ফতেহাবাদ থেকে ফরিদপুর
তরিকুল ইসলাম হিমেল, ফরিদপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০৪ আগস্ট ২০১৩, ২০:৫৯
বর্তমান ফরিদপুরের পূর্ব নাম ছিল ফতেহাবাদ। এই সেই ফতেহাবাদ, যে নগরী বাংলার স্বাধীন সুলতানদের আমলে টাকশাল শহরের মর্যাদা লাভ করে। এমনকি সুলতান সাইফুদ্দিন ফিরোজ শাহ (মালিক আন্দিল) এর আমলে ৮৮৯ হিজরি মোতাবেক ১৪৮৪ সালে ৩ বছরের জন্য রাজধানী নগরী হবার গৌরব অর্জন করেছিল। খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীর শেষের দিকে বঙ্গোপসাগর থেকে জেগে ওঠা এ ভূখন্ডে জনবসতির সূচনা হয়। অবশ্য বঙ্গোপসাগর স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে রেখে গেছে একটি হ্রদ, যা পরবর্তীকালে ডোলসমুদ্র নামে পরিচিতি লাভ করে। সম্ভবত ইলিয়াসশাহী বংশের সুলতানদের কারো রাজত্বকালে (৭৪৩ হিজরি থেকে ৮১৫ হিজরি) ফতেহাবাদে প্রথম প্রশাসনিক কার্যক্রমের সূচনা হয়। কেননা, রাজা গণেশের পুত্র জালালুদ্দিনের রাজত্বকালে ৮২১ হিজরিতে ফতেহাবাদ টাকশাল থেকে প্রথম মুদ্রা বের হতে দেখা যায়। কাজেই এর বেশ কিছুদিন আগে জনবসতি শুরু না হলে এসময়ে একটি টাকশাল শহরের রূপ লাভ করে কিভাবে। তবে গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুরের মধ্য অঞ্চলটি এ জেলার সবচেয়ে পুরাতন এলাকা। খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীতে এর অস্তিত্বই শুধু ছিল তা নয়, বরং মহারাজ সিংহ বর্মার পুত্র মহারাজ চন্দ্র বর্মাকে পরাজিত করে গুপ্ত সম্রাট সমুদ্র গুপ্ত বাংলা অধিকার করেন। কোটালীপাড়ায় এ চন্দ্র বর্মার রাজধানী শহর ও দুর্গনগরী চন্দ্র বর্মার ধ্বংসাবশেষ আজও বিদ্যমান। যা হোক ফতেহাবাদ ধীরে ধীরে ফরিদপুর নাম পরিগ্রহ করে। ইতিহাসের পাতায় সর্বপ্রথম এটা পীরস্থান নামে রেকর্ডভুক্ত হয়েছে। সপ্তদশ শতাব্দীতে নথিপত্রে ফরিদপুরের নাম দেখা যায়। সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে ১৬৬৪ সালের ১৬ অক্টোবর বাংলার সুবেদার নবাব শায়েস্তা খান যখন রাজমহল থেকে এ পথে ঢাকা আসছিলেন, তখন হাজারহাটি নামক স্থানে উপনীত হলে স্থানীয় বিচক্ষণ ব্যক্তিরা তার ফরিদপুরের পথে ঢাকা গমন নিরাপদ নয় বলে মত প্রকাশ করেন। কারণ হিসেবে তারা এই অঞ্চলে মগ জলদস্যুদের দৌরাত্ম্যের কথা উল্লেখ করেন। তবে শায়েস্তা খান একথা হেসে উড়িয়ে দিয়ে ফরিদপুরের পথেই ঢাকা রওনা করেন।( ফরিদপুরের ইতিহাস ২য় খন্ড)।
পরে ১৭৬৪ সালে নির্মিত রেনেলের মানচিত্রেও ফতেহাবাদের স্থলে ফরিদপুর ব্যবহার করতে দেখা যায়। সম্ভবত শের শাহের আমলে বা সমসাময়িক সময়ে কোন একজন ফরিদ নামীয় অলী আল্লাহর নাম অনুসারে এ নামের সূচনা । কেননা ইংলিশ অফিসের পিছনে ফরিদপুর-যশোর রোডের পার্শ্ববর্তী একটি ভূমিখন্ড পীরস্থান নামে রেকর্ডভুক্ত হয়েছে এবং এখানে শাহ ফরিদ মসজিদ নামে একটি মসজিদও রয়েছে। অবশ্য মসজিদটি খুবই অল্পদিন আগে নির্মিত।
১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শাসনভার স্বহস্তে গ্রহণ করেন। এসময় ফরিদপুর ঢাকা জেলার অধীনে ছিল। ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় ঢাকায় দুইজন কালেক্টর নিযুক্ত হন। একজন ঢাকা, অপরজন ঢাকা জামালপুর ( ঢাকার অংশ ফরিদপুর ও বাকেরগঞ্জ এর সমন্বয়ে গঠিত)। তবে ভূষনা তখনো রাজশাহী জমিদারির অধীনে ছিল। নায়েব নাজিমের অধীনে ঢাকা জামালপুরের আয়তন ছিল ২৫ হাজার বর্গমাইল। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের(১৯৯৩) সময় বর্তমান গোয়ালন্দ এবং গোপালগঞ্জ-এর অংশবিশেষ যশোরের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।১৮০৭ সালে ঢাকা জামালপুর সদর দফতর ফরিদপুরে স্থানান্তরিত হয়। ১৮১৫ সালে একজন সহকারী কালেক্টরের অধীনে এ জেলাকে পৃথক জেলার মর্যাদা দেয়া হয়। ১৮৩৩ সালে এটাকে জয়েন্ট ম্যাজিস্ট্রেসিএবং ডেপুটি কালেক্টরশীপের মর্যাদায় উন্নীত করা হয়। ১৮৫৯ সালে একজন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এবং কালেক্টরের অধীনে ফরিদপুর জেলাকে পূর্ণাঙ্গ জেলার মর্যাদায় উন্নীত করা হয়। তখন এর আয়তন ছিল ১২১৩ বর্গমাইল। ১৮৫৩ সালে মানিকগঞ্জ মহকুমাকে ফরিদপুর থেকে বিছিন্ন করে ঢাকার সাথে যুক্ত হয়।১৮৭১ সালে পাবনা থেকে পাংশাকে পৃথক করে গোয়ালন্দ মহকুমা গঠন করা হয়। এর আগে ১৮৫৪ সালে বরিশালের অধীনে মাদারীপুর মহকুমা গঠন করা হয়েছিল। ১৮৭৩ সালে মাদারীপুরকে ফরিদপুরের সাথে সংযুক্ত করা হয়। ১৯০৯ সালে সদর থেকে মুকসুদপুর এবং মাদারীপুর থেকে গোপালগঞ্জ ও কোটালীপাড়াকে পৃথক করে গোপালগঞ্জ মহকুমা গঠন করা হয়।১৯৭৭ সালে ৩রা নভেম্বর মাদারীপুর মহকুমার পালং, নড়িয়া, ভেদরগঞ্জ, জাজিরা, গোসাইরহাট ও ডামুড্যা থানাকে পৃথক করে শরীয়তপুর মহকুমা গঠন করা হয়। ১৯৮২ সালের ৭ নভেম্বর থেকে ৮৪ সালে ১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়কালের মধ্যে সমগ্র জেলার থানাগুলোকে উপজেলায় উন্নীত করা হয়। পরে মহকুমা বিলুপ্ত করে সকল মহকুমাকে ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ মান উন্নীত করে জেলার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করা হয়। এভাবেই সমগ্র ফরিদপুর বিভিন্ন প্রশাসনিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে ৫টি জেলায় পরিণত হয়।