প্রেজেন্টেশনের কাজ সবাইকেই করতে হয়। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, প্রেজেন্টেশনের জন্য মাইক্রোসফট পাওয়ারপয়েন্টের কোনো বিকল্প কারও জানা নেই। অথচ পাওয়ারপয়েন্টের বিকল্প অনেকগুলো সফটওয়্যার এবং অনলাইন অ্যাপ্লিকেশন রয়েছে, যেগুলোতে একই ধরনের কাজ করা যায় আরও সহজে। পাওয়ারপয়েন্টের ফিচারগুলোর চাইতে বেশি ফিচারও পাওয়া যায়। এ রকম কয়েকটি অ্যাপ্লিকেশন ও সফটওয়্যারের কথা এ লেখায় তুলে ধরা হলো—
মোজাহেদুল ইসলাম
তথ্যের উপস্থাপনে মাইক্রোসফটের অফিস স্যুটের অন্তর্ভুক্ত পাওয়ারপয়েন্টের ব্যবহার সবচেয়ে জনপ্রিয়। প্রেজেন্টেশনের কাজে এর বিকল্প অনেকেই ভাবতে পারেন না এখনও। তবে সময় বদলেছে। আর সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে পাওয়ারপয়েন্ট চাহিদা পূরণে সক্ষম হচ্ছে না বলেই মন্তব্য অনেকের। তা ছাড়া এখন ইন্টারনেটে রয়েছে ফ্রি ওয়্যারের ছড়াছড়ি। পাওয়ারপয়েন্টের বিকল্প অনেক সফটওয়্যার অ্যাপ্লিকেশন তাই বিনামূল্যে মিলছে ইন্টারনেটে। এগুলোতে রয়েছে প্রেজেন্টেশনের স্লাইড তৈরির নিত্য নতুন সব ফিচার। মাইক্রোসফট পাওয়ার পয়েন্টের বিকল্প হিসেবেও তাই অনেকে বেছে নিচ্ছেন এসব সফটওয়্যার। প্রেজেন্টশনের এরকম কয়েকটি ভালো সফটওয়্যারের কথা এই লেখায় পাঠকদের জানানো হলো।
স্লাইড রকেট
এমনিতে ওয়েব নির্ভর প্রেজেন্টেশন অ্যাপ্লিকেশন হিসেবে স্লাইড রকেটের পূর্ণাঙ্গ সুবিধা পেতে খরচ করতে হবে টাকা। তবে বিনামূল্যেও এই স্লাইড রকেটের অনেক ফিচারই কার্যকর, যা আপনার প্রেজেন্টশন স্লাইডগুলো মনমতো তৈরি করার সুযোগ করে দেবে। এর অন্যতম বড় একটি সুবিধা হচ্ছে এতে পাওয়ার পয়েন্টের ফাইল ইমপোর্ট করা যায় এবং এখান থেকে পিডিএফ আকারে ফাইল এক্সপোর্ট করা যায়। এতে এমন ধরনের স্লাইড ইফেক্ট যোগ করা যায়, যাতে এগুলোকে অনেকটাই ফ্ল্যাশ অ্যানিমেশন বলে মনে হয়। বিনামূল্যে স্লাইড রকেট ব্যবহার করলে মিলবে ফ্রি অনলাইন স্টোরেজে ২৫০ মেগাবাইট তথ্য রাখার স ুবিদা। এই স্টোরেজে ১৫ মেগাবাইট পর্যন্ত আকারের ফাইল সংরক্ষণ করা যাবে। এখান থেকে ফোল্ডার, ফাইল বা লাইব্রেরিও শেয়অর করা যাবে অন্যদের সাথে। এর ইউজার ইন্টারফেসটি অত্যন্ত চমত্কার এবং সহজেই ব্যবহারযোগ্য। এতে যেমন থিম, লে আউট, শেপ, চার্ট বা টেবিলযুক্ত করার সুযোগ আছে, তেমনি ছবি, অডিও বা ভিডিও ফাইল কিংবা ফ্ল্যাশ অ্যানিমেশন যুক্ত করার সুবিধাও রয়েছে। আবার ফ্লিকার বা ইউটিউব থেকে ফাইল যুক্ত করার সুবিধাও মিলবে স্লাইড রকেটে। অনেকের মতেই প্রেজেন্টেশনের জন্য ওয়েব নির্ভর অ্যাপ্লিকেশনের মধ্যে স্লাইড রকেট অন্যতম সেরা। কোলাবরেটিভ সুবিধার স্লাইড রকেটের মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনও রয়েছে। এটি ব্যবহার করার জন্য আপনাকে যেতে হবে www.sliderocket.com ঠিকানায়।
প্রেজি
স্লাইড শো বা প্রেজেন্টেশন ফাইল তৈরির জন্য আরেকটি ভালো প্ল্যাটফর্মের নাম প্রেজি। ২০০৯ সাল থেকে শুরু করে এর জনপিয়তা দিন দিন বাড়ছেই। ইতোমধ্যেই অনলাইনে এর ব্যবহারকারী দাঁড়িয়ে গেছে ২৫০ মিলিয়ন। আর এর নিবন্ধিত গ্রাহকের সংখ্যাই ১৮ মিলিয়নের বেশি। নন-লিনিয়ার প্রেজেন্টশনের জন্য একেই সবচেয়ে ভালো অ্যাপ্লিকেশন বলে মনে করা হয়। প্রেজি’র সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এটি প্রচলিত প্রেজেন্টেশন, স্লাইডের মতো করে কাজ করে না। বরং এতে তৈরি প্রতিটি স্লাইডকেই আলাদা আলাদা গতিশীল অবকেক্ট হিসেবে ব্যবহার করা যায়। কোনো অবজেক্টকে জুম করে দেখানো, সেগুলো ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ব্যবহার করার সুবিধা আছে এতে। এক কথায় বলতে গেলে প্রেজি’র মাধ্যমে তৈরি প্রেজেন্টেশনকে বলা যায় ডায়নামিক প্রেজেন্টশন। এখানে থাকবে বিশাল একটি ক্যানভাস, যেখানে আপনার প্রেজেন্টেশনের উপাদানগুলো নানাভাবে সাজিয়ে রাখতে পারবেন। এদের পরষ্পরের মধ্যেকার সম্পর্কগুলো প্রতিষ্ঠা করে দেখাতে পারবেন। এতে ওয়েব প্ল্যাটফর্মে যেমন কাজ করতে পারনে, তেমনি এর ডেস্কটপ অ্যাপ্লিকেশনও রয়েছে। বিনামূল্যে ব্যবহার করতে চাইলে মিলবে ১০০ মেগাবাইট ফ্রি স্টোরেজ। এখান থেকে তৈরি ফাইল সরাসরি ওয়েব থেকেও দেখানোর সুবিধা রয়েছে। http://prezi.com থেকে ব্যবহার করতে পারবেন অনলাইন প্রেজি কিংবা ডাউনলোড করে নিতে পারবেন এর ডেস্কটপ সংস্করণ। আইপ্যাড আর আইফোনের জন্যও রয়েছে এর আলাদা আলাদা অ্যাপ্লিকেশন। প্রেজির ডেস্কটপ সংস্করণে তৈরি ফাইল আবার এডিট করার জন্য অনলাইনে আপলোড করা যায় এবং সেখান থেকেও এটি এডিট এবং শেয়ার করার সুবিধা রয়েছে।
গুগল ডকস প্রেজেন্টেশন
গুগল ডকস-এর সাথে পরিচিত অনেকেই। ওয়ার্ড প্রসেসিংয়ের নানা কাজ যেমন এতে করা যায়, তেমনি প্রেজেন্টেশনের কাজও করা যায় গুগল ডকস-এর প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে। গুগল ডকস-এ গিয়ে create new তে ক্লিক করে ড্রপডাউন মেন্যু থেকে presentaion নির্বাচন করলেই প্রেজেন্টেশন ফাইল তৈরির কাজটি শুরু করে দিতে পারবেন। ব্যবহারের দিক থেকে এটিও অত্যন্ত সহজ একটি অ্যাপ্লিকেশন। অনলাইন এই অ্যাপ্লিকেশনের ইন্টারফেসও খুন পরিচ্ছন্ন। প্রেজেন্টেশন ফাইলের থিম পরিবর্তন করা, টেক্সট বক্স ইনসার্ট করা, ছবি যুক্ত করা, ভিডিও যুক্ত করা কিংবা নতুন কোনো স্লাইড ইমপোর্ট করা প্রভৃতি কাজ এতে করা যায় সহজেই। আর এই অপশনগুলোও অনেকটা পাওয়ারপয়েন্টের মতোই। গুগল’র এই অ্যাপ্লিকেশনের সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে অন্যান্য গুগল ডক-এর মতো এতেও রয়েছে কোলাবরেটিভ শেয়ারিং সুবিধা। অর্থাত্ এখান থেকে যেকোনো ফাইল শেয়অর করতে পারবেন অন্যদের সাথে এবং সবাই মিলে একসাথে এডিটও করতে পারবেন এখানকার ফাইল। এক কথায় বলতে গেলে, সহজে প্রেজেন্টেশন ফাইল তৈরি করতে এর বিকল্প খুঁজে পাওয়া মুশকিল। তবে অ্যাডভান্সড লেভেলের ফিচার এতে কিছুটা কম। যেকোনো গুগল অ্যাকাউন্ট থাকলেই গুগল ডকস-এ গিয়ে প্রেজেন্টেশন ফাইল তৈরি করতে পারবেন। docs.google.com থেকে কিংবা আপনার গুগল ড্রাইভ অ্যাকাউন্ট থেকেও ব্যবহার করতে পারবেন এটি।
২৮০ স্লাইড
পাওয়ারপয়েন্টের আরেকটি চমত্কার বিকল্প হতে পারে ২৮০ স্লাইড। ইতোমধ্যেই এটি বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। এর একটি বড় সুবিধা হচ্ছে, ইন্টারফেসের দিক থেকে এটি অনেকটাই পাওয়ার পয়েন্টের কাছাকাছি। তবে এতে গ্রাফিক্যাল ইন্টারফেস আরেকটু সুন্দর। এর ব্যবহারও অনেক সহজ। ফলে অনেকেই পাওয়ার পয়েন্ট বা গুগলডকস থেকে মৌলিক স্লাইডগুলো তৈরি করে তা সুন্দর করে তুলতে দ্বারস্থ হয় ২৮০ স্লাইডের। অর্থাত্ পাওয়ার পয়েন্ট বা গুগল ডকস থেকে সহজেই এতে ফাইল ইমপোর্ট করা যায়। এতে রয়েছে ফাইল অটোসেভ এবং রিকভারির সুবিধা। ফাইল সংরক্ষণ নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। আবার এখানে ডিজাইন করা স্লাইড পাওয়ার পয়েন্ট ২০০৭ ফরম্যাটেও এক্সপোর্ট করার সুবিধা রয়েছে। ফ্লিকার বা ইউটিউব থেকে সরাসরি ছবি বা ভিডিও যোগ করা যায় এতে। আবার স্লাইডশেয়ারে সরাসরি স্লাইড শেয়ার থেকেই প্রদর্শন করার সুবিধা রয়েছে। ফলে ফাইল প্রদর্শন করার জন্য বাড়তি কোনো ঝামেলা পোহাতে হবে না এর ব্যবহারকারীকে। download.cnet.com কিংবা ক্রোম ওয়েবস্টোর থেকে এটি ডাউনলোড করে নেওয়া যাবে।
পাওটুন
প্রেজেন্টেশনের আদ্যিকালের রূপ অনেকের কাছেই পুরোনো মনে হয়। চিরাচরিত বুলেট, পয়েন্ট, টেমপ্লেট ব্রবহার করতে করতে ক্লান্তও বোধ করে থাকেন অনেকেই। অনেকেই আবার প্রেজেন্টেশনের মধ্যে সহজে অ্যানিমেশন বা ভিডিও ব্যবহার করতে চান। নিজেদের প্রেজেন্টেশন ফাইলটিও তৈরি করতে চান অনেকটা অ্যানিমেশন ফাইল আকারে। তাদের জন্যই নতুন রূপে অ্যানিমেশনকে নিয়ে এসেছে ‘পাওটুন’। অনলাইন এই টুল ব্যবহার করে খুব সহজেই চমত্কার স্লাইড শো প্রেজেন্টেশন তৈরি করা যায়। অ্যানিমেটেড এই প্রেজেন্টেশনকে ভিডিও আকারে সংরক্ষণ করা যায় এবং সেগুলো ইউটিউবে শেয়ার করা যায় সরাসরি। আর এর জন্য এখানে রয়েছে বিশাল স্টাইল লাইব্রেরি এবং বিল্ট-ইন অ্যানিমেশন। সেখান থেকেই পছন্দমতো ডিজাইন খুঁজে পেতে পারেন। গুগল ড্রাইভের সাথে সংযুক্ত হয়েই কাজ করতে পারে এই অনলাইন অ্যাপ্লিকেশন। বিনামূল্যে নিবন্ধন করেই কাজ করা যায় এখানে। তবে যারা প্রফেশনাল কাজ করতে চান, তাদের জন্য আলাদা প্যাকেজ রয়েছে অর্থের বিনিময়ে। শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের জন্যও এখানে রয়েছে আলাদা সুবিধা। www.powtoon.com সাইটে গিয়ে ব্যবহার করতে পারবেন এই অ্যাপ্লিকেশনটি।