চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ প্রকল্পভারে ন্যূব্জ

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) প্রকল্পভারে ন্যূব্জ হয়ে পড়েছে। নগরীর যানজট নিরসনে শত শত কোটি টাকার ফ্লাইওভার, ওভারপাস, সড়ক সম্প্রসারণ, নতুন সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারসহ বহুবিধ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। রাতারাতি এবং ক্ষেত্র বিশেষে সিডিএ মাস্টার প্ল্যানের সাথে সামঞ্জস্যহীন অনেক প্রকল্প নিজ অর্থায়নে ও সরকারি অর্থায়নে নেয়া হলেও তা বাস্তবায়নের মন্থরগতি নগরবাসীর ভোগান্তি প্রলম্বিত করছে। দায়িত্বে নিয়োজিত প্রকল্প পরিচালক ও প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোও কর্তৃপক্ষের চাপে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন। সিডিএতে দক্ষ জনবলের স্বল্পতা রয়েছে। একজন নির্বাহী প্রকৌশলীকে একাধিক প্রকল্পের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এতে করে তাদের পক্ষে কোনটি ছেড়ে কোনটি করবে তা নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে। আবার দ্রুত কাজ সম্পাদনের জন্য ঠিকাদারদের ওপর চাপে মানসম্মত কাজের ক্ষেত্রে প্রভাব পড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। বিভিন্ন প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলীগণ জানিয়েছেন, তারা দৌড়ের ওপর আছেন। তাদের এ সরকারের মেয়াদের মধ্যেই প্রকল্পগুলো শেষ করার জন্য টার্গেট দেয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে দ্রুততার সাথে কাজ করতে গিয়েই বহদ্দারহাট ফ্লাইওভার ধসে ১৫ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। বর্তমান সরকারের অঙ্গীকার থেকেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নগরীর উন্নয়নে সিডিএর মাধ্যমে বেশ কয়েকটি প্রকল্পে বরাদ্দ ও অনুমোদন প্রদান করেন। ২০১০ সালের জানুয়ারি মাসে বহদ্দারহাট ফ্লাইওভারের কাজের উদ্বোধনও করেন। দুই বছরের মধ্যে এর কাজ শেষ হওয়ার ঘোষণা থাকলেও সরকারের মেয়াদের মধ্যে তা সম্পন্ন হবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। এ প্রকল্পে এখন পর্যন্ত অন্তত তিনবার দুর্ঘটনার শিকার হয়ে অনেকগুলো প্রাণ হারাতে হয়েছে। একইভাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কদমতলী ফ্লাইওভার, টাইগারপাস ওভারপাস নির্মাণের কাজও শেষ হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। নগরীর উন্নয়ন কাজগুলো সম্পন্ন করার জন্য বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ আবদুস ছালামকে দুই মেয়াদে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। কিন্তু উচ্চাভিলাষী ও অপরিকল্পিত প্রকল্প গ্রহণের কারণে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জন সম্ভব হচ্ছে না বলে সিডিএর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অভিমত। একইভাবে বহদ্দারহাট ফ্লাইওভার ধসের পর নগর পরিকল্পনাবিদগণ বলেছিলেন, কোন প্রকার ফিজিবিলিটি স্টাডি না করে এবং মাস্টার প্ল্যানের বাইরে প্রকল্প গ্রহণ করায় টেকসই প্রকল্প নির্মাণ সম্ভব নয়। সিডিএর নিজস্ব শতাধিক কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন ফ্লাইওভার প্রকল্পটি প্রায় চার বছর ধরে নগরীর দুর্ভোগের অন্যতম কারণ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। নগরবাসীর যানজট নিরসনে ফ্লাইওভার ও সড়ক নির্মাণের প্রকল্পগুলো এখন নগরবাসীর নিকট যানজট ও জলাবদ্ধতার কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে। নগরীর গনি বেকারি থেকে শুরু করে কার্পাসগোলা হয়ে বহদ্দারহাট পর্যন্ত সম্প্রসারণ ও উন্নয়নের কাজ সরকারের প্রথম থেকে শুরু হলেও এখনো সমাপ্তির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। খোঁড়াখুঁড়িসহ ভাঙচুরের কাজ অব্যাহত থাকায় আশপাশের বসতবাড়ি, দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং জনগণের চলাচল দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে। আবার বর্ষার সময় ওই সকল এলাকার বাসা-বাড়ি পানিতে নিমজ্জিত হয়। এতে করে সিডিএর প্রতি মানুষের বিরূপ মনোভাব দেখা দিয়েছে। কারণ দুই বছরের কাজ ৪/৫ বছরেও শেষ হচ্ছে না। নগরীর প্রাণকেন্দ্র নিউমার্কেট থেকে আগ্রাবাদ অভিমুখী সড়কের ব্যস্ততম কদমতলী মোড় এলাকায় ফ্লাইওভার নির্মাণকাজ চলছে তো চলছে। ঢিমেতালে চলা এর কাজ আগামী বছরও শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে জানা যায়। অপরদিকে দেওয়ানহাট মোড়স্থ ওভারপাস এ বছরের শেষের দিকে সম্পন্ন করার তোড়জোড় চলছে। এদিকে মুরাদপুর, ২নং গেইট ও জিইসি জংশন ফ্লাইওভারের কিছু কাজ শুরুর প্রথমেই তা বন্ধ হয়ে যায়। প্রকল্পটি আদৌ করা হবে কিনা তা কেউ বলতে পারছে না। বহদ্দারহাট জংশন থেকে কালুরঘাট ব্রিজ পর্যন্ত সড়কে চলাচলকারী লোকজন এক সময় সড়কে ধানগাছের চারা রোপণ করে প্রতিবাদ জানালেও সেই সড়কের উন্নয়ন কাজ এখনো শেষ হয়নি। ২০০৫ সালে কল্পলোক আবাসিক প্রকল্পের কাজ শুরু হলেও এখনো তার শেষ হওয়ার কথা কেউ জানাতে পারেননি। কাজীর দেউড়ী কাঁচাবাজার ও এপার্টমেন্ট প্রকল্প ২০০৮ সালে শুরু হলেও শেষ কখন হবে কেউ জানে না। চট্টগ্রাম মহানগরীকে যানজটমুক্ত করতে নগরীর পতেঙ্গা সমুদ্র উপকূল বরাবর সাগরিকা পর্যন্ত আউটার রিং রোড প্রকল্প ২০০৮ সালে নেয়া হলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার জন্য তার গতি খুবই শ্লথ। জাইকা ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে নির্মাণাধীন এ প্রকল্পের ব্যাপারে সিডিএ কর্তৃপক্ষের গাফিলতিও অনেকাংশে দায়ী বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত। কারণ এ প্রকল্পটি অন্তত গত ৫ বছরে বাস্তবায়ন হলে চট্টগ্রাম বন্দর, ইপিজেড, পতেঙ্গাসহ সংশ্লিষ্ট শিল্প এলাকার পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, লরি অনায়াসে শহরের বাহির দিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে চলাচল করতে পারতো। এতে করে নগরীর বিশাল অংশ যানজট থেকে রক্ষা পেত। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গত প্রায় চার বছরে অভ্যন্তরীণ অন্তত ৪/৫টি সড়ক উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের কাজ সম্পন্ন করলেও বৃহত্ প্রকল্পগুলো নগরবাসীর নিকট বোঝা হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।