পাহাড়ে আতংক, নোম্যান্’স ল্যান্ডে দুই শতাধিক পরিবার
খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি ও রামগড় সংবাদদাতা
প্রকাশ : ০৪ আগস্ট ২০১৩, ২৩:০৩
বাঙালি সেটেলারদের হামলার ভয়ে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার ২১৫টি পাহাড়ি পরিবার সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতের ত্রিপুরার কাছে নো-ম্যান্স ল্যান্ডে আশ্রয় নিয়েছে। উপজেলার সীমান্তবর্তী তাইন্দংয়ে এক মোটরসাইকেল চালককে অপহরণের জের ধরে গত শনিবার বিকালে কয়েকটি পাহাড়ি গ্রামে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এতে আশেপাশের এলাকায় আতংক ছড়িয়ে পড়ে। আবারো হামলার আশংকায় ওই পরিবারগুলো সন্ধ্যার পর সীমান্তে অবস্থান নেয়।
বিষয়টি জানতে পেরে গতকাল রবিবার পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার এমপি ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা ওই এলাকায় গিয়ে আতংকিত পরিবারগুলোকে দেশে ফিরে আসার অনুরোধ জানান। তবে গতকাল রাত ৯ টা পর্যন্ত তাদের ফিরে আসার খবর পাওয়া যায়নি। এদিকে রামগড় সার্কেলের এএসপি শাহাজাহান হোসেন জানান, অপহূত চালক কামাল হোসেনকে গতকাল উদ্ধার করা হয়েছে। আহত অবস্থায় তাকে মাটিরাঙ্গা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
দক্ষিণ ত্রিপুরার সাবরুম মহকুমা থেকে স্থানীয় সাংবাদিক বন্দন দাস টেলিফোনে ইত্তেফাককে জানান, পাহাড়ি পরিবারগুলো শনিবার সন্ধ্যার একটু আগে সীমান্তবর্তী ফেনীছড়া খাল অতিক্রম করে দক্ষিণ ত্রিপুরার করবুক মহকুমার শিলাছড়ি ব্লকের জলেয়া এলাকার কাছে নো-ম্যান্স ল্যান্ডে আশ্রয় নেয়। তারা কাঁটাতারের বেড়ার ১,২,৩ ও ৫ নং গেট দিয়ে ভিতরে প্রবেশের চেষ্টা করলেও বিএসএফের বাধার কারণে পারেনি। তবে বিএসএফ তাদেরকে হালকা খাবার ও পানি সরবরাহ করেছে। গতকাল করবুক মহকুমার এমএলএ প্রিয়মনী চাকমা ও এসডিপিও (সাব ডিভিশনাল পুলিশ অফিসার) দেব ধন চাকমাসহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা সীমান্তে আশ্রয় নেয়া পাহাড়ি পরিবারগুলোর খোঁজখবর নিয়েছেন বলে তিনি জানান।
এদিকে প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার সীমান্তের জয়চানবাড়ি এলাকায় আশ্রয় নেয়া সুকমল চাকমার সাথে মোবাইল ফোনে কথা বলে সবাইকে বাংলাদেশে ফিরে আসার অনুরোধ জানান। পরে ফেনীছড়া খাল সাঁতরিয়ে এপারে এসে শ্যামল কান্তি চাকমা ও বিশ্ব চাকমা প্রতিমন্ত্রীর কাছে তাদের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদানসহ তাদের পুর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান। মন্ত্রী এসব দাবি পূরণ করার আশ্বাস দিয়ে তাদেরকে দ্রুত দেশে ফিরে আসার অনুরোধ জানালে তারা খালের পানি কমলে ফিরবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন।
গতকাল সেনাবাহিনীর চট্টগ্রামের ২৪ পদাতিক ডিভিশন এর জিওসি মেজর জেনারেল সাব্বির আহমেদ পিএসসি মাটিরাঙ্গার ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামগুলো পরিদর্শন করেন। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। এর আগে দীপংকর তালুকদার, কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা, খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মাসুদ করিম, জেলা পুলিশ সুপার শেখ মিজানুর রহমানসহ জেলা আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামগুলো পরিদর্শন করেন।
৭ জন নিহত!
এদিকে ইউনাইটেড পিপল্স ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) খাগড়াছড়ি জেলা ইউনিটের প্রধান সংগঠক প্রদীপন খীসা গতকাল রবিবার এক বিবৃতিতে বলেছেন, মাটিরাঙ্গার তাইন্দং-এ পাহাড়ি গ্রামে বাঙ্গালিদের হামলা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও খুনের দায় প্রশাসন এড়াতে পারে না। সর্বশেষ তথ্য মতে শনিবারের হামলায় ৭০ বছরের এক বৃদ্ধসহ ৭ জন পাহাড়ি নিহত ও ৫০ জন আহত হয়েছেন, আর ১০টি পাহাড়ি গ্রামের ৫ শতাধিক বাড়িঘর পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এছাড়া ব্যাপক ভাংচুর ও লুটপাট চালানো হয়েছে।
যে সব গ্রাম হামলার শিকার হয় সেগুলো হলো দেওয়ান পাড়া, তাইন্দং, আচালং, সর্বেশ্বর পাড়া, মনুদাস পাড়া, বগাপাড়া, ডেনো ছড়া, ভগবান টিলা, বান্দরসিং পাড়া ও তালুকদার পাড়া। তালুকদার পাড়ায় শনিবার রাত ১১টার দিকে আগুন দেয়া হয়। মাছ পাড়া, বান্দরসিং পাড়া, বড়তলি ও আচালংসহ বেশ কয়েকটি এলাকার ৪/৫ হাজার বাঙ্গালি এসব হামলায় অংশ নেয়।
হামলায় নিহত পাহাড়িদের মধ্যে চার জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। এরা হলেন মনদাস পাড়ার অরুণ মোহন চাকমা (৭০), ডেনো ছড়া গ্রামের কালাধন চাকমা এবং সর্বেশ্বর পাড়ার সুরেশ ধন তালুকদার ও তার মা (নাম জানা যায়নি)। হামলার সময় পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর নীরব ভূমিকার তীব্র নিন্দা জানিয়ে সেটলাররা নিহতদের লাশ গুম করেছে বলে বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে।
বিবৃতিতে হামলার সাথে জড়িতদের গ্রেফতার ও শাস্তি, ক্ষতিগ্রস্তদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ প্রদান ও পুনর্বাসন, ঘটনা তদন্তে নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন, ভারতে আশ্রয় নেয়া পাহাড়িদের জানমালের নিরাপত্তার গ্যারান্টিসহ ফিরিয়ে আনা এবং আত্মরক্ষার জন্য পাহাড়িদের সশস্ত্র গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী গঠনের অনুমতি প্রদানের দাবি জানিয়েছে ইউপিডিএফ।
বিচার বিভাগীয় তদন্ত চেয়েছে ৮ সংগঠন
তাইন্দং-এ হামলার ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামে আন্দোলনরত ৮ পাহাড়ি সংগঠন। পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম নারী সংঘ, হিল উইমেন্স ফেডারেশন ও সাজেক ভূমি রক্ষা কমিটিসহ আরো পাঁচটি সংগঠন গতকাল রবিবার এক যুক্ত বিবৃতিতে বলেছে, এই হামলা পূর্ব পরিকল্পিত। সংগঠনের নেতৃবৃন্দ হামলার সাথে জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেফতার ও শাস্তি এবং ঘটনা তদন্তে নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন।