অকার্যকর মুদ্রানীতির পথে আমরা!

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৩-১৪ অর্থ বত্সরের প্রথমার্ধের মুদ্রানীতি ঘোষণা করিয়াছে। এই মুদ্রানীতি বিনিয়োগবান্ধব নহে বলিয়া কেহ কেহ অভিমতও প্রকাশ করিয়াছেন। এই মুদ্রানীতির উল্লেখযোগ্য দিক হইল তাহা আগের অর্থাত্ গত অর্থ বত্সরের শেষার্ধের মুদ্রানীতি হইতে ধর্তব্য কোন বিষয়েই ভিন্ন নহে। মুদ্রানীতি প্রণয়নের সময় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি মাথায় নিয়া এই দুইয়ের মধ্যে একটি ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করা হয় যে কোন অর্থনীতির ক্ষেত্রে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সর্বদা তাহাই ঘটে। কিন্তু এইবার বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী হওয়ার পরও সংযত মুদ্রানীতি চলমান রাখার অভীষ্ট অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের ব্যাপারে আশংকা দেখা দিয়াছে। তবে সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতির দ্বারাও কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নহে বলিয়া অর্থনীতিবিদরা মনে করিতেছেন। তাহার কারণ ব্যাংকিং খাতে অতিরিক্ত তারল্য থাকার পরও বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি শ্লথ হওয়ায় তারল্যের ঘাটতি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কোন বাধা হিসাবে দেখা হইতেছে না। ব্যাংকিং খাতে অতিরিক্ত তারল্য থাকার পর সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করিলে তাহা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কোন তাত্পর্যপূর্ণ পরিবর্তন না আনিলেও মূল্যস্ফীতিকে উসকাইয়া দিবে। প্রশ্ন হইল, কেন মুদ্রানীতি অনেকটা অকার্যকর হইয়া পড়িয়াছে বর্তমান অর্থনীতির বাস্তবতার প্রেক্ষিতে। অতীতের কোন ভুল পলিসির কারণে কি এমনটি ঘটিয়াছে? ঘোষিত মুদ্রানীতিতে বর্তমান অবস্থার পিছনের কারণ হিসাবে রাজনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি ২০১১-১২ অর্থ বত্সরের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির প্রতি ইঙ্গিত করা হইয়াছে। বৈদেশিক লেনদেনের ক্ষেত্রে ভারসাম্য ফিরাইয়া আনিতে ও ডাবল ডিজিট মূল্যস্ফীতিকে বাগে আনিতে তখন অতি বেশি সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করা হইয়াছিল। তাহার প্রেক্ষিতে মূল্যস্ফীতি অনেকটা কমিয়া গেলেও আমদানি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক হইয়া পড়ে। পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি শ্লথ হইয়া গিয়া অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমিতে শুরু করে। তাহার পর যুক্ত হয় রাজনৈতিক অস্থিরতা। পাঁচ বত্সর পরপর এই রাজনৈতিক অস্থিরতার আগমন সম্পর্কে ওয়াকেবহাল থাকিলেও আগের কয়েক অর্থ বত্সরের মুদ্রানীতিতে সাবধানতা অবলম্বন করা হয় নাই। বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতায় বিনিয়োগ শ্লথ হওয়ার বিষয়টি মাথায় রাখিয়া তখন সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির বদলে খানিকটা সংযত মুদ্রানীতির দ্বারস্থ হওয়া। তাহাতে মূল্যস্ফীতি অতটা না কমিলেও বেসরকারি বিনিয়োগ ও আমদানি প্রবৃদ্ধি আজকের পর্যায়ে আসিত না। কুইক রেন্টাল প্লান্টের যাঁতাকলে পড়িয়া বৈদেশিক লেনদেনের ক্ষেত্রে যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হইয়াছিল তাহার খেসারত দিতে হইতেছে অসতর্ক মুদ্রানীতির ফলে। ব্যয়বহুল কুইক রেন্টাল বিদ্যুতের উপর অতিনির্ভরতার কারণে সরকারি কোষাগারে ভর্তুকির যে চাপ পড়ে তাহা হইতে মুক্তি পাইবার জন্য সমন্বয় করা হইয়াছিল বিভিন্ন এনার্জির দামের। তাহার প্রেক্ষিতে অতি দ্রুত বাড়িয়া গিয়াছিল মূল্যস্ফীতি, যাহা সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির দ্বারস্থ হইতে বাধ্য করিয়াছিল। যাহার পরিণতিতে মুদ্রানীতি বর্তমান অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় অকার্যকর হইয়া পড়িয়াছে।