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করার পর শপার্জ ওয়ার্ল্ডের প্রবেশমুখে স্থাপন করা সিসিটিভির ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করে। পরে র্যাব ভোর সাড়ে ৫টার দিকে উত্তরার জসীম উদদীন রোডের নেপচুন হাসপাতালে অভিযান চালায়। র্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লে. কর্নেল জিয়াউল আহসান বলেন, অভিযান চালানোর সময় হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে তারেকের চিকিত্সা চলছিল। তার ডান পায়ের পেছনের দিকে গুলিবিদ্ধ হয়েছে। অপারেশন থিয়েটারে চিকিত্সা শেষে তারেককে গ্রেফতার দেখানো হয়। তার দেয়া তথ্য অনুযায়ী অন্য ৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। যে কারণে হত্যা মিল্কীকে হত্যা করা হতে পারে- এমন তথ্য আগে থেকেই পুলিশ ও র্যাবের কাছে ছিল। এ ব্যাপারে মিল্কী পুলিশ ও র্যাবের কাছে অভিযোগও করেছিলেন। র্যাবের গোয়েন্দা ইউনিট প্রাথমিক তদন্তে মতিঝিল এলাকায় সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদপ্রার্থী নিয়ে তারেক ও মিল্কীর মধ্যে দ্বন্দ্বের তথ্য পেয়েছে। র্যাবের মিডিয়া অ্যান্ড লিগ্যাল শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার হাবিবুর রহমান বলেন, এলাকায় সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রার্থী, যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের কমিটি ও এলাকার টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এই দুই জনের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল। মতিঝিল এজিবি কলোনীতে মিল্কীর হাত ধরেই তারেকের রাজনীতিতে প্রবেশ; কিন্তু সম্প্রতি যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের কমিটি গঠন নিয়ে দুইটি গ্রুপের মধ্যে বিবাদ সৃষ্টি হয়। বর্তমান সভাপতি ইসমাইল হোসেন সম্রাট গ্রুপের লোকজন কমিটিতে বেশি স্থান পায়। সাধারণ সম্পাদক ওয়াহিদুল আলম আরিফের গ্রুপের সবচেয়ে কম লোকজন স্থান পায়। এ নিয়ে সম্রাট ও আরিফ গ্রুপের মধ্যে দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করে। মিল্কী কমিটিতে সাংগঠনিক সম্পাদক এবং তারেক কার্যকরী সদস্য হিসাবে পদ পান। সম্প্রতি কারাগারে আটক শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনকে বাড্ডার জাহাঙ্গীর-আলমগীরের মাধ্যমে মিল্কী রাজনৈতিক আশ্রয় দিচ্ছিলেন। কারাগারে আটক আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী কিলার আব্বাসের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল তারেকের। তারেক যুবলীগ উত্তরের নেতা চঞ্চল গ্রুপের সঙ্গে এক হয়ে আরেকটি গ্রুপ সৃষ্টি করে। অন্যদিকে, মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগ সভাপতি গ্রুপের সুদৃষ্টিতে পড়েন তারেক। এ নিয়ে মতিঝিল কেন্দি ক বিভিন্ন অফিসের টেন্ডার বিশেষ করে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের টেন্ডার ও সিএমএমইউ (কনস্ট্রাকশন ম্যানেজমেন্ট অব মেডিক্যাল ইউনিট) টেন্ডার নিয়ে তারেক ও মিল্কীর মধ্যে বিরোধ চরম আকার ধারণ করে। অন্যদিকে, ঢাকা সিটি করপোরেশনের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর নির্বাচনের জন্য আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে মিল্কী নিজেকে প্রার্থিতা ঘোষণা দেন। এসব নিয়ে দুই গ্রুপের মধ্যে চরম আকার ধারণ করে। নিহতের পরিচয় রিয়াজুল হক খান মিল্কীর বাবা এরশাদ উদ্দিন খান আয়কর বিভাগের আইনজীবী। মতিঝিল এজিবি কলোনীর ৯২ নম্বর ভবন ১২ নম্বর ফ্ল্যাটে মিল্কীরা থাকতেন। বাবা অবসর নেয়ার পর ধানমন্ডিতে চলে যান। পরে মিল্কী মোহাম্মদপুরের স্যার সৈয়দ রোডের ৬/৬ নম্বর বাড়িতে স্ত্রীকে নিয়ে ভাড়ায় থাকতেন। রাশেদুল (৫) ও রায়হান (২) নামে মিল্কীর দুইটি পুত্র সন্তান রয়েছে। গতকাল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গ থেকে লাশ গ্রহণ করেন মিল্কীর ভাই মেজর রাসেল। গুলি করা ব্যক্তির পরিচয় মিল্কীকে লক্ষ্য করে গুলি করা ব্যক্তির পরিচয় নিয়ে ধ্রুমজালের সৃষ্টি হয়েছে। র্যাবের গোয়েন্দা ইউনিটের পরিচালক লে. কর্নেল জিয়াউল আহসান বলেন, ঘটনাস্থলে মিল্কীর সঙ্গে গাড়িতে ছিলেন সাগর। র্যাব সাগরকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করে নিশ্চিত হয়েছে ভিডিও ফুটেজে পাঞ্জাবি-পাজামা পরিহিত পিস্তল দিয়ে গুলি করা ব্যক্তি তারেক। প্রথম দফার গুলির পর আরেক যুবক মিল্কীকে লক্ষ্য করে গুলি করার সময় তারেক গুলিবিদ্ধ হয়। গুলি করতে থাকা ঐ যুবকের নাম সোহাগ। অন্যদিকে যুবলীগের কয়েকজন নেতা ঐ ভিডিও ফুটেজ দেখে দাবি করেছেন, যে ব্যক্তি গুলি করছে তার নাম রবিন। মগবাজারের সন্ত্রাসী রবিনের সঙ্গে কারাগারে বন্দী শীর্ষ সন্ত্রাসী আরমানের যোগাযোগ রয়েছে।