পবা’র প্রতিবেদন
সব সেমাইয়ে ফরমালিন
প্রকাশ : ০৩ আগস্ট ২০১৩, ২৩:৩৬
দেশে ঈদের সময় সেমাই খাবারটি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত হওয়ায় অসাধুতার কারণে তাতে স্বাস্থ্যঝুঁকির আশংকার বিষয়টি পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) এক প্রতিবেদনে ফুটে উঠেছে। প্রকাশিত এ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাজারের শতভাগ সেমাইয়ে ফরমালিন রয়েছে, এমনকি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের প্যাকেটজাত সেমাইও এ থেকে বাদ নেই। পণ্য বেশিদিন টিকিয়ে রাখতে ব্যবহূত এই ফরমালিন মানব দেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এর প্রভাবে ক্যান্সারসহ কিডনি ও লিভারের নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে বলে চিকিত্সকরা বলছেন। রাজধানীর নিউ মার্কেট, কলাবাগান, চকবাজার এবং বেগম বাজার থেকে পবা গত ১৫ জুলাই থেকে ২৫ জুলাই পর্যন্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্যাকেটজাত ও খোলা সেমাইয়ের নমুনা সংগ্রহ করে। এরপর সেমাই পরীক্ষা করে তারা ৩০ পিপিএম পর্যন্ত ফরমালিনের উপস্থিতির প্রমাণ পেয়েছে। পবা’র সম্পাদক প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবদুস সোবহান বলেন, ঢাকার বিভিন্ন মার্কেটের দোকান থেকে নমুনা সংগ্রহ করে আমাদের কার্যালয়ে টেস্ট করে এ ফলাফল পেয়েছি। তিনি আরো বলেন, খোলা সেমাইয়ে ফরমালিনের পরিমাণ তুলনামূলক কম থাকলেও লাচ্ছা ও ভার্মিসিলি সেমাইতে তা আশংকাজনক পরিমাণে বিদ্যমান। অথচ দেশে খাদ্যে ফরমালিন ব্যবহারের আইনগত কোনো ভিত্তি নেই। এমনকি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও ফরমালিন ব্যবহারের কোনো স্ট্যান্ডার্ড দেয়নি।
এদিকে খাদ্যপণ্যে ফরমালিনের ব্যবহার ঠেকাতে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা বাজার তদারক ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জেল-জরিমানা করলেও তা রোধ করা যাচ্ছে না। এই ফরমালিনের উত্স নিয়েও সমপ্রতি এক আলোচনা সভায় প্রশ্ন তোলেন বাণিজ্যমন্ত্রী জি এম কাদের। তিনি জানান, অবৈধভাবে দেশে আসছে এই রাসায়নিক। গত বছরের নভেম্বর থেকে তারা কোনো সংস্থাকে ফরমালিন আমদানির অনুমোদন দেননি।
পবা’র পরীক্ষায় সবচেয়ে বেশি মাত্রার ফরমালিন পাওয়া গেছে ড্যানিশ লাচ্ছা সেমাইয়ে—এর পরিমাণ ২৯ দশমিক ৮৩ পিপিএম। এছাড়া বনফুল লাচ্ছা সেমাইয়ে ২৯ দশমিক ২৪, স্কয়ারের রাঁধুনি ভার্মিসিলি স্টিক সেমাইয়ে ২৯ দশমিক ১০, প্রাণ লাচ্ছা সেমাইয়ে ২৭.৬, কুলসন লাচ্ছা সেমাইয়ে ২৫ দশমিক ৭৭, কুলসন স্পেশাল লাচ্ছা সেমাইয়ে ২৫ দশমিক ১৫, ড্যানিশ স্পেশাল লাচ্ছা সেমাইয়ে ২৬ দশমিক ০৩, এসিআই পিওর সেমাইয়ে ৩ দশমিক ৯১, আলাউদ্দিন চিকন সেমাইয়ে ৪ দশমিক ৪১ পিপিএম ফরমালিন পাওয়া গেছে বলে পবার প্রতিবেদনে বলা হয়।
তবে পবার এই পরীক্ষার ফল নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছে স্কয়ার গ্রুপের মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপক মো. শেহাব। তিনি বলেন, আমাদের ভার্মিসিলি স্টিক সেমাই তৈরির যে পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়, তাতে ফরমালিন ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই। আমরা কোনোভাবেই ফরমালিন ব্যবহার করি না এবং যে কোনো ধরনের ক্ষতিকর পদার্থের কার্যকারিতা নষ্ট করতে ২৮০ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রার ওভেন ব্যবহার করি। তারপরও যে অভিযোগ পবা তুলেছে, তার সত্যতা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে বলে তিনি জানান।
এদিকে পবার পরীক্ষার সঙ্গে একমত পোষণ করে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল হোসেন বলেন, বাজারের প্রচলিত সব ধরনের সেমাইয়ে ফরমালিন পাওয়ার অভিযোগ আমরা নিয়মিত পাচ্ছি। তাই বাজারে অধিদপ্তরের অভিযান আরো জোরদার করা হবে বলে তিনি জানান। তিনি আরো বলেন, নাসিম এগ্রো ফুডের সেমাই কারখানায় আমরা গত বৃহস্পতিবার ‘টেক্সটাইল ডাইং’ ব্যবহারের প্রমাণ পাই এবং জরিমানা করেছি। উল্লেখ্য, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর গত ৩১ জুলাই এক পরীক্ষায় প্রিন্স লাচ্ছা সেমাইয়ে ফরমালিন পেয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে জরিমানা করে।
পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউটের (বিএসটিআই) প্রত্যায়ন অণুবিভাগের পরিচালক কমল প্রসাদ দাস বলেন, সেমাইয়ে ফরমালিন ব্যবহারের কোনো আবশ্যকতা নেই। পবার প্রতিবেদনকে ‘আতংকজনক’ অভিহিত করে তিনি বলেন, এ বিষয়ে বিএসটিআই কর্তৃপক্ষ নিরীক্ষা করে ফলাফল অনুযায়ী পদক্ষেপ নেবে এবং প্রয়োজনে পণ্যের প্রত্যয়ন বাতিল করবে।