ছয় ব্যাংক থেকে ১২শ’ কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতি

ছয়টি ব্যাংক থেকে ১২শ’ কোটি টাকা ঋণ জালিয়াতি করেছে হলমার্কের মত আরেকটি বড় প্রতিষ্ঠান। এ ব্যাপারে ইতিমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিতে অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে। মহাজোটের দুইজন সংসদ সদস্যদের দুই ছেলে ওই প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক। ঋণ পেতে তারা ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ প্রয়োগ করে। দুদকের প্রাথমিক তদন্তে ঋণ জালিয়াতির সত্যতা মিলেছে। তবে এ ঘটনায় দুই এমপি পুত্র জড়িত বলে দুদক তদন্তে ধীর গতিতে এগুচ্ছে। এদিকে এই সরকারের আমলে তদন্ত শেষ হবে কিনা কিংবা টাকা উদ্ধার ও দোষীরা শাস্তি পাবে কিনা তা নিয়েও সংশয় দেখা দিয়েছে। জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সূত্র জানায়, ঋণ জালিয়াতির এই লিখিত অভিযোগ বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকে জানানো হয়েছে। কমিটির সভাপতির একান্ত সচিব ইকবাল বিন মতিন জানান, গত ৩০ জুলাই অভিযোগ এসেছে। ঈদের পর কমিটির পরবর্তী বৈঠকে এটি নিয়ে আলোচনা হবে। পরবর্তী করণীয় সেখানে ঠিক করা হবে। কমিটির সদস্যরা চাইলে এ বিষয়ে সংসদীয় তদন্ত কমিটিও গঠন করা হতে পারে। সংসদীয় কমিটির কাছে করা অভিযোগে বলা হয়েছে, হলমার্ক গ্রুপের মতো বড় একটি প্রতিষ্ঠান জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে ছয়টি ব্যাংক থেকে এক হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ নিয়েছে। জালিয়াতির সঙ্গে প্রতিটি ব্যাংকের লোকজন জড়িত। দুদক ব্যাংক ঋণ জালিয়াতির ঘটনা তদন্ত শুরু করলেও হঠাত্ তদন্তের গতি কমিয়ে দিয়েছে। অভিযোগ করা হয়েছে, বর্তমান সরকারের মেয়াদে তদন্ত সম্পন্ন হবে কিনা সে ব্যাপারে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। হলমার্ক গ্রুপের কেলেঙ্কারি ফাঁস হবার পর অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি একাধিকবার বলেছে দেশের আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। আর বৃহত্তর স্বার্থে হলমার্ক গ্রুপ ছাড়াও অন্য কোন প্রতিষ্ঠান জালিয়াতির মাধ্যমে যে কোন অংকের ব্যাংক ঋণ নিয়ে আত্মসাত্ করলে তার সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের শাস্তির বিষয়টি নিশ্চিত করা সম্ভব হলে এ ধরনের প্রবণতা কমে আসবে। সংসদীয় কমিটির কাছে করা অভিযোগ থেকে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি অত্যন্ত কৌশলে ছয়টি ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করে। প্রথমে প্রাইম ব্যাংক থেকে ৩৮০ কোটি টাকা তুলে নেয়া হয়। শাহজালাল ইসলামি ব্যাংকের ইস্কাটন শাখা থেকে নেয়া হয়েছে ১৪৯ কোটি টাকা। প্রিমিয়ার ব্যাংকে প্রায় ৮০ কোটি টাকা জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়েছে। জনতা ব্যাংকের তিনটি শাখায় জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়েছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। সাউথইস্ট ব্যাংক থেকে নেয়া হয়েছে ২৭ কোটি টাকা। এছাড়া যমুনা ব্যাংক থেকে নেয়া হয়েছে ১৬৪ কোটি টাকা। সূত্র জানায়, প্রতিষ্ঠানটি ব্যাংকের এক শ্রেণির লোকদের সহায়তায় বেশির ভাগ ঋণ বেনামে এবং চুক্তির বিপরীতে নিয়েছে। বিদেশে বড় অংকের পণ্য আমদানি-রফতানি করা হয় সাধারণত এলসির বিপরীতে। প্রতিষ্ঠানটি বিদেশি গ্রাহকদের সঙ্গে চুক্তি করে এবং সে চুক্তির কপি ব্যাংকে জমা দিয়ে ঋণ নিয়েছে। কিন্তু ঋণের বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটি বিদেশ থেকে কোনো পণ্য আমদানি করেনি। তবে কিছু কাঁচামাল আমদানি করলে তা দিয়ে কোনো পণ্য তৈরি করে তা বিদেশে রফতানিও করেনি। ফলে পুরো ঋণ প্রক্রিয়াটিই সম্পন্ন হয়েছে জালিয়াতির মাধ্যমে। ছয়টি ব্যাংক থেকে ঋণ জালিয়াতির বিষয়ে অনুসন্ধানের জন্য দুদকের উপ-পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের অনুসন্ধান টিম গত ২৬ ফেব্রুয়ারি গঠন করা হয়। দুদক এ পর্যন্ত ঘটনার ব্যাপারে ব্যাংক এবং প্রতিষ্ঠানের সাথে সংশ্লিষ্ট কমপক্ষে ৬০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। ব্যাংকের কর্মকর্তারা দুদকের অনুসন্ধান টিমকে বলেছেন, বিষয়টি জালিয়াতি জানার পরও তারা উপরের চাপে ঋণ দিতে বাধ্য হয়েছেন। উপর বলতে ছয়টি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নন। দু’জন ক্ষমতাধর ও প্রভাবশালী ব্যক্তির সন্তানরা জালিয়াতির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে ব্যাংক ঋণ পাইয়ে দিয়েছেন। অনুসন্ধানে প্রভাবশালী লোকজন জড়িত এটা বের হওয়ার পর দুদকের অনুসন্ধানের গতি কমে গেছে।