ফল খারাপের প্রধান কারণ ৪ বিষয়ে সৃজনশীল পরীক্ষা

বিজ্ঞান ও বাণিজ্য বিভাগের দুটি করে চারটি বিষয়ে এবার প্রথমবারের মতো সৃজনশীল পদ্ধতিতে পরীক্ষা হবার কারণে শিক্ষার্থীরা ভালো চর্চা করতে পারেনি। ২০০৯ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত টানা পাসের হার বৃদ্ধির পর এবারের ফল খারাপ হওয়ার কারণ হিসেবে এ বিষয়কেই সামনে নিয়ে আসছেন শিক্ষকরা। এছাড়া বিজ্ঞানের একাধিক শিক্ষার্থী জানিয়েছে, রসায়নের পরীক্ষায় ভালো ভাল হয়নি। আর বেশিরভাগ ব্যবসায় শিক্ষার শিক্ষার্থীর ব্যবসায় নীতি ও প্রয়োগ পরীক্ষা খারাপ হয়েছে বলে জানিয়েছে। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতার বিষয়টি কিছুটা হলেও শিক্ষার্থীদের মনে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। শিক্ষার্থীদের মনে শংকা তৈরি হয়েছে। আর এর প্রভাব পড়তে পারে পরীক্ষার সময়। এবার আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পাস করে ৭১ দশমিক ১৩ শতাংশ। গতবার এই হার ছিল ৭৬ দশমিক ৫০ শতাংশ। এবার পাসের হার কমেছে ৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ। ২০১২ সাল থেকে এইচএসসিতে বাংলা প্রথমপত্রে সৃজনশীল প্রশ্নের আলোকে পরীক্ষা শুরু হয়। চলতি বছর এর সাথে বিজ্ঞান ও বাণিজ্যে আরো দুটি করে বিষয় সৃজনশীল প্রশ্নের আলোকে পরীক্ষা হয়। বিজ্ঞানে রসায়ন প্রথম ও দ্বিতীয়পত্র, ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ব্যবসায় নীতি ও প্রয়োগ প্রথম ও দ্বিতীয়পত্রে সৃজনশীল পদ্ধতি চালু হয়। ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, রসায়ন ও ব্যবসায় নীতি এবং প্রয়োগ পরীক্ষায় কম পাস করেছে। গত বছর যেখানে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে ৯০ দশমিক ৭৭ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করে। এবার সেখানে পাস করে গতবারের চেয়ে প্রায় ১০ শতাংশ কম। একইভাবে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে এবার রসায়নে পাস করেছে ৮২ দশমিক ৮৪ শতাংশ। এবার এই বোর্ডে রসায়নে পাস করে ৭৯ দশমিক ৫২ শতাংশ। যশোর বোর্ডে এই বিষয়ে গতবার পাস করে ৮৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ কিন্তু এবার পাস করে ৭৭ দশমিক ৪৫ শতাংশ। চট্টগ্রামে গতবার পাস করে ৮০ দশমিক ৭৪ শতাংশ, এবার পাস করে ৭২ দশমিক ৪৯ শতাংশ। বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে এবার পাস করে ৭১ দশমিক ৫৪ শতাংশ, এই বোর্ডে গতবার পাস করেছিল ৮৫ দশমিক ৩২ শতাংশ। সিলেটে রসায়নে গতবার পাস করে ৯৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ, এই বোর্ডে রসায়সে এবার পাস করে ৮৪ দশমিক ৩৯ শতাংশ। দিনাজপুর বোর্ডে এবার রসায়নে পাস করে ৬৮ দশমিক ৩২ শতাংশ, সেখানে গতবার পাস করেছিল ৮০ দশমিক ৮৮ শতাংশ। ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ব্যবসায় নীতি ও প্রয়োগ বিষয়ের ক্ষেত্রে গতবারের চেয়ে এবার পাসের হার কমেছে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে গতবার এ বিষয়ে পাস করেছিল ৯৪ শতাংশের বেশি। এবার পাস করেছে ৭২ দশমিক ৮৪ শতাংশ। এভাবে প্রায় সব বোর্ডেই এই বিষয়ে পাসের হার কমেছে। রাজধানীর ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মাকসুদ উদ্দিন জানান, বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষায় সৃজনশীল পদ্ধতি চালু হওয়ায় শিক্ষকরাও বিপাকে পড়েছেন। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ না পাওয়ায় শিক্ষকরা সৃজনশীল পদ্ধতির আলোকে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদানে ততটা সক্ষম ছিলেন না। ফলে বিপাকে পড়েছে শিক্ষার্থীরা। বিজ্ঞান বিভাগের রসায়নে সৃজনশীল পদ্ধতি চালু হবার কারণে ফল খারাপ হয়েছে বলে মনে করছেন রাজধানীর আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ শাহান আরা বেগম। তিনি বলেন, আমার ধারণা সব শিক্ষক সৃজনশীল বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ পাননি। এ কারণে এর প্রভাব পড়েছে শিক্ষার্থীদের ওপর। তিনি বলেন, বইয়ে সৃজনশীল বিষয়ে তেমন প্রশ্নও ছিল না। রাজধানীর শামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মাহবুবুর রহমান বলেন, রসায়নে সৃজনশীল পদ্ধতি চালু হয়েছে কিন্তু সব শিক্ষক প্রশিক্ষণ পাননি। আবার রাজধানীর অনেক শিক্ষক প্রশিক্ষণ পেলেও মফস্বলের শিক্ষকদের ক্ষেত্রে এ অবস্থা আরো খারাপ। তিনি প্রশ্ন রাখেন, শিক্ষকরা নিজেরা না জানলে কিভাবে শিক্ষার্থীদের পড়াবেন। রাজধানীর এ কে উচ্চ বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ সেলিম ভুঁইয়াও ফল খারাপ হওয়ার জন্য সৃজনশীল পদ্ধতিকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ না দিয়ে সরকার একের পর এক সৃজনশীল পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। ফলে ফল খারাপ হওয়া স্বাভাবিক। তবে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক তাসলিমা বেগম বলেন, রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে শিক্ষার্থীরা শংকায় ছিল। এ কারণে এর প্রভাব পড়েছে পরীক্ষায়। কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবুল কাসেমও রাজনৈতিক অস্থিরতাকে দায়ী করেন। গতকাল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে ফল প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনেও বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক কর্মসূচিকে দায়ী করা হয়। শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, ঘোষণা অনুযায়ী পরীক্ষা শেষ হওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে এবারও ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। হরতালের কারণে এবার এইচএসসির ৩২টি বিষয়ের পরীক্ষা পিছিয়ে দিতে হয়েছে। পরীক্ষার পরেও হরতাল ও রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য উত্তরপত্র মূল্যায়নেও কিছুটা ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে শিক্ষা বোর্ডগুলোকে। তারপরও আমরা সকল বাধা অতিক্রম করে দ্রুত সময়ে পরীক্ষার ফল প্রকাশ করেতে পেরেছি। তিনি বিরোধীদলকে দায়িত্বজ্ঞানহীন উল্লেখ করে বলেন, ‘তারা পরীক্ষার সময় হরতাল দিয়েছে। এ কারণে পরীক্ষার্থীরা ভীত ছিল। আর এ কারণে ফল খারাপ করেছে।’