আমাদের সূর্যসন্তান শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ

শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ আমাদের ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার সন্তান। ১৯৪৩ সালের ১ মে ফরিদপুর জেলার মধুখালী উপজেলার কামারখালী ইউনিয়নের ছায়া ঘেরা, পাখি ডাকা, শান্ত সমাহিত, মধুমতি তীরবর্তী শস্য-শ্যামলা সালামতপুর (বর্তমান রউফ নগর) গ্রামে বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ জন্মগ্রহণ করেন। তার ডাকনাম মিকতাল। পিতার নাম মুন্সী মেহেদী হোসেন। মাতা মোছাঃ মকিদুননেছা। পিতা-মাতার বড় আদরের একমাত্র পুত্র মুন্সী আব্দুর রউফ। তার দুই বোন মোছাঃ জহুরা বেগম ও মোছাঃ হাজেরা বেগম। বীরশ্রেষ্ঠের পিতা মুন্সী মেহেদী হোসেন মসজিদে ইমামতি করতেন ও মক্তবে ছাত্র-ছাত্রী পড়াতেন। এ সামান্য আয়েই চলত তাদের সংসার। শৈশবেই আব্দুর রউফ এর পিতা তাকে আড়পাড়া মাদ্রাসায় ভর্তি করেন। আব্দুর রউফ অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। মা মকিদুননেছার স্বপ্ন ছিল আব্দুর রউফ লেখাপড়া শিখে মেট্রিক পাস করে চাকরি করে সংসারের অভাব অনটন দূর করবে।বীরশ্রেষ্ঠ শৈশবেই তাঁর পিতাকে হারান। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটির অকাল প্রয়াণে বীরশ্রেষ্ঠের পরিবারে নেমে আসে দারিদ্র্যের কালো থাবা। এহেন অভাব-অনটন আর দারিদ্র্র্যের মধ্যেই বীরশ্রেষ্ঠের বড় বোনের বিয়ে ঠিক হল, একটা নতুন শাড়িও বিয়েতে দেওয়া হল’না। মা মকিদুননেছা অঝোরে কাঁদলেন। মায়ের চোখের জল মুছে দিয়ে মুন্সী আব্দুর রউফ বললেন, মাগো, আমি চাকরি করব, বড় বুবুর জন্য শাড়ি কিনে আনব, আমাদের দুঃখ-কষ্ট থাকবে না।ঐ সময় বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ এর চাচা মুন্সী মোতালেব হোসেন ই.পি.আর-এ চাকরি করতেন। তাঁরই সহযোগিতা ও উত্সাহে ৮ম শ্রেণীতে পড়ুয়া বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ ১৯৬৩ সালের ৮ মে তারিখে ২০ বছর বয়সে ই.পি. আর-এ সৈনিক পদে যোগদান করেন। সামরিক শিক্ষা নিয়ে ল্যান্স নায়েক পদে উন্নীত হন। তাঁর সৈনিক নম্বর ছিল ১৩১৮৭। এ সময় মুন্সী আব্দুর রউফ এর ছোট বোন হাজেরার বিয়ে ঠিক হয়েছে নিজ গ্রাম সালামতপুরে। ছোট বোনের বিয়ের খবর জানিয়ে আব্দুর রউফকে চিঠি লিখেছেন মা। আব্দুর রউফ মাকে চিঠি লিখে পাঠালেন, মা তুমি কোন চিন্তা করো না। ছোট বোনের বিয়ের নতুন শাড়ি নিয়ে খুব শীঘ্রই বাড়ী আসছি আমি। কিন্তু বীরশ্রেষ্ঠের আর বাড়ীতে আসা হয়নি। ১৯৭১ সাল, সারাদেশে বেজে উঠেছে যুদ্ধের দামামা, শুরু হলো আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ চট্টগ্রামের ই.পি.আর. এর ১১নং উইং- এ কর্মরত ছিলেন বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ। তিনি ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগ দিয়ে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। সারাদেশে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ, মা-বোনের সম্ভ্রমহানি, জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে হাজার হাজার ঘরবাড়ী। সেই সময় অদম্য সাহস, অসীম দেশপ্রেম আর দেশমাতৃকাকে পরাধীনতার শৃঙ্খল মুক্ত করতে দৃঢ়প্রত্যয়ী এক যুবক, যার নাম বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ।