কিশোর গল্প
ন্যাড়ার লিটন কাকু
প্রকাশ : ০৫ আগস্ট ২০১৩, ১৭:৪৬
ন্যাড়া ওর লিটনকাকুর গল্প শুরু করে। —বুঝলি কিনা, অপহরণ না হয়ে গেলে লিটনকাকু এ্যাদ্দিনে হয় বড় বিজ্ঞানী নয়তো তা-বড় কবি হয়ে যেত।
আমি ত্বরিত ভাবতে বসি। মানুষ ওকালতিতে ফেল মেরে ওলকপির ব্যবসায় নেমে পড়ে, তা জানি; ডাকসাইটে বাড়িওয়ালা না হতে পেরে চিমসেমুখো ভাড়াটেই বনে যায় কেউ কেউ, সেও মালুম—কিন্তু বিজ্ঞানের সূত্রগুলো ধরাধরি করতে না পারলে মানুষকে কবিত্বে ধরে—এটা আমার জ্ঞানের মধ্যে নেই।
আমি ন্যাড়াকে প্রশ্ববিদ্ধ করার আগেই ন্যাড়া সমানে বলে যায়, তবে লিটনকাকু অপহূত হয়েছিল, নাকি সে স্বেচ্ছায় অপহরণকারীদের হাতে নিজেকে তুলে দিয়েছিল—সে এক মহাপ্রশ্ন।
তার মানে? —আমি মানে খুঁজি।
তার মানে কি আমি জানি? —ন্যাড়া ওর অপারগতা জ্ঞাত করে। —তবে শোনা কথা, ভিনগ্রহের এক মহাশূন্যযান—যাকে ফ্লাইং সসার বা ইউএফও বলে জানিস তোরা—সেই ফ্লাইং সসারের ভেতরে বসে লিটনকাকু নাকি বাড়িতে বড়চাচিকে...।
ফ্লাইং সসার!! —ন্যাড়ার কথার মাঝখানে আমি যেই না গলা ফাটিয়ে বাড়ি মাথায় করেছি, অমনি রান্নাঘর থেকে প্রারম্ভিক নাশতা হিসেবে তশতরি ভরে কিছু শসার টুকরো নিয়ে আমার পড়ার ঘরে হাজির কাজের মানুষ ফজলু ভাই।
তাইনা দেখে ন্যাড়া বেশ মজা পেল যেন। জিভে চটাস চটাস শব্দ তুলে বলল, ভারি অবাক কাণ্ড তো! সসারের কথা পাড়তে না পাড়তেই শসা এসে উপস্থিত! তাও আবার সসার, মানে তশতরিতে চেপে!
আমিও কম যাই না। বলি, ফজলু ভাই রান্নাঘর থেকে তশতরি হাতে একরকম উড়েই এসেছে। এই তশতরিটাকে তাই ফ্লাইং সসারও বলতে পারিস।
ন্যাড়া মুচকি হাসে। বলে, বেড়ে বলেছিস।
ন্যাড়া আর আমার যুগপত্ উচ্ছ্বাসের অসারতা প্রমাণ করতে যেয়ে পিচ্চি মুখটাকে তেবাঁকা করে বলেন, এই যে দ্যাখতাছি—কতগুলি ক্ষীরাই আনছে আমাগো লাইগা! এই ক্ষীরাই দেইখ্যা আহ্লাদে অমন ফাল পাড়তাছস ক্যান রে ন্যাড়া?
জবাব দেওয়ার জন্যে ন্যাড়া প্রস্তুত। বলল, টেলিপ্যাথির তুই কী বুঝস রে?
পিচ্চি বলল, খুব বুঝি! ওইডা একটা ডাক্তারির নাম, যেমুন এলোপ্যাথি হোমোপ্যাথি...।
বেশ বলেছিস তো! এখন নিশ্চয়ই বলবি টেলিফোনের মাধ্যমে রোগ-বালাইয়ের দাওয়াই বাতলে দেওয়ার কায়দাটিকে টেলিপ্যাথি বলে!
তা অইলেও অইতে পারে! —পিচ্চির পো।
আহা রে! —ন্যাড়া চুক চুক শব্দ তুলে সান্ত্বনা দ্যায়। —তোর জ্ঞানের বহর ভারি প্যাথেটিক অবস্থায় আছে দেখছি।
পিচ্ছি ন্যাড়ার দিকে ফ্যালফ্যাল তাকায়।
আমি ন্যাড়ার উদ্দেশে বলি, ক্ষীরাইয়ের সাথে টেলিপ্যাথির সম্পর্কটা একটু বুঝিয়ে বলবি?
ন্যাড়া তশতরি থেকে এক টুকরো ক্ষীরাই মুখ-গহ্বরে পাচার করতে করতে বলল, আরে বাবা, এই ক্ষীরাই খেয়ে খেয়েই তো লিটনকাকু ফ্লাইং সসারে তিরিশ-তিরিশটি বছর কাটিয়ে দিল। অরে, পিচ্চিকেও বলি— সামান্য বলে ক্ষীরাইকে অত তুচ্ছ জ্ঞান করতে যাস নে।
এক ক্ষীরাই খেয়ে তি-রি-শ বছর! —আমি যাকে বলে বিস্ময়াভিভূত, তা-ই বনে গেলাম। —কেমন করে সম্ভব হলোরে? খুলে বল ভাই, খুলে বল।
তা কেমন করে বলি! সবটুকু আমার জানা আছে নাকি? বড়চাচির সাথে লিটনকাকুর বছর-দুবছরে এক আধবার যা কথা হতো, সেই কথাবার্তার এক-আধ টুকরো এককান-দুকান হয়ে আমার কানে গড়িয়েছে—এই যা।
সেই কানকথাই শুনিয়ে যা না হয়! —বলেই গল্প শোনার লোভে আমি নেহাত কান-কাটার মতন কান পাতি।
ন্যাড়া তারপর কানকথা শোনাতে লেগে যায়।
ছোটবেলা থেকেই লিটনকাকু বলতে গেলে আকাশচারী, বুঝলি কিনা! সারাক্ষণ কেবল আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে—ঝকমকে নীল শামিয়ানার খাঁজে খাঁজে কি ধবধবে মেঘের আনাচে-কানাচে কী সে খুঁজে বেড়ায়, কে জানে। তবে এই তাকাতাকির সুবাদে ক্লাসে অমনোযোগী হয়েছে বলে স্যারদের হাতে কানমলা খেয়েছে আর পথ চলতে চলতে খেয়েছে এবার হোঁচট, একবার তো ল্যাম্পপোস্টের সাথে ঠোকর খেয়ে কপালে বগুড়ার আলু গজিয়ে গেল।
বড়চাচি একদিন লিটনকাকুর হাতে একটা নোটখাতা আর ঝরনাকলম গুঁজে দিয়ে বলেছে, নে এগুলো।
লিটনকাকু অবাক হয়ে বলেছে, কী এগুলো?
কী আবার! দেখতেই তো পাচ্ছিস, কলম আর নোটখাতা।
কী করব এগুলো দিয়ে? —লিটনকাকু মহাসংকটে পড়ে যেন।
কী আর করবি—কবিতা লিখবি! সারাক্ষণ আকাশের দিকে তাকাতে তাকাতে চুলে বাবরি গজিয়েছিস—কবিতা লেখার ইচ্ছে হচ্ছে তোর। তোর মতলবখানা কি আমি বুঝি না!
বড়চাচি লিটনকাকুকে হতভম্ব রেখে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।
লিটককাকু বড়চাচির পিছু নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে বলল, আমি কি কবিতা লিখব বলে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি নাকি?
বড়চাচি খুন্তি হাতে বলল, তাহলে? তাহলে তাকিয়ে থাকিস কেন খামোকা?
ফ্লাইং সসারের খোঁজে। —লিটনকাকু ওর এতদিনের চেপে রাখা আকাশ দর্শনের রহস্যটি অম্লানবদনে প্রকাশ করে।
উনুনে কড়াইয়ের ওপর পেঁয়াজ-লঙ্কা ফোড়ন দিয়ে ওঠে; তার সাথে তাল মিলিয়ে বড়চাচি জিজ্ঞেস করে, কিসের কী বললি?
ফ্লাইং সসার—আজকাল যাকে ইউএফও বলে থাকে কেউ কেউ। ইউএফও—মানে আনআইডেন্টিফয়েড ফ্লাইং অবজেক্ট।
ও! ওইসব আজগুবি ব্যাপার-স্যাপারে বিশ্বাস রাখিস বুঝি?
কী যে বলো না তুমি ভাবি! জানো, দু-হাজার বছর আগেও, সেই খ্রিষ্টপূর্ব চুয়াত্তর সালে মানুষ ফ্লাইং সসার জাতীয় কিছু একটা দেখেছিল?
তুই কি আমাকে পুরাণের খবর শোনাচ্ছিস, নাকি পুরোনো খবর?
বড়চাচির শিবরামীয় মন্তব্য কানে না তুলে লিটনকাকু বলল, হাজার বছর আগের কথা থাক—এই তো সাতচল্লিশের জুন মাসে আমেরিকার ওয়াশিংটনের মাউন্ট রেইনিয়ারে কেনেথ আর্নল্ড নামে একজন পাইলট একটা নয়, দুটো নয়, গুনে গুনে নয়-নয়টা ইউএফওকে বারোশ মাইল স্পিডে উড়ে যেতে দেখেছিল। যে ঘটনার ওপর আধুনিক ইউএফও যুগের শুরু, ওই ঘটনাটাকে তুমি আজগুবি বলবে?
আধুনিক দৃষ্টান্তে রাঁধুনি বড়চাচি তুষ্ট হলো না। কড়াইতে কিছু ধনেগুঁড়ো আর গলায় কিছু উষ্মা ঢেলে বলল, বানোয়াট! বানোয়াটের চূড়ান্ত! কি-না-কি দেখে...।
বড়চাচির গজগজানি একটুও গায়ে মাখল না লিটনকাকু। বরং অবশিষ্ট প্রমাণগুলোর সারসংক্ষেপ দাখিল করতে উঠেপড়ে লাগেল। —শুধু কি কেনেথ আর্নল্ড? চল্লিশ, পঞ্চাশ এমনকি এই ষাটের দশকেও আমেরিকা, জাপান, ইটালি, ব্রিটেন, ব্রাজিল, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া আর রাশিয়ার ভূরি ভূরি মানুষ কয়েক কুড়ি ইউএফও দেখেছে। ওরা সকলে মিলে কি-না-কি দেখেছে বলতে চাও?
লিটনকাকুর সারসংক্ষেপকে অসার মানে বড়চাচি। বলল, ভুল, চোখের ভুল যত্তসব। আমেরিকা আর রাশিয়ার মানুষগুলো একে অপরকে টেক্কা দিতে নতুন ধরনের বেলুন নয়তো নতুন কালের প্লেন-টেন বনিয়ে আকাশে উড়িয়েছে, ওই না দেখে...।
বড়চাচির কথার লেজটুকু মুড়ে দিয়ে লিটনকাকু বলল, এটা ওদের চোখের ভুল নয়—হতে পারে না। আসলে গোটা ব্যাপারটা তুমি মানতেই চাইছ না—এই হচ্ছে আসল ব্যাপার। জানো, সাতান্ন সালের অক্টোবরে ব্রাজিলের কৃষক এন্টনিও ভিলাস বোয়াস আর একষট্টি সালের সেপ্টেম্বরে আমেরিকার নিউ হ্যাম্পশায়ারের বেটি ও বার্নি হিলকে এলিয়েনরা অপহরণ করে নিয়ে গিয়েছিল?
লিটনকাকু সর্বশেষ উদাহরণটাকে অগ্রাহ্য করে বড়চাচি এই প্রথম কড়াই থেকে চোখ তুলে প্রশ্ন করেছে, একটা কথার জবাব দিবি তুই?
বলো!
তোর ইউএফওগুলো কেবল বিলেত-আমেরিকায় ঘোরাফেরা করে কেন রে? আমাদের দেশে একবারও কি আসতে নেই ওদের?
লিটনকাকু কী জবাব দিয়েছিল, তা ন্যাড়ার জবানিতে শোনার আগেই আমি বলে উঠেছি—বড়চাচি ঠিক প্রশ্নটিই করেছিল রে! আমার মনেও এই একই খটকা—ইউএফওরা আমাদের দেশে দ্যাখা দ্যায় না কেন?
দিয়েছিল। একটাই দ্যাখা দিয়েছিল। —সহজ গলায় জানান দিয়ে ন্যাড়া ক্ষীরাইয়ের আরও একটা টুকরো গলায় চালান দ্যায়।
তা-ই নাকি! —আমি চোখ বড় বড় করি। —কবে?
সেই চুয়াত্তরে। তারপর লিটনকাকুর পাল্লায় পড়ে... নে এখন, গল্পটা শোন।
তো বড়চাচির প্রশ্ন শুনে লিটনকাকু বলেছে, দ্যাখা দ্যায় না কে বলল? দ্যাখা দ্যায়, তবে খেয়াল করে না কেউ। চাঁদ খোঁজা ছাড়া অন্য কারণে আকাশের দিকে কেউ বড় একটা তাকায় না যে! একবার একটা ফ্লাইং সসার পেলে হয়, আমি ওতে চেপে মহাশূন্যে ঘুরে বেড়াব। মানুষ তো কেবল চাঁদে গ্যাছে, আমি ওর চাইতেও দূরে—আরও দূরে ঘুরে বেড়াব।
সব বানোয়াট, সব বানোয়াট রে! ওই ইউএফও-ডিউএফও খুঁজে খুঁজে শেষকালে চোখদুটো খোয়াবি—এই বলে রাখছি। —বড়চাচির চোখ আর মন দুটোই ফের কড়াইয়ের ওপর। লিটনকাকুর দূরদর্শিতাকে অবহেলা করার আর কোনো পথ খোলা নেই যেন।
বড়চাচির অবজ্ঞাসূচক মন্তব্যগুলো হজম করতে লিটনকাকুর বয়েই গ্যাছে! ধপাস ধপাস প্রতিবাদী পা ফেলে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে যায় লিটনকাকু।
পরদিনই অবাক কাণ্ড!
লিটনকাকুর চোখে উঠে এল—না, একজোড়া চশমা নয়—একটা বাইনোকুলার।
বড়চাচি প্যাকেট খুলে লিটনকাকুর হাতে বাইনোকুলারটা তুলে দিতে দিতে বলল, নে, এটা রাখ তোর কাছে। দূরের জিনিস দেখতে হলে এটা ভীষণ কাজে লাগে। খালি চোখে ফ্লাইং সসার কি আর চোখে পড়বে রে!
লিটনকাকুর চোখে পানি আসে আসে প্রায়।
তুমি দিলে এটা আমাকে! দিলে তুমি!
হ্যাঁ, দিলাম। গতকাল তোকে অনেক মন্দকথা শুনিয়েছি, তাই মায়া হলো। এখন এই বাইনোকুলার দিয়ে যত খুশি উড়াল চাকির খোঁজ করগে, যা। হদিস পেলে আমাকে জানাস।
চোখের পানি মুছে-টুছে লিটনকাকু তক্ষুনি ফ্লাইং সসারের খোঁজে নেমে পড়ল।
কিন্তু বললেই কি হয়!
আকাশের মেঘ একটু যেন কাছে চলে এল। দু-চারটে চিলের সোনালি ডানাও দ্যাখা গেল বলে মনে হলো। দেখতে দেখতে চোখ ধরে আসে। আকাশ ছেড়ে মাটিতে নজর দ্যায় লিটনকাকু। পাশের বাড়ির আমগাছটাকে কাছ থেকে দ্যাখে, ডালপালার আবডালে কাক-টাকের ঘরদোরও নজরে এল। তারপর ওপাশের বাড়ির কৃষ্ণচূড়া, তার পাশের বাড়ির নারকেল গাছ...। বিকেল নাগাদ আকাশটাকে আরও একবার পর্যবেক্ষণ করে বাগানে চোখ রাখে। কিছু প্রজাপতি। দু-চারটে ফড়িং। টগবগে কিছু ফুল-টুল...। রাতের বেলা বড়সড় চাঁদটাকে দ্যাখাশোনা করার পর আশপাশের তারাগুলো চোখ দুটো দিয়ে তাড়া করে বেড়ালো লিটনকাকু। খুঁজে বেড়ালো বইয়ে পড়া গ্রহ-নক্ষত্রের। গ্রহ-নক্ষত্রের ফাঁক-ফোকর দিয়ে উড়াল দেওয়া ভিনগ্রহের নভোযানকে হন্যে হয়ে খোঁজে; না, পাত্তা মেলে না কোনো নভোযানের। শেষমেশ নিরাশ হয়ে বাগানের ফুলগাছের ঝোপের দিকে নজর দ্যায়। ওখানে জোনাকি জ্বলে।
লিটনকাকু তো হতাশ।
তবে এক্কেবারে হতাশ-হতোদ্যম, তা নয়। লিটনকাকুকে ততদিনে কবিতায় পেয়ে বসেছিল তো! আমগাছ, কৃষ্ণচূড়া, কাকের ঘরবাড়ি, প্রজাপতি, ফড়িং—এগুলো নিয়ে বেশ কখানা কবিতা রচনা করে ফেলেছিল। এক নারকেল গাছ আর জোনাক পোকা নিয়েই তো শ-খানেক পদ্য লিখে ফেলেছিল নাকি!
তো, এমনি করেই চলল ক-দিন। ক-মাস। তারপর বছর কয়েক।
একদিন লিটনকাকু মহা আক্ষেপ ঝেড়ে বড়চাচিকে বলল, ধুস! এই ঠুনকো বাইনোকুলার দিয়ে কিস্যু হবার নয়। একটা টেলিস্কোপ জোগাড় করে দাও না ভাবি!
কেন? এটা দিয়ে কোনো কাজ হচ্ছে না?
কেমন করে হবে? এ্যাদ্দিন ধরে চোখে লাগাচ্ছি, ওই ঘুড়ি-টুড়ি আর চিল-টিল ছাড়া আর কিস্যুর দ্যাখা মেলে না।
লিটনকাকুর হয়ে বড়চাচি বড়কাকুর কাছে একটা টেলিস্কোপের আবদার করতেই বড়কাকু প্রায় তেলে-বেগুনে হয়ে গেল।
বলল, টেলিস্কোপ? টেলিস্কোপ দিয়ে কী হবে?
লিটন আকাশের তারা-টারা দেখবে, তাই।
তারা দেখবে! কেন, ওইদিন না একটা বাইনোকুলার কিনে দিলাম! —বড়কাকু দিনের বেলাতেই চোখে তারা দ্যাখে।
ওইদিন না, বলো বছর পাঁচেক আগে। আমাদের পিকুসোনার তখনো জন্ম হয়নি।
বলো কী! এরই মধ্যে পাঁচ বছর হয়ে গেল!
তা হয়ে গেল বই কি! লিটন এখন আর যুবক নয়; বলতে গেলে আস্ত এক পুরুষ মানুষ। এ মাসেই চাকরিতে ঢুকবে। ওকে কি এই বয়সে বাইনোকুলারে মানায়? তাছাড়া ওই বাইনোকুলার দিয়ে ভালো করে তেমন কিছু দ্যাখ্যাও যায় না। দূরের কথা দূরে থাক, কাছের জিনিসটিও কেমন ঝাপসা লাগে দেখতে—লিটন বলল সেদিন।
হুম! বড়কাকু নিজেই সবকিছু ঝাপসা দেখতে লাগল। —একটা টেলিস্কোপ কিনতে ম্যালা টাকা লাগে—তা জানো? তুমি বরং নোটনকে বলো, ও তো দিনরাত কী সব কলকবজা নিয়ে খুটুর খুটুর করে বেড়ায়—ও-ই লিটনের জন্যে একটা টেলিস্কোপ বানিয়ে দেবে; একবারটি ওকে বলেই দ্যাখো না।
এই নোটনকাকুই...।
আমি ন্যাড়াকে থামিয়ে জিজ্ঞেস করি, তোর কোন নোটনকাকুর কথা বলছিস রে?
নোটনকাকু। মহা বিজ্ঞানী। এখন আমেরিকায় থাকে।
ওই নোটনকাকু, সে কিনা এক বছরে দুই-দুইবার নোবেল প্রাইজ পেয়েছিল—সেই নোটনকাকুর কথা বলছিস তো? —আমি স্মৃতি হাতড়ে বলি।
ঠিক ধরেছিস। —ন্যাড়া আমার পিঠ চাপড়ে দ্যায়। —এই লোটনকাকুই শেষতক লিটনকাকুর জন্যে একটা টেলিস্কোপ বানিয়ে দিল। বলেছিল, এই নে—এটার নাম দিয়েছি নোটোস্কোপ, এটা দিয়ে এস্টারয়েড তো এস্টারয়েড, নেবুলা-টেবুলা পেরিয়ে খোদ অ্যান্ড্রোমেডা গ্যালাক্সিটাকেও দেখতে পাবি।
বলিস কী! এ-কথা বলল? —আমি বিস্ময়ে কাত। পিচ্চি তখনো ক্ষীরাইয়ের দ্বিতীয় চালানের সাথে মোলাকাতে ব্যস্ত।
তবে আর বলছি কী! নোটোস্কোপের খবর পেয়ে আমেরিকার নাসা কর্তৃপক্ষ তো একরকম লাল গালিচা ফেলে নোটনকাকুকে আমেরিকায় নিয়ে অভ্যর্থনা জানাল। ওরা তখন হাবল টেলিস্কোপ বানাতে গিয়ে বেশ হিমশিম খাচ্ছিল কিনা!
ওরেব্বাস! —আমি আরও খানিকটা কাত হয়ে বলি।
এতে অবাক হচ্ছিস কেন? জানিস, নোটোস্কোপের সাথে নোটনকাকু লিটনকাকুকে কী উপহার দিয়েছিল?
কী উপহার দিয়েছিল? —আমি দম বন্ধ করে আরও একটি বিস্ময় ঘোষণার অপেক্ষায় থাকি।
একটা নোটোফোন।
নোটোফোন? এটা আবার কী?
হুম, নোটোফোন! আজকালকার মোবাইল ফোনের আদি পুরুষ। নোটোফোন দিয়ে হাজার হাজার আলোকবর্ষ দূর থেকেও ঘরের ল্যান্ড লাইনের সাথে সংযোগ স্থাপন করে কথাবার্তা বলা যায়।
ন্যাড়ার উপস্থাপনায় আমি বিলকুল কুপোকাত।
আমাকে এই কুপোকাত অবস্থায় রেখে ন্যাড়া বলে চলে, তো নোটোফোনটা পকেটে রেখে আর নোটোস্কোপটা হাতে করে লাফাতে লাফাতে লিটনকাকু উঠোনে।
নোটোস্কোপটা আকাশের দিকে তাক করে চোখ মেলতেই নজরে এল—না, কোনো গ্রহ-উপগ্রহ নয়, বরং কতগুলো দালান-উপদালান অনেকটা গলগ্রহের মতনই নোটোস্কোপের ডগায় ঝুলে থাকতে দ্যাখা গেল। ফ্লাইং সসারের পরিবর্তে ইট-বালু-সিমেন্টের পসারই দেখতে পেল লিটনকাকু।
লিটনকাকু তাজ্জব বনে গেল বলতে গেলে। গেল ক-বছরে দেখতে না দেখতে আম-কাঁঠাল-কৃষ্ণচূড়া পরিবেষ্টিত ঘরদোরগুলো কখন যে নিরেট কংক্রিটের রূপ ধারণ করেছে—লিটনকাকু তার একটুও যদি টের পেত।
বলতে গেলে লিটনকাকু সটান গাঁয়ের বাড়িতে।
গাঁয়ের বাড়িতে এর আগেও লিটনকাকু ঢু মেরেছে বছর দু-বছরে একবারটি করে। কোনোবারই গ্রামটাকে বিশেষ কিছু বলে মনে হয়নি। খাল আছে, শস্যক্ষেত আছে, গাছ-গাছালির বাড়াবাড়ি আছে—এই তো! সে তো সবকটি গাঁয়েই কমবেশি মওজুদ।
তবে এইবেলা গাঁয়ের আম-কাঁঠাল-শিরীষ ইত্যাকার গাছ-টাছ দেখে কেমন যেন ভাব এসে গেল। চটপট দু-দুটো স্মরচিত কবিতা বেরিয়ে এল ঠোঁটের কোনা দিয়ে। তারপর খড়ের গাদা, গরু-ছাগল, পুকুরপাড়, ইশকুল ঘর, গেরস্থবাড়ি—এইসব দেখেটেখে আরও তিনটে কবিতা বেরিয়ে এল। তারপর খালপাড়ে তিনটে ধলাবককে হাঁটাহাঁটি করতে আর তিনটে পানকৌড়িকে পানিতে ডুব দিতে দেখে হুটপুটিয়ে আরও ছ-ছটি ছড়া জাতীয় কিছু রচনা করা গেল।
খালপাড়ে নোটোস্কোপটা পাশে রেখে বসে পড়ে লিটনকাকু। পেছনে আলফাজ মন্ডলের ক্ষীরাইয়ের ক্ষেত। একটা ক্ষীরাই হাতসাফাই করবে কি না ভাবল কতক্ষণ। তক্ষুনি খিদে নেই বলে হাতসাফাইটি মুলতবি করতে হলো।
লিটনকাকু গাঁয়ের চারদিকের শোভা দ্যাখে। দ্যাখে আর মুগ্ধ হয়। মুগ্ধ হয় আর তত্ক্ষণাত্ পদ্য রচনা হয়ে যায়। ওই দূরে, খালের ওপারে—ওইটা মনে হয় কদম আলীর ধানের ক্ষেত। এখন কি বোরো নাকি আমন মৌসুমের শেষ নাকি শুরু, কে জানে! খালপাড়ের বক তিনটে হাঁটতে হাঁটতে বুঝি ক্লান্ত হয়ে পড়েছে—এখন এক পায়ে দাঁড়িয়ে। ওই দূরে তালগাছে কী যেন দ্যাখা যায়—বাবুই পাখির ঘরবাড়ি নাকি? বাবলা গাছের ডালে বসে একটা চিল কী যেন ভাবছে।... পুবের আম-জাম-জামরুল গাছের মাথায় টকাস করে টোকা মেরে পশ্চিমের শিরীষ-বট-কাঁঠাল গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল সূর্যটা—তারপর অন্ধকার।
তারপর আকাশে তারা ফুটল।
তারপর লিটনকাকু নোটোস্কোপ চোখে লাগিয়ে আকাশ চষে বেড়ালো—ফ্লাইং সসারের খোঁজে। নজরে এল উল্কার মতন কিছু, অ্যাস্টারয়েডের মতন কিছু, ধূমকেতুর মতন কিছু, নেবুলার মতন কিছু... কিন্তু ফ্লাইং সসার চোখে পড়ল না একটাও।
তা পড়বে কেমন করে?
আস্ত একটা ফ্লাইং সসার তো তখন লিটনকাকুর সামনেই বিজ্ বিজ্ বিজ্ বিজ্ শব্দ তুলে খালের শ-খানেক ফুট ওপরে থমকে দাঁড়িয়ে!
লিটনকাকু প্রথমটায় ভেবেছিল, খালের ওপর দিয়ে লঞ্চ চলছে বুঝি—তাই অমন বিজ্ বিজ্ বিজ্ বিজ্ শব্দ। পরে দ্যাখে, ওমা! এ যে দেখছি ফ্লাইং সসার একখানা! দেখতে বিশাল এক বর্মি চুরুটের মতন, মধ্যিখানে প্লেনের জানালার মতন গোল গোল খোপ, ওর মধ্য দিয়ে ভেতরের আলো দ্যাখা যাচ্ছে। সসারটির তলা থেকে এক্কেবারে মাঝামাঝি জায়গায় সার্চলাইটের মতন কী যে আলো ঠিকরে বেরুচ্ছে, তা বলে ঠিক বোঝানো যাবে না। আস্ত খালটা আলোর বন্যায় যাকে বলে প্লাবিত।
হঠাত্ ঝাঁপির মতন একটা দরজা ঠেলে বেরিয়ে আসে দু-দুটো ভিনগ্রহের ইয়ে—যাকে সবাই এলিয়েন বলে মানে। বেরিয়েই ঝুপ! এক্কেবারে লিটনকাকুর নাক বরাবর।
এলিয়েনরা দেখতে যেমনটি হয়—ওরা দুটি তেমনটিই দেখতে। পিগমি সাইজের চীনে বাদাম যেন। শরীরটা মনে হয় পেতল নয়তো তামা দিয়ে তৈরি। বুক-পেটের আন্দাজে মাথাটা কিঞ্চিত্ বেঢপ—যেন বিরাটাকারের বেলুন। চোখে পাপড়ি-টাপড়ির কোনো বালাই নেই—কেবল ছোট ছোট দুটো গর্ত, যার ভেতর দিয়ে সবুজ মতন আলো জ্বলে চলেছে। নাকটা ফুটোসর্বস্ব; অবশ্যি ওটা নাক কি না সে নিয়ে তর্ক চলতে পারে। কান দুটো যে কোথায় তা কে জানে।
এক নম্বর এলিয়েন লিটনকাকুকে বিদঘুটে স্বরবর্ণ-ব্যঞ্জনবর্ণ মিলিয়ে—যার মধ্যে বেশিরভাগই ড আর ং—কী যে বলে গেল তা বোঝে কোনজন।
লিটনকাকু ততক্ষণে শিহরিত-টিহরিত হয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। আন্দাজ করল, এলিয়েনটি নির্ঘাত ‘হাউ আর ইউ’-জাতীয় কিছু একটা বলেছে।
প্রথম আলাপে ভিনদেশিদের সাথে ইংরেজিতে কথা বলাটা দস্তুর, তাই লিটনকাকু বলল, হ্যালো! ওয়েলকাম! ওয়েলকাম টু মাই ভিলেজ!
জবাবে দুই নম্বর এলিয়েন বুকের পাশে অনেকগুলো ধাতব বোতাম থেকে একটিকে বাছাই করে, বোতামে চাপ দিয়ে গাঁক গাঁক করে ইংরেজিতে যা বলে গেল, সেটি বুঝতে হলে ইংরেজিতে তিনবার এমএ পাস করতে হবে। বিজ্ঞান-পড়ুয়া লিটনকাকু তাই অপ্রস্তুত হয়ে বলল, ওরে বাবা!
এক নম্বর তখন ফের কিসব বোতাম-টোতাম টিপে বলল, বাঙালি নাকি?
লিটনকাকু ঘাড় নাড়ে।
সঠিক ভাষা-বোতামটি চেপে খালটার দিকে ইশারা করে দুই নম্বর বলল, তোমার এই জলা থেকে কিছু পানি নিতে পারি কি? আমাদের অনেকটা পথ যেতে হবে—জ্বালানির দরকার।
লিটনকাকুর তখন অবাক বিস্ময়ে মূর্ছা যাবার গতিক।
কোনোরকমে ঘাড়খানা হেলিয়ে বলল, হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ... তা নাও না, যত ইচ্ছে নাও।
অমনি ইয়া বড় একটা সাকশন পাইপের মতন কী যেন নভোযানটির একপাশ ফুঁড়ে বেরিয়ে এল। তারপর বিশ্বাস করবি না ছোটন ক-সেকেন্ডের মাথায় ওই সাকশন পাইপ দিয়ে পুরো খালটাকে খালি করে ফেলল! খালের সমস্ত পানি সসারের কোন খোপের ভেতর জমিয়ে রাখল, কে জানে।
ধন্যবাদ! অসংখ্য ধন্যবাদ। এক নম্বর এলিয়েনটি কুর্নিশের মতন অঙ্গভঙ্গি করার চেষ্টা চালায়।
লিটন কাকু চোখ রগড়ে পানিশূন্য খালটার দিকে তাকাল।
বেশ উপকার করলে হে! —দুই নম্বর এলিয়েন কৃতজ্ঞতায় নতজানু হবার কসরত করে।
লিটন কাকুর বাক্যস্ফুট হলো এতক্ষণে। —এমন কী আর উপকার করলাম; খালটা তো আর আমার নিজের পারিবারিক সম্পত্তি নয়।
কিন্তু অনুমতি দিলে তো? কী, দিলে না? তোমার সদয় অনুমতি নিয়েই তো আমাদের জ্বালানির বন্দোবস্তটি করা গেল।
তা অনুমতি দিয়েছি বটে, তবে গাঁয়ের মানুষ এই অনুমতির ব্যাপারটা টের পেলে আমার পেছনে লাগবে ঠিকঠিক।
এক নম্বর এলিয়েন ওর তামা নাকি পেতল দিয়ে বানানো হাতের আঙুল দিয়ে ঘিচিং ঘিচিং করে মাথা চুলকে বলে, কেন, তোমার পেছনে লাগতে যাবে কেন? তোমার অনুমতির কারণে ওদের এমন দুর্গতি হতে যাবে কেন?
তা আর লাগবে না! কী যে বলো! এই খালের ওপর দিয়ে লঞ্চ চলে, নৌকো ভেসে বেড়ায়, খালের পানি দিয়ে কৃষকেরা ফসল ফলায়, খালপাড়ে বউ-ঝিরা বাসন মাজে, মানুষজন নিজেও গোসল করে আর গরু-মহিষদেরও গোসল করায়—আরও কত কী! আচ্ছা খালের মাছগুলোকে তোমরা কী করেছ? পানির সাথে সাথে মাছগুলোকেও শুষে নিয়েছ নাকি? এখন খালে পানি-টানি মাছ-টাছ দেখতে না পেলে মানুষজনের তো খেপে যাবারই কথা!
এবার দুই নম্বর এলিয়েন ঘিচিং ঘিচিং মাথা চুলকে বলল, তবে তো তোমাকে আমরা ভারি এক বিপদে ফেলে দিলাম বলে মনে হচ্ছে।
তিনজনায় মিলে তখন একপ্রস্থ ভাবাভাবির পালা।
শেষে এক নম্বর এলিয়েন বলল, এক কাজ কর না হয়, তুমি এসো আমাদের সাথে। কদিন আকাশ ঘুরবে আমাদের সাথে। তোমাকে দেখতে না পেয়ে তোমার গাঁয়ের মানুষ যেমন তোমার কথা ভুলে যাবে, তেমনি আমাদের গাড়িতে আকাশ ভ্রমণ করিয়ে তোমার প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা যাবে।
সুরেলা প্রস্তাবটা লুফে নিতে একটুও কসুর করল না লিটন কাকু।
চটজলদি ক্ষীরাই ক্ষেত হাতড়ে ক-ডজন ক্ষীরাই পকেটস্থ করে ফ্লাইং সসারে চেপে বসে লিটন কাকু। সসারে উঠেছিল অবশ্যি যানটির পেট থেকে বেরিয়ে আসা ইস্পাতের মই বেয়ে।
তক্ষুনি নোটোফোনে বড়চাচিকে জানাতে ভুলল না—ভাবি, আমি চললাম!
বড়চাচি তখন সারাদিনের কাজকম্ম শেষে রেডিওতে গান শুনতে বসেছে।
বড়চাচি হেসে বলেছে, গ্রামেই তো গেলি আজ সকালে। এখন চললি কোথায় আবার?
ফ্লাইং সসারে করে গ্যালাক্সিগুলো দেখতে বেরুচ্ছি এখন।
বড়চাচি হেসে কয়, তা যাচ্ছিস যখন, যা, বেড়িয়ে আয় যত খুশি—তবে পনেরদিন বাদে তোর চাকরির ইন্টারভিউ আছে—মনে থাকে যেন! হিঃ হিঃ হিঃ!
বড়চাচি যে ওর কথা একটুও বিশ্বাস করেনি, সে কথা ভেবে লিটন কাকু মনে কষ্ট পেল খুব!
ফ্লাইং সসারটি লিটন কাকুকে নিয়ে উড়াল দিতেই নোটোস্কোপটি চোখের সামনে মেলে ধরে। এক নম্বর এলিয়েন যন্ত্রটার দিকে ভাবলেশহীন তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, তোমার হাতে ওটা কী?
নোটোস্কোপ। আমার ভাইয়ের তৈরি।
কী হয় ওটা দিয়ে?
কী হয় না আবার! দূরের জিনিস কাছে ধরা দ্যায়—গ্রহ-উপগ্রহ কাছ থেকে দেখতে সাহায্য করে।
ও! তা-ই বল! তবে দূরের জিনিস কাছ থেকে দেখতে ওটার আবার দরকার কী? চলো আমরা তোমাকে একদম কাছ থেকে যা দেখতে চাও, তা দেখিয়ে নিয়ে আসি।
তা দেখল বটে লিটন কাকু। ক্ষীরাই খেতে খেতে লিটন কাকু দেখল যে কত! ক-সেকেন্ডের মাথায় চাঁদটা পেরিয়ে গেল। আকাশে চক্করকাটা গ্রহগুলোর পাশ কাটিয়ে উল্কা-ধূমকেতু-গ্রহাণুর ভিড় ঠেলে পৌঁছে গেল এক্কেবারে নীহারিকা-রাজ্যে। দু-চারটে তারা জন্মাতে দেখল। তারপর দূর থেকে বিশাল মিল্কিওয়ে ছায়াপথটি মাড়িয়ে অ্যান্ড্রোমিডা ছায়াপথটি দেখবে বলে যেই না আবদারটি করেছে, অমনি দ্যাখে কী—ক্ষীরাই প্রায় শেষ।
লিটন কাকু তখন নতুন আবদারটি পাড়ে। এই রে! ... একবার তোমাদের গাড়িটাকে ঘোরাতে পারবে?
কেন, কী হলো আবার? —দুই নম্বর এলিয়েন জিজ্ঞেস করে।
একটু ঘরে ফিরতে হবে।
এই এক্ষুনি কেন! আরও দু-চারটে গ্যালাক্সি দেখে ঘরে ফেরো না হয়!
না ভাই, ক্ষীরাই শেষ হতে চলেছে—ফিরে আরও ডজন কয়েক ক্ষীরাই নিয়ে আসি। আমি তো ছোঁচার মতন সবকটি ক্ষীরাই একাই সাবাড় করে দিলাম—তোমাদেরও তো একটা দুটো দিতে হয়—না কি বলো?
ঠিক আছে, ফিরে চলো না হয়। আমাদেরও তোমার ওই জিনিসটা খেতে বড্ড ইচ্ছে করছে।
যা বলা সেই কাজ।
ফ্লাইং সসার মোড় ঘুরিয়ে পৃথিবীর পথ ধরে।
এক বিকেলে নভোযানটিকে একটা জায়গায়—মাটি থেকে প্রায় শ-দুই ফুট উঁচুতে স্থির করিয়ে এক নম্বর এলিয়েন বলে—এই নাও, এসে পড়েছি। মই ফেলে দিচ্ছি, ক্ষীরাই-টিরাই পকেট বোঝাই করে নিয়ে এসো।
জানালা দিয়ে নিচের দিকে তাকাতেই লিটন কাকুর চোখ ছানাবড়া। দ্যাখে কী, কোথায় বা খাল, কোথায়ই বা নৌকোর পাল, গরু-ছাগল-মহিষ সব নিপাত্তা, গাছ-গাছালিও উধাও। তার বদলে দালান-কোঠা, দোকানপাট, কলকারখানা-রাস্তাঘাটসর্বস্ব একটা মানুষ গিজগিজে শহর বেহাল দশা নিয়ে পড়ে আছে।
সেকি! এ কোথায় এনে ফেলতে চাইছ আমাকে? —প্রতিবাদী সুরে আপত্তি জানায় লিটন কাকু।
কেন, কী দোষ করলাম আবার? —নির্দোষ গলায় বলে দুই নম্বর এলিয়েনটি। তোমার গাঁয়েই তো ফিরিয়ে এনেছি তোমাকে!
গাঁ না তোমার মাথা! —লিটন কাকু এলিয়েনটির গা-সারা বক্তব্যে নাখোশ হলো খুব। —একবার জানালা দিয়ে দ্যাখোই না।
এলিয়েনদ্বয় ন্যাভিগেশনের যন্ত্রপাতি ফেলে জানালার ধারে এসে নিচে উঁকিঝুঁকি দিতে থাকে।
কী হে, কী দেখতে পাচ্ছ? আমার ফেলে আসা গাঁয়ের কোনো চিহ্ন-টিহ্ন দেখতে পাচ্ছ কী? একটু যেন ভড়কে দ্যায় লিটন কাকু। আমার খালপাড় কই? ক্ষীরাই ক্ষেত কই ওটা? পালতোলা নৌকো, বাঁশঝাড়, আম-কাঁঠালের বন, শিরীষ-বাবলা-অশ্বত্থের জটলা, শস্যক্ষেত, খেলার মাঠ কই ওগুলো? সবকিছু এরই মধ্যে নিশ্চিহ্ন হয়ে গ্যাছে বলতে চাও? কৃষকের ছনের ঘর, গেরস্থের দোচালা বাড়ি, গরুর বাহনে পুকুর, ধলাবক, আরও অনেক কিছু—ওইসব কোথায়, অ্যাঁ?
এলিয়েন দুটো তুমুল ঘিচিং ঘিচিং মাথা চুলকাতে চুলকাতে এ-ওর দিকে তাকায়। ভারি দুশ্চিন্তায় যে পড়ে গ্যাছে দুজনায় তা বোঝা গেল।
এক নম্বর এলিয়েন বলল, তাই তো! জায়গাটা অন্যরকম বলে মনে হচ্ছে যেন!
দুই নম্বর এলিয়েন বলল, ভুল হয়ে গেল না তো? তা-ই বা কেমন করে হয়?
দুজনায় তখন ফের ন্যাভিগেশন কন্ট্রোল প্যানেলের কাছে ফিরে গিয়ে বোতাম টোতাম কিসব টেপাটেপিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
আর টেপাটেপি করে কী হবে? ভুল করেছ—কবুল করে নাও। —টিপ্পনী কাটে লিটন কাকু।
অগত্যা কী আর কথা।
ফ্লাইং সসারটা এলিয়েনদ্বয় এই হেথায় নিয়ে যায়, ওই হোথায় নিয়ে যায়।
লিটন কাকু জানালা দিয়ে উঁকি মেরে এক স্থানে যদি বলে, আমার হাডুডু খেলার মাঠটা কই? তো নতুন এক স্থানে স্থানান্তরিত হবার পর আক্ষেপ ঝাড়ে—পুকুরটাকে তো দেখছি না কোথাও! চুরি হয়ে গ্যাছে বলতে চাও? ... এক জায়গায় যদি বলে, আমাদের সেই পড়োবাড়িটা কই, যেখানে ভূতের আখড়া ছিল? তো আরেক জায়গায় পৌঁছে নয়া ওজরের তাল ঠোকে—তালগাছগুলো দেখছি না কেন, অ্যাঁ?
তো এমনি করেই, বুঝলি কিনা, এমনি করেই এলিয়েনরা লিটন কাকুকে এখানে নিয়ে চলেছে তো ওখানে নিয়ে চলেছে। সবখানেই লিটন কাকুর একই সাড়া—না, ভুল জায়গাতে নাকি লিটন কাকুকে নিয়ে এসেছে ওরা। লিটন কাকু তাই আজ অব্দি ওই ফ্লাইং সসারে আকাশ-পতাল ঘুরে বেড়াচ্ছে, এলিয়েনরাও পরোপকারের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে চলেছে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত।
ন্যাড়ার গল্পগু শেষ হলো।
পিচ্চি পিঁ পিঁ করে বলল, আর ক্ষীরাই? এতদিনে তো ক্ষীরাইগুলো শেষ অইয়া যাওনের কথা, না কি?
তা হবার কথাই বটে। —ন্যাড়া স্বীকার গেল। তবে এ্যাদ্দিনে বোধকরি এলিয়েনদের খাবার-দাবারে লিটন কাকু অভ্যস্ত হয়ে গিয়ে থাকবে।
একটা ব্যাপার বুঝলাম না। —আমি মাথা চুলকে বলি। এলিয়েনরা ফ্লাইং সসার চালনার মতন মাথায় এত বুদ্ধি রাখে, অথচ কিনা লিটন কাকুর গাঁয়ের কোনো হদিস পেল না—এ কেমন কথা?
ন্যাড়া আমার পিঠ চাপড়ে বলে, শাবাশ—মোক্ষম পয়েন্টটাই ধরেছিস। আসলে প্রথমবারে লিটন কাকুর গাঁয়েই ফিরে এসেছিল ওরা।
বলিস কী! এই না বললি শহরের কথা? গাঁ এল কোত্থেকে?
একটুও গাঁইগুঁই না করে ন্যাড়া আমার প্রশ্নের জবাব দ্যায়—কোত্থেকে আবার! ওই গাঁটাই ততদিনে শহর বনে গ্যাছে। তিরিশ বছর তো কম সময় নয়।
তিরিশ বছরের ব্যাপারটি ন্যাড়া গল্পের গোড়াতেই বলেছিল—মনে পড়ল। তবুও জিজ্ঞেস করি কী বলিস! সে কেমন করে?
তুই দেখছি ওই বোকা এলিয়েনদের মতোই অবাক হচ্ছিস।
সে কী রকম?
মানে একটু অঙ্ক করলেই বুঝতে পারবি। ফ্লাইং সসারটা ঘণ্টায় কত আলোকবর্ষ গতিতে ভ্রমণ করেছিল তা একটু হিসাব করে নে। তেরোশ আলোকবর্ষ দূরের অরিয়ন নেবুলা কি দেড় হাজার আলোকবর্ষ দূরের ফ্লেম নেবুলা-ইত্যাদি সব দেখে পৃথিবীতে ওরা যখন ফিরে এসেছে, ততদিনে পৃথিবীটা তিরিশ বার সূর্যটাকে চক্কর দিয়ে সেরেছে। ততদিনে গাঁটাও যে...।
ন্যাড়া আর কিসব বলেছিল, তা কানে গেল না। আমি তখন ভীষণ জটিল এক অঙ্ক নিয়ে ভাবতে বসেছি। ভাবতে ভাবতে ঘরের জানালা দিয়ে আকাশের দিকে দৃকপাত না করেই চোখের সামনে তারা দেখতে থাকি কেবল।