সুনীল স্মারক
প্রকাশ : ০৩ আগস্ট ২০১৩, ২০:৩৫
সেদিন ছিল ২০০১-এর ২ ফেব্রুয়ারি। জাতীয় কবিতা উত্সবের শেষদিন। বিকেলে সুনীলদাকে নিয়ে একটা ছড়া পড়েছিলাম। সুনীলদা শিশুর মতো হাসলেন।
‘কত ধরনের ছড়াই না আজকাল লেখা হয়! ছড়াটা ভালো লিখেছেন।’
এই মন্তব্যটা এখনও কানে বাজে। সেদিনের আড্ডায় সুনীলদাকে অর্বাচীনের মতো বলেছিলাম, ‘সুনীলদা, আপনি তো ‘একা এবং কয়েকজন’, ‘সেই সময়’ কিংবা ‘প্রথম আলো’র মাধ্যমে নবপ্রজন্মকে বাঙালির গৌরব ও সফলতার গল্প শুনাতে চেয়েছেন। আমরা বাংলার রেনেসাঁ ও রবীন্দ্রনাথকে চিনেছি আপনার রচনার প্রসাদগুণে।’
সুনীলদা হাসলেন। আমি বলে যাচ্ছি,
‘কিন্তু ছোটদেরকে আপনি উপেক্ষা করেছেন। ছোটদের জন্য রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আপনি একটা বই লিখুন। বাচ্চারা রবীন্দ্রনাথকে রক্ত-মাংসে চিনতে আপনার বই পড়বে।’
সুনীলদা বললেন, ‘ঐ চিন্তা থেকেই ‘রাণু-ভানু’ লিখেছি। দেখি তোমার প্রস্তাব ভেবে দেখব। রবীন্দ্রনাথ নিয়ে তা অনেক লিখলাম।’...
...ঢাকায় এলেই সুনীলদার সঙ্গে দেখা হতো। ‘মনের মানুষ’-এর প্রিমিয়ারে এলেন সুনীলদা। ঢাকা ক্লাবে ছিলেন। এক দুপুরে নিরাভরণ আড্ডা হলো। শেষ দেখা কলকাতায়। ইমদাদুল হক মিলন একটা দামি পুরস্কার পাচ্ছেন। সুনীলদাও। কলামন্দিরে অনুষ্ঠান। সুনীলদা খুব বিষণ্নভাবে বসে রইলেন। সামান্য হাসি, উদাস চাহনি। গলার চামড়ায় অতিকুঞ্চন, একটু শুকনো—সুনীলদার দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকিনি। কথাও হয়েছে খুব কম। এই তো সেপ্টেম্বর ২০১২-এর কথা। সেই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে শেষ দেখা। চলে যাওয়ার ছায়া যেন তার সর্বাঙ্গে। তবে সুনীলদা অমরস্রষ্টা। কোথায় যাবেন তিনি? সারাক্ষণ জীবন্ত সুনীল তার রচনাসমূহের মাধ্যমে আমাদের সঙ্গে আছেন। এর চেয়ে বড় সান্ত্বনা আর কী আছে!
সামান্য ফুটনোট :এক আড্ডায় কবি আসলাম সানী একটা প্যাডের কাগজ বের করে সুনীলদার সামনে মেলে ধরলেন।
‘আমীরুল সম্পর্কে কিছু লিখে দিন দাদা। কোথাও ব্যবহার করব।’
সুনীলদা অতি ভদ্রলোক। অত্যন্ত অমায়িক। কলম নিয়ে খসখস করে আমার সম্পর্কে লিখে দিলেন।
আমি যে স্তম্ভিত। লেখাটা আমার হাতে ধরিয়া দিয়ে বললেন, ‘লেখাটা যেখানে খুশি ব্যবহার করতে পারো।’
আমি লজ্জায় মরে যাচ্ছি।
‘বইয়ের ফ্ল্যাপে ব্যবহার করতে পারব?’
‘নিশ্চয়ই।’
আমি আনন্দিত, খুশিতে বাক্যহারা। সেই লেখাটা অনেক যত্নে সংরক্ষণ করে রেখেছি। কোথাও এখনও ব্যবহার করিনি। মনে হয়েছে, এ আমার একান্তই ব্যক্তিগত সম্পদ। সুনীলদা ভালোবেসে লিখে দিয়েছেন। এই সার্টিফিকেট কোথাও বিক্রি করা ঠিক হবে না।
সুনীলদা আজ নেই।
দুঃখ পরাক্রান্ত হূদয়ে সুনীলদার স্বহস্তে লিখিত সেই লেখাটা বাংলাদেশে এই প্রথম এই লেখার সঙ্গে প্রকাশিত হলো।