সিকান্দার আবু জাফর

সব্যসাচী লেখক, মুক্তিকামী সম্পাদক

একেকটি যুগের ভেতর পোরা থাকে যুগান্তকারী বারুদ, তাই যুগস্রষ্টা যিনি তাঁর কাছে আমাদের ঋণের শেষ থাকে না। সিকান্দার আবু জাফরের কাছে ঋণী হয়ে আছে স্বাধীনতাপূর্ব বা স্পষ্ট করে বললে বলতে হবে, স্বাধীনতার জন্যে নিজেকে যোগ্য ও প্রস্তুত করে তোলা যুগের সাহিত্যের জন্ম ও বিকাশ। তার ধারক সমকাল-সম্পাদক হিসেবে সিকান্দারের অবদান তাই অবিস্মরণীয়। বাংলাদেশ ও বাংলা সাহিত্যে মুক্তিকামী স্মরণীয় বরণীয় সম্পাদক সিকান্দার আবু জাফরের অবদান স্মরণীয়। কবিতায় মুক্তির মন্ত্র ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি স্বাধীনতার শত্রুদের উদ্দেশে এমন প্রত্যক্ষ প্রতিবাদী কণ্ঠের উদাহরণ খুব বেশি নেই। আজ তাঁর সেই উচ্চারণগুলো যেন হয়ে উঠেছে সমকালের বিপ্লবী স্বর। আপনাদের কি মনে পড়ে না সেই শব্দমালা : রক্তচোখের আগুন মেখে ঝলসে যাওয়া আমার বছরগুলো আজকে যখন হাতের মুঠোয় কণ্ঠনালীর খুন পিয়াসী ছুরি কাজ কি তবে আগলে রেখে বুকের কাছে কেউটে সাপের ঝাপি আমার হাতেই নিলাম আমার নির্ভরতার চাবি তুমি আমার আকাশ থেকে সরাও তোমার ছায়া তুমি বাংলা ছাড় আজও বাংলার আকাশে শকুন, মৃত্তিকায় হায়েনা। তাঁর জন্মপীঠ সাতক্ষীরার প্রত্যন্ত জনপদেও আজ স্বাধীনতাবিরোধীদের তাণ্ডব। তাই ‘তুমি বাংলা ছাড়’ এই উচ্চারণ হয়ে উঠেছে আজকেরই উচ্চারণ। আর শুধু এটুকুও যদি পুনর্বিবেচনা করি, তবে নিশ্চিতভাবেই আমরা বলতে পারি, সিকান্দার আবু জাফর আজও বাংলার মুক্তিকামী মানুষকে পথ দেখান, প্রেরণা দেন। ২. লেখকদের দশকওয়ারি বিচারের একটি চল রয়েছে। সেটা অপ্রাসঙ্গিকও নয়। একইভাবে আমরা বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন যুগকেও স্মরণ ও মূল্যায়ন করতে পারব। একেকটি যুগের ভেতর পোরা থাকে যুগান্তকারী বারুদ, তাই যুগস্রষ্টা যিনি তাঁর কাছে আমাদের ঋণের শেষ থাকে না। সিকান্দার আবু জাফরের কাছে ঋণী হয়ে আছে স্বাধীনতাপূর্ব বা স্পষ্ট করে বললে বলতে হবে, স্বাধীনতার জন্যে নিজেকে যোগ্য ও প্রস্তুত করে তোলা যুগের সাহিত্যের জন্ম ও বিকাশ। তার ধারক সমকাল-সম্পাদক হিসেবে সিকান্দারের অবদান তাই অবিস্মরণীয়। শিখা ও সওগাত পত্রিকা বাঙালি মুসলমান সমাজে মুক্তমনে সাহিত্যচর্চার যে ধারা শুরু করেছিল সমকাল তারই পরিণত রূপ। তত্কালীন পূর্ব বাংলায় বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও সংস্কৃতি চর্চার যে ধারা প্রবাহিত হয় তিনি ছিলেন তার অন্যতম পৃষ্ঠপোষক। আমরা কী করে ভুলি, পাকিস্তান সরকার রেডিও ও টিভিতে রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রচার বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিলে তিনি তার বিরোধিতা করেন। সম্পাদক সিকান্দার আবু জাফর ছিলেন দৃঢ়চেতা উদ্দীপিত মানুষ। কেবল তা-ই নয়, তিনি ছিলেন জাত সম্পাদক। একদিকে তিনি ছিলেন পাকা জহুরি, অন্যদিকে উজ্জীবিত ও সন্ধানী সম্পাদক। সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনার জন্য যে সাংগঠনিক যোগ্যতা আবশ্যক তা তাঁর ছিল। বাংলা সাহিত্যে সমকালযুগ নিয়ে দায়িত্বশীল আলোচনার জন্যে বড় পরিসর প্রয়োজন। এখানে সংক্ষিপ্তভাবে কিছু বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হবে সম্পাদকের সততা, নিষ্ঠা, প্রকৃত সাহিত্যপ্রেম ও স্বদেশপ্রেমের কথা। তারপরেই উল্লেখ করতে হবে একটি ভূঅঞ্চলের সৃষ্টিশীল প্রগতিশীল সকল প্রতিভাবানকে একটি পতাকার ছায়ায় একত্রিত করতে পারার ইতিহাস-নির্ধারিত তত্পরতাকে। ৩. একজন সমালোচক সমকাল সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন, ‘কী অবদান রেখেছে সমকাল এ প্রশ্নের উত্তরে এককথায় বলতে হবে যে, পত্রিকাটি বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির একটা রুচিমান ও আধুনিক ধারা তৈরি করেছে। ষাটের দশকে সামপ্রদায়িকতা, আঞ্চলিকতা, অতীতমুখিনতা, বদ্ধ মানসিকতা, মধ্যপ্রাচ্যমুখিনতা—এইসব লক্ষণ-অতিক্রমী যে আধুনিক রাজনীতিক ও সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল গড়ে উঠেছিল বাংলাদেশে তার রূপকার ছিল সমকাল। জাতীয়তাবাদ নিয়ে বিতর্ক বলতে গেলে এখান থেকেই তাত্পর্যপূর্ণভাবে শুরু হয়েছিল। একটা উদারনৈতিক অবস্থান ছিল পত্রিকাটির। প্রবন্ধের মাধ্যমেই বাঙালি জাতীয়তাবাদের তাত্ত্বিক ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল পত্রিকাটি। গল্প-কবিতার পাশাপাশি সমকাল বাংলাভাষায় বিচিত্র বিষয়ে প্রবন্ধ প্রকাশ করেছে—গণিত বিজ্ঞান কৃষি রসায়ন—কী নয়! কবিতাসংখ্যা প্রকাশ করে বাংলাদেশের কবিতার নতুনত্বকে চিনিয়েছে সমকাল। রবীন্দ্রসংখ্যা প্রকাশ করে অনুভব করতে শিখিয়েছে বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে রবীন্দ্রনাথকে। নিয়মিত বই-সমালোচনা প্রকাশ করে বাংলাদেশের সমালোচনা-সাহিত্যকে এগিয়ে নিয়ে গেছে সমকাল। বাম ও ডান উভয় দৃষ্টিভঙ্গির লেখকেরাই এখানে লিখেছেন। কিন্তু সম্পাদকের চেতনায় গণতান্ত্রিকতা ছিল বলে কোনো মত হয়ে ওঠেনি অন্ধ ভাষ্য। পত্রিকার পরিকল্পনায় এবং সাংগঠনিকতায় সিকানদার আবু জাফর গভীর মনোযোগ, ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা দেখিয়েছেন। মোটকথা তিনি সমকালকে একটি উদার মুক্ত পত্রিকায় উত্তীর্ণ করেছিলেন।’ সমকাল পত্রিকায় কে লেখেননি? লেখকদের ভেতরে ছিলেন : হাসান হাফিজুর রহমান, শামসুর রাহমান, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, আল মাহমুদ, আহমদ ছফা, আবদুল মান্নান সৈয়দ, সায়িদ আতীকুল্লাহ, সৈয়দ শামসুল হক, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, আবুল হাসান, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা, রফিক আজাদ প্রমুখ। এমনকি বাংলাদেশের সকল মেধাবী চিত্রশিল্পীকেও তিনি সমকালের সঙ্গে যুক্ত করেন। এঁদের ভেতরে ছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন, শিল্পগুরু কামরুল হাসান থেকে শুরু করে মোহাম্মদ কিবরিয়া, সফিউদ্দিন আহমেদ, আমিনুল ইসলাম, মূর্তজা বশীর, কাইয়ুম চৌধুরী, দেবদাস চক্রবর্তী, সৈয়দ জাহাঙ্গীর, রফিকুন নবীসহ অনেকেই। ৪. কথিত আছে ৭ই মার্চ ঐতিহাসিক ভাষণদানের দিন প্রকাশিত সিকানদার আবু জাফরের ‘বাঙলা ছাড়’ কবিতা পড়ে বন্ধুবর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অনুপ্রাণিত হন। তাঁর প্রতিক্রিয়া ছিল এমন :সিকানদারের কী সাহস! বাস্তবিকই অগ্নিগর্ভ একাত্তরের সূচনায় অবিসংবাদিত নেতাকে উদ্দীপিত করার আকাঙ্ক্ষা সুপ্ত ছিল কবিমনে। একজন বিপ্লবকামী কবি হিসেবে অসংখ্য গণসঙ্গীত লিখে তিনি খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর কবিতায় যুগ যন্ত্রণা বলিষ্ঠভাবে প্রতিফলিত হয়। তার উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম হচ্ছে, কবিতা : প্রসন্ন প্রহর, বৈরীবৃষ্টিতে, তিমিরান্তিক, কবিতা ১৩৭২, বৃশ্চিক লগ্ন ইত্যাদি। নাটক : সিরাজউদ্দৌলা, শকুন্ত উপাখ্যান, মহাকবি আলাওল ইত্যাদি। উপন্যাস : মাটি আর অশ্রু, পূরবী, নতুন সকাল ইত্যাদি। গল্পগ্রন্থ : মতি আর অশ্রু। কিশোর উপন্যাস : জয়ের পথে, নবী কাহিনী ইত্যাদি। অনুবাদ : রুবাইয়াত্ ওমর খৈয়াম, সেন্ট লুইয়ের সেতু, বারনাড মালামুডের জাদুর কলস, সিংয়ের নাটক ইত্যাদি এবং গানের মধ্যে মালব কৌশিক উল্লেখযোগ্য। বলা প্রয়োজন শচীন সেনগুপ্তের ‘সিরাজউদ্দৌলা’ সুবিখ্যাত হলেও তাতে ইতিহাসের নায়ককে ভুলভাবে চিত্রায়িত করা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই তাতে ইতিহাসবিকৃতি ঘটেছে। সিকান্দার আবু জাফর তাঁর অঙ্গীকারবোধ থেকেই সঠিকভাবে ‘সিরাজউদ্দৌলা’কে বাঙালি পাঠকের কাছে প্রতিষ্ঠিত করার অভিপ্রায়ে তাঁকে নিয়ে নাটক রচনায় ব্রতী হন। বহু বছর যাবত নাটকটি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পাঠ্য। সিকানদার আবু জাফর ১৯৬৬ সালে নাটকে বাংলা একাডেমী পুরস্কার পান। বাংলাদেশের প্রধান কবি শামসুর রাহমান তাঁর একটি প্রবন্ধে সমকাল সম্পাদক সম্পর্কে লিখেছেন : ‘সম্পাদক হিসেবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাহসী এবং সার্থক। তাঁর সম্পাদিত সমকাল আজ অব্দি আমাদের দেশের সর্বোত্তম সাহিত্যপত্র বলে স্বীকৃত। তিনি প্রবীণ এবং নবীন লেখকদের মর্যাদা দানে ছিলেন অকৃপণ। বিশেষ করে তরুণদের প্রতি তাঁর গভীর মনোযোগ ছিল। আজকের বেশ ক’জন প্রতিষ্ঠিত লেখক সমকালেরর নিয়মিত লেখক ছিলেন। তাঁরা সেই সময় সিকান্দার আবু জাফরের পৃষ্ঠপোষকতা না পেলে হয়তো সহজে খ্যাত হতেন না। পাকিস্তান সরকারের কড়া সমালোচনা করে সরকারি কর্মচারী আবদুল হক ছদ্মনামে যেসব প্রবন্ধ লিখতেন সেগুলো সমকালে ছাপা হতো। এজন্যে প্রচুর ঝক্কি ঝামেলা সইতে হয়েছে। প্রাবন্ধিকের আসল নাম জানার জন্যে সরকারের তরফ থেকে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু বিবেকী, সাহসী সম্পাদক অটল অনড়। কিছুতেই তিনি প্রাবন্ধিকের পরিচয় উদঘাটন করেননি সরকারের কাছে। সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এরকম দৃষ্টান্ত বিরল।’ আমরা জানি সম্পাদকের বাসভবনে তিন তিনবার তল্লাশি চালানো হয়েছে প্রাবন্ধিকের পরিচয় উদঘাটনের জন্যে। কিন্তু সরকার সফল হয়নি। সম্পাদক বরাবরই বলেছেন, ওই রচনার জন্যে লেখক নন, সম্পাদকই দায়ী। যাহোক, কবি শামসুর রাহমানের এই কথাগুলোর সঙ্গে দ্বিমতের বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। সম্পাদক হিসেবে সিকান্দার আবু জাফর ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে গেছেন। সৃষ্টিশীল রচনার স্রষ্টা ও সম্পাদক নামের এক সংগঠকের সক্রিয় তত্পরতায় সমৃদ্ধ হয়েছে বাংলাদেশের সাহিত্যভুবন এবং সাহিত্যসংবেদী মানুষের প্রতিবাদী চেতনা। সত্যিকারের সব্যসাচী তিনি। কী লেখেননি? কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ। গদ্য-পদ্যের অনুবাদকর্মেও তাঁর সিদ্ধি প্রবাদতুল্য। তাই এ সামান্য রচনার শিরোনামে যা লিখেছি তা আবার উচ্চারণ করি। সিকান্দার আবু জাফর : সব্যসাচী লেখক, মুক্তিকামী সম্পাদক। লেখক-সম্পাদকের এমন মেলবন্ধন সত্যিই বিরল। আজ তাঁকে স্মরণ করার আনুষ্ঠানিকতায় আমার চাওয়া—দুটি। প্রথমত, আমাদের দেশে চাই আজ তাঁর মতোই সব্যসাচী সম্পাদক। যিনি লিখবেন, এবং নবনব লেখা ধারণ করবেন তাঁরই সম্পাদিত কাগজে। দ্বিতীয়ত, মৌলবাদী অধ্যুষিত জনপদে স্বাধীনতাবিরোধীচক্রের শিরদাঁড়ায় কাঁপন ধরিয়ে দিতে পারে চাই এমন একজন কবি। যাঁর উচ্চারণে মুক্তিকামী সাধারণ মানুষও উত্তোলিত হাতে উচ্চারণ করবেন স্লোগানের মতো আশ্চর্যসুন্দর কবিতা।