ফরিদপুরের বীরদের গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধ
তরিকুল ইসলাম হিমেল, ফরিদপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০৪ আগস্ট ২০১৩, ২১:০০
১৯৭১ সালের ডিসেম্বর। দেশের বিভিন্ন জায়গা শত্রুমুক্ত হচ্ছে। ফরিদপুরে তখনো নির্যাতন, হামলা, লুটপাট চালিয়ে যাচ্ছে পাক বাহিনী ও তার দোসররা। ১৬ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিক বিজয় অর্জনের ১ দিন পরে ১৭ তারিখ ফরিদপুরের পাক বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। ১৭ ডিসেম্বরেও পাক মিলিশিয়া ও বিহারীদের সাথে মরণপণ যুদ্ধ করেছে ফরিদপুরের মুক্তিযোদ্ধারা।
মুক্তিযোদ্ধা মো. শামসুদ্দিন মোল্যা ১৭ ডিসেম্বরের যুদ্ধের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. মোকাররম হোসেন ও আবুল ফয়েজ শাহনেওয়াজ এবং মুজিব বাহিনীর থানা কমান্ডার নীতিভূষণ সাহা ( পরবর্তীতে আর্মি ক্যাপ্টেন) এর নেতৃত্বে ১৫০ জন মুক্তিযোদ্ধা বর্তমান রাজবাড়ী জেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের লক্ষণদিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অবস্থান করছিলাম। আমাদের উপর দায়িত্ব ছিল মুক্তি ও মুজিব বাহিনীর যৌথ কমান্ডের নেতৃত্বে বিভিন্ন জায়গায় গেরিলা অপারেশন করা। দেশের অনেক জায়গা তখন শত্রুমুক্ত হলেও ফরিদপুর ছিল পাক হানাদারদের দখলে। যৌথ কমান্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ফরিদপুর শহর আক্রমণ করার জন্য আবুল ফয়েজ শাহনেওয়াজের নেতৃত্বে ৩০/৪০ জনের একটি দল নিয়ে অম্বিকাপুর ইউনিয়নের ভাষানচরে অবস্থান নেয়। হাবিলদার আবু তাহের দেওয়ানের নেতৃত্বে ১৪ জনের অপর একটি দলে আমরা চরমাধবদিয়া ইউনিয়নের আব্দুল মোল্লার বাড়িতে অবস্থান নেই। ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাক বাহিনী আত্মসমর্পণ করলেও ফরিদপুরে ওরা তখনো আত্মসমর্পণ করেনি। ১৭ তারিখ সকাল ৮ টায় আমার নাস্তা করছিলাম, এমন সময় ক্যাম্পে খবর এলো গোয়ালন্দ থেকে ৪ থেকে ৫ শত লোকের সশস্ত্র দল পদ্মার পাড় দিয়ে ফরিদপুরের দিকে এগিয়ে আসছে। আমাদের কমান্ডরা আবু তাহের দেওয়ান দ্রুত পজিশন নেওয়ার নির্দেশ দিলেন। আমরা পদ্মা থেকে উঠে আসা একটা নালার ভিতর এ্যম্বুশ নিলাম। পাক মিলিশিয়া ও বিহারীদের দলটি সামনে চলে আসল, আমার গুলি চালালাম, ওরাও পাল্টা গুলি শুরু করে দিল। ইতিমধ্যে আমাদের কমান্ডার পাশের ফয়েজ ভাইয়ের ক্যাম্পে ও খলিলপুরের যৌথ কমান্ডের ক্যাম্পে খবর পাঠিয়ে দেন। আমাদের কাছে অস্ত্র বলতে এলএমজি, এসএলআর, রাইফেল, স্টেনগান ও গ্রেনেড। ফায়ারিং এর এক পর্যায়ে আমরা বুঝতে পারি যে, আমরা ওদের গুলির রেঞ্জের ভিতরে। তখন আমরা গুলি করতে করতে পিছু হটতে থাকি। এসময় আমাদের সহযোদ্ধা ইউনুস মোল্লার গুলি লাগে, কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। খবর পেয়ে যৌথ বাহিনী ক্যাম্প থেকে নিতিভূষন সাহা, খান মাহাবুবে খোদা, আবুল ফয়েজ শাহনেওয়াজ এবং মেজবাউদ্দীন খান মিরোজের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা এই যুদ্ধে অংশ নেয়। শহীদ সালাউদ্দীন বাহিনীর ডা. ইমরান মজুমদার রুনু, আমিনুর রহমান ফরিদ, খলিল, ফরিদসহ ফরিদপুরের প্রায় সকল মুক্তিযোদ্ধা খবর পেয়েই আমাদের সাহায্যের জন্য চলে আসে। অন্যদিকে খবর পেয়ে মানিকগঞ্জ থেকে ক্যাপ্টেন আব্দুল হালিমের নেতৃত্বে লঞ্চে করে পদ্মা পার হয়ে বিপুল সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা এই যুদ্ধে অংশ নিতে আসে। ক্যাপ্টেন নূর মো. বাবুল তার টিম থেকে ২ ট্রাকে করে মুক্তিযোদ্ধাদের পাঠায় এই যুদ্ধে অংশ নেয়ার জন্য। বেলা ২ টার দিকে শেষ হয় এই যুদ্ধ । প্রায় শতাধিক মিলিশিয়া ও বিহারী মারা যায় এখানে। কথা বলার এই পর্যায়ে তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন যুদ্ধ শেষ, মুক্তিযোদ্ধারা ক্ষতবিক্ষত, চরাঞ্চল জুড়ে আনন্দে ফায়ারিং করছে। আর সেই সময় আমরা সহযোদ্ধা ইউনুস মোল্লার মরদেহ নিয়ে ৩৮ দাগ গ্রামে তার বাড়িতে যাই।
মুক্তিযোদ্ধা মো. সাখাওয়াত হোসেন বললেন, এই ১৭ ডিসেম্বরই মুক্তিযোদ্ধা শাহ মো. আবু জাফরের নেতৃত্বে ৩০/৩৫ জনের মুজিব বাহিনীর একটি টিম বিজয়ের খবর শুনে বোয়ালমারী থেকে ফরিদপুর আসার পথে মাঝকান্দি নামক জায়গায় পৌঁছলে কামারখালী থেকে আসা পাক আর্মির দুটি ট্রাকের সামনা সামনি হয়ে যায়। মুজিব বাহিনীর যোদ্ধারা কমান্ডারের নির্দেশে পজিশন নিয়ে ফায়ারিং শুরু করলে পাক আর্মির ট্রাক থেকে এক অফিসার হাত উঁচু করে নেমে এসে আত্মসমর্পণ করে। পরে মুজিব বাহিনীর যোদ্ধারা ওদের আটক করে ফরিদপুর সার্কিট হাউসে নিয়ে আসে।
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ৫ নম্বর আসামী ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ফরিদপুরের জেলা ইউনিট কমান্ডার নূর মোহাম্মদ ক্যাপ্টেন বাবুল জানান, ‘হেমায়েত বাহিনীকে সাথে নিয়ে গোপালগঞ্জকে মুক্ত করে আমরা ফরিদপুর আক্রমণ করার লক্ষ্যে ভাঙ্গায় এসে অবস্থান নেই। এরই মাঝে খরব আসে ঢাকাতে পাক বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে, আমরা যুদ্ধে জয়ী হয়েছি। খবর পেয়ে আমি আমার দল নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই ফরিদপুরে ঢুকি। ফরিদপুরে ঢুকেই আমি পাকিস্থান আর্মির কমান্ডার আরবান খানকে আত্মসমর্পণের জন্য বলি। আরবান খান আমার পাঠানো লোকের কাছে জানিয়ে দেয় সে মুক্তিবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করবে না, মিত্র বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করবে। এরই প্রেক্ষিতে মিত্র বাহিনীর ব্রিগেডিয়ার রাজেন্দ প্রসাদ নাথ ফরিদপুরে উপস্থিত হন। আরবান খান শহরের ময়েজ মঞ্জিলে রাজেন্দ প্রসাদ নাথ ও আমার কাছে আত্মসমর্পণ করে। এভাবেই ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পরে বিজয়ের ১ দিন পরে এসে ফরিদপুর জেলা শত্রুমুক্ত হয়।