চীন-আফ্রিকা সম্পর্ক
অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরশীলতা
প্রকাশ : ০২ আগস্ট ২০১৩, ১৭:২২
চীনকে নব্য ঔপনিবেশিক শক্তি বলা চলে কি-না, এ প্রশ্নটি এখন ব্যাপক আলোচনার খোরাক যোগাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে চীনের উত্থান প্রসঙ্গ। এটি সত্য যে, একবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে আফ্রিকায় চীনাদের উপস্থিতি ক্রমান্বয়ে বাড়ছে এবং এ কারণেই আজ অনেকের মনে অনেকরকম প্রশ্ন আসছে। তবে এ কথাটি তো ঠিক, চীন আফ্রিকায় কোনো দেশ দখল করেনি। উপরন্তু তাদের রয়েছে পশ্চিমা শক্তি দ্বারা উপনিবেশিত হওয়ার দুঃসহ স্মৃতি। সেই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা খুব সহজেই ভুলে যেতে পারবে না তারা। আফ্রিকার কোনো দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করতে চায় না চীন। আফ্রিকায় কোনো সামরিক উপদেষ্টা নিয়োগ করেনি চীনা সরকার; সামরিক ঘাঁটি বানানোর তো প্রশ্নই আসে না। উপরন্তু আফ্রিকার সম্পদ চুরি ও লুণ্ঠনের জন্য প্রতারণাপূর্ণ কোনো মাধ্যম তারা বেছে নেয়নি। চীন ও আফ্রিকার সম্পর্ক পারস্পরিক লাভের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত এবং এটি কোনো শ্লোগান নয়, সত্য ঘটনা। চীনের রাজনৈতিক শর্তহীন আর্থিক ও অন্যান্য বিনিয়োগ আফ্রিকার অর্থনীতিতে দারুণভাবে কাজে লাগছে। উদাহরণস্বরূপ ২০০৫ সালে আফ্রিকার মোট অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে চীনের অবদান ছিল ন্যূনতম ৫ শতাংশ। যুগপত্ভাবে চীন আফ্রিকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করতে সেখানকার সম্পদ কিনে নিচ্ছে যথাযথ দামে।
ঔপনিবেশিক শক্তি না হয়েও আফ্রিকায় সফল পুঁজিবাদী চীন। বাজার অর্থনীতিই সহায়ক হতে পারে আফ্রিকার স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ব্যাপারে— এ সত্যটি মেনেই নিজেদের কৌশল ঠিক করেছে চীন। উদার বাণিজ্যনীতি গ্রহণ করলেও অন্যায্য চুক্তি স্বাক্ষরের পন্থা তারা বেছে নিচ্ছে না। তবে পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে এ কথাটি কিছুতেই বলা যায় না যে, চীনের ঔপনিবেশিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার কোনোই সম্ভাবনা নেই। কিন্তু সেই দিনটি তখনই আসতে পারে যখন আফ্রিকান দেশগুলোর জাতীয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চীনা বিনিয়োগ এবং তাদের দেশে রপ্তানির উপর এতটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়বে যে, কার্যত তাদের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতি নির্দেশিত হবে বেইজিং থেকে। ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগের কারণে চীনা ব্যবসায়ীরা আফ্রিকার দেশগুলোর জাতীয় শিল্পগুলোকে এক পাশে ঠেলে দিতে পারে এবং পঙ্গু করে দিতে পারে জাতীয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে— এমন কথা অনেকেই বলছেন। সেখানে রাত পোহালেই নতুন চীনা কোম্পানি ঢুকছে; যেন বইছে চীনা কোম্পানির স্রোত। কিন্তু এরা সুদূরপ্রসারী চিন্তা না করে লাভের ব্যাপারেই অধিক মনোযোগী। আফ্রিকান সমাজে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে যেসব বিষয়, সেগুলোকে তারা খুব বেশি আমলে নিচ্ছে না। যেমন— চলছে পরিবেশ দূষণ, মাত্রাতিরিক্ত উন্নয়ন ও স্থানীয় শ্রমিকদের শোষণ।
আফ্রিকার অর্থনৈতিক উন্নয়ন চীনা বিনিয়োগ এবং তাদের দেশে পণ্য রপ্তানির উপর অধিকমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে ঠিকই; কিন্তু এতে খুব বেশি চিন্তার কারণ নেই। ভুলে গেলে চলবে না, আফ্রিকার সম্পদ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির উপর চীনও নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এই আন্তঃনির্ভরশীলতা প্রমাণ করে— উভয়েই লাভবান হচ্ছে, যা কিনা ঔপনিবেশিক ও নব্য ঔপনিবেশিকদের চরিত্রে নেই। তাদের মাথায় একটাই চিন্তা থাকে— কিভাবে নিজেদের আখের গোছানো যায়।
এরই মধ্যে আফ্রিকার কয়েকটি দেশ চীনের উপস্থিতি নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছে। তারা নিশ্চিন্ত হতে পারে এটি দেখে— তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয়ে কোনোরকম উত্সাহই নেই জনসংখ্যার বিচারে পৃথিবীর সর্ববৃহত্ রাষ্ট্রটির। তাছাড়া অযাচিত হস্তক্ষেপ ছাড়াই চীন যদি অভ্যন্তরীণ বিষয়াবলীকে প্রভাবিত করতে পারে তাহলে তাকে কিছুতেই ঔপনিবেশিক শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা ঠিক হবে না; বলা যেতে পারে নেতৃত্বপূর্ণ শক্তি।
কার্যত চীন কেবল প্রাকৃতিক সম্পদই কিনে নিচ্ছে না, সাহায্য করছে অবকাঠামো উন্নয়নে। সেখানে তারা একের পর এক নির্মাণ করে দিচ্ছে স্কুল ও হাসপাতাল। সরবরাহ করেছে প্রযুক্তিও। সর্বোপরি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সদস্য হিসেবে ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্তি পেতে পারে না চীন। যেহেতু পুঁজিবাদ অনেকের কাছে শোষণের রূপে দেখা দেয়, সেহেতু আফ্রিকায় সে সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। চীনা পুঁজিবাদীদের শোষণের মাত্রাকে কমিয়ে আনা যায় বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার কাঠামোর মধ্যে থেকেই। যদি চীনা ব্যবসায়ীদের কর্তৃক কোনো দেশের জাতীয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার গোপন ইচ্ছা প্রকাশ পায়, তাহলে আফ্রিকার সরকারগুলোর ক্ষমতা আছে তাদেরকে থামিয়ে দেয়ার। কারণ সকল দেশই সার্বভৌম।
পরিবেশ দূষণ, সম্পদের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং স্থানীয়দের সঙ্গে দ্বন্দ্বের জন্য চীনা ব্যবসায়ীদের দায়ী করা যেতে পারে। কিন্তু আইনের শাসন দ্বারা এসব সমস্যা তো দূর করা যায় খুব সহজেই। দু’য়েকটি দৃষ্টান্তের কারণে সার্বিকভাবে চীনের উপর নব্য ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের অপবাদ চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। সবদিক বিচার-বিশ্লেষণ করে বলা যায়, এ অপবাদ এই মুহূর্তে দেশটিকে দেয়া যাচ্ছে না, ভবিষ্যতেও যাবে কি-না সন্দেহ রয়েছে। বেইজিং ঘোষণায় লেখা প্রতিশ্রুতি মানতে বদ্ধপরিকর তারা। ঘোষণায় লেখা রয়েছে— সিনো-আফ্রিকান সম্পর্ক রাজনৈতিক সমতা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। পুঁজিবাদের শেষ অদূষিত ভূমি আফ্রিকায় জড়িত থেকে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিকর কোনো কিছুই করবে না চীন।
— ইন্টারন্যাশনাল হেরাল্ড ট্রিবিউন অনুসরণে