রাজনীতিতে নতুন মাত্রা

রাজনৈতিক দল হিসেবে নির্বাচন কমিশনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন হাইকোর্ট অবৈধ ঘোষণা করায় দেশের সামগ্রিক রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত হতে চলেছে। যদিও সুপ্রিম কোর্টে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির পর এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানাবে। এরপরও আগামী দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটির ভূমিকা কি হবে তা নিয়ে নানা জল্পনা কল্পনা চলছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, চূড়ান্তভাবে জামায়াত নিষিদ্ধ হলে ভোটের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ ঘটবে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক জামায়াত। ২০০১ সালে জামায়াতে ইসলামীর সাথে জোটবদ্ধ হয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। সামপ্রতিককালে বিভিন্ন ইস্যুতে দল দুটি যুগপত্ আন্দোলন করে আসছিল। লাভ ক্ষতির হিসাব জামায়াত চূড়ান্তভাবে নিবন্ধন হারালে বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ ঘটবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, যদি আগামী নির্বাচন যথাসময়ে হয় এবং তাতে জামায়াত অংশ নিতে না পারে তাহলে তাদের ভোট টানার চেষ্টা চলবে বিএনপিসহ জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী ঘরানার দলগুলোর মধ্যে। কারও কারও ধারণা, জামায়াত থাকার কারণে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের যেসব দল বিএনপির জোটে সম্পৃক্ত হতে এতদিন আপত্তি জানিয়ে আসছে, এখন সে প্রতিবন্ধকতা দূর হওয়ার একটি ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। এদিক থেকে বিএনপি লাভের অঙ্ক কষতে পারে। নির্বাচনী জোটে জামায়াত সঙ্গে না থাকলে নতুন প্রজন্মের ভোটারদের কাছেও বাড়তি সুবিধা করতে পারবে বিএনপি। তবে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের দাবি আদায়ে রাজপথের আন্দোলন জোরদারে জামায়াত-শিবিরকে পাশে না পেলে বিএনপি কতটুকু সফল হবে তা নিয়ে কেউ কেউ সংশয় প্রকাশ করছেন। বিএনপির হাইকমান্ড এর সঙ্গে একমত নন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কারও কারও মতে, জামায়াত চূড়ান্তভাবে নিবন্ধন হারালে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জন্যও রাজনৈতিক সুবিধা বাড়তে পারে। আগামী নির্বাচনকেন্দ্রিক সমীকরণেও বাড়তি সুবিধা পেতে পারে দলটি। পাশাপাশি সরকার বিরোধী আন্দোলনকে দুর্বল করার ক্ষেত্রেও সুবিধাজনক অবস্থান করতে পারেন ক্ষমতাসীনরা। যদিও বিএনপি নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়সহ কয়েকজন বলেছেন, জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করা হলে দেশে অস্থিরতা আরও বাড়বে। আন্তর্জাতিক মিত্র রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত যখনই কোথাও রাজনৈতিকভাবে অসুবিধায় পড়ে তখন তাদের আন্তর্জাতিক বন্ধুমহল নানাভাবে সহযোগিতা করার চেষ্টা করে। বিশেষ করে পাকিস্তান, সৌদি আরব, তুরস্কসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে দলটির সুসম্পর্ক রয়েছে। এমনকি মিসরের ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট মুরসির দল মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে দলটির সম্পর্কের কথা শোনা যায়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর যখন জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ হয় তখন দলের শীর্ষ নেতাদের বেশিরভাগই পাকিস্তানে আশ্রয় নেন। কেউ কেউ চলে যান সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। বৃহস্পতিবার হাইকোর্ট জামায়াতের নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করার পর এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ভারতের জামায়াতে ইসলামী হিন্দ। জামায়াতে ইসলামী হিন্দের আমির মাওলানা সৈয়দ জালালউদ্দীন উমরি বিবিসিকে বলেছেন, ‘সারাবিশ্বে ইসলামী দলগুলোকে রাজনীতির মূল স্রোত থেকে দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে। বাংলাদেশের এই ঘটনাও সেই এক প্রয়াসের প্রতিফলন।’ এর আগে জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযমের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হওয়ার পর এনিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে পাকিস্তান জামায়াত। এমনকি পাকিস্তানে মন্ত্রিসভায়ও কয়েক মন্ত্রী কথা তোলেন বলে তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। এছাড়া মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচার কাজে কাউকে যেন মৃত্যুদণ্ড দেয়া না হয় সেজন্য বাংলাদেশের সরকারকে চিঠি পাঠিয়ে অনুরোধ করেছিলেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট। ৭২ বছরে তিনবার নিষিদ্ধ ১৯৪১ সালে জন্মের পর থেকেই নানা উত্থান-পতন আর প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়েই ৭২ বছর পার করছে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশসহ এ অঞ্চলের জামায়াত। এসময়ে রাজনৈতিক দল হিসেবেই তিনবার নিষিদ্ধ হয়েছিল এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় ইসলামিক রাজনৈতিক সংগঠন। বাংলাদেশ স্বাধীনের পরেও একবার নিষিদ্ধ হয়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ক্ষমতার হাতবদলে আবারও রাজনীতিতে ফিরে আসে দলটি। স্বাধীন বাংলাদেশে দ্বিতীয়বারের মতো সাংগঠনিকভাবে বড় ধরনের ধাক্কায় পড়েছে জামায়াত। হাইকোর্ট দলটির নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করলেও সামনের রাজনৈতিক ডামাঢোলে এর চূড়ান্ত পরিণতি কী হবে, তা সময়সাপেক্ষ বিষয়। জামায়াতের জন্ম ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ব্রিটিশ-ভারতে ১৯৪১ সালে আত্মপ্রকাশ করে জামায়াতে ইসলামী। ইসলামী রাজনীতিকে এগিয়ে নেয়ার কথা বলে ঐ বছরের ২৬ আগস্ট লাহোরের ইসলামিয়া পার্কে দলটির ঘোষণা দেন মাওলানা আবু আলা মওদুদী। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশেই জামায়াত বৃহত্ ইসলামিক রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে গড়ে ওঠে। দেশভাগের পর মওদুদীও ভারত ছেড়ে পাকিস্তানে চলে যান। আর বাংলাদেশের বর্তমান জামায়াতে ইসলামী মূলত পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতেরই রূপান্তর। প্রতিষ্ঠার ১৮ বছরের মাথায় জামায়াত প্রথম নিষিদ্ধ হয় ১৯৫৯ সালে। ১৯৬৪ সালে পাকিস্তান আমলে দ্বিতীয়বার নিষিদ্ধ হয় দলটি।১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান প্রতিষ্ঠার পর তৃতীয় দফা নিষিদ্ধ করা হয় জামায়াতকে। ১৯৭৯ সালের ২৫ মে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে প্রকাশ্য রাজনীতির সুযোগ পায় দলটি। এরপর জামায়াত রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে কঠিন সময়ের মুখোমুখি হয় বর্তমান সরকারের আমলে। একাত্তরের মানবতা বিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয় দলের শীর্ষ নেতাদের। ইতিমধ্যে দলের শীর্ষ তিন নেতার মৃত্যুদণ্ড এবং দু’জনকে যাবজ্জীবন কারাদাণ্ডের আদেশ দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ২০১০ সালে বিচারকাজ শুরু হওয়র পর থেকে এখন পর্যন্ত জামায়াতের প্রকাশ্যে সভা-সমাবেশ-মিছিলের ওপর এক ধরনের অলিখিত ‘নিষেধাজ্ঞা’ জারি রয়েছে। এর ওপর হাইকোর্ট থেকে নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা হওয়ায় বড় ধরনের চাপের মুখে দলটি।