শাহ আবদুল করিমের অপ্রকাশিত সাক্ষাত্কার
‘হিন্দু-মুসলমান এটা বড় নয়; আমরা বাঙালি আমরা মানুষ’
সাক্ষাত্কার নিয়েছেন সুমনকুমার দাশ
প্রকাশ : ০৫ আগস্ট ২০১৩, ১৭:৪৯
শাহ আবদুল করিমকে বাউলগানের সর্বশেষ কিংবদন্তি বলা হয়ে থাকে। তিনি বাংলা লোকগানের অগ্রগণ্য সাধকদের একজন। অসম্ভব জনপ্রিয় ও তত্ত্ববহুল বাউলগানের পাশাপাশি তিনি রচনা করেছেন অজস্র গণসংগীত, যা ‘সর্বহারার দুঃখজয়ের মন্ত্র’ বলে সারস্বতসমাজ কর্তৃক প্রশংসিত হয়েছে। মানুষজন ভালোবেসে তাঁকে ‘বাউলসম্রাট’ অভিধায় অভিষিক্ত করেছেন। সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ধলআশ্রম গ্রামে ১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম ইব্রাহিম আলী, মা নাইওরজান বিবি। ১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে কাগমারী সম্মেলনে কবিয়াল রমেশ শীলের সঙ্গে গণসংগীত পরিবেশনসহ যৌবনে তিনি পেয়েছিলেন মৌলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একান্ত সান্নিধ্য। ২০০১ খ্রিষ্টাব্দে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার লোকসংগীতে অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তাঁকে ‘একুশে পদক’ প্রদান করে। এ ছাড়াও তিনি বহু পদক, সম্মাননা ও সংবর্ধনা পেয়েছেন। তাঁর প্রকাশিত বই : আফতাব সঙ্গীত (১৯৪৮), গণসঙ্গীত (১৯৫৭), কালনীর ঢেউ (১৯৮১), ধলমেলা (১৯৯০), ভাটির চিঠি (১৯৯৮), কালনীর কূলে (২০০১) ও শাহ আবদুল করিম রচনাসমগ্র (২০০৯)। ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দের ১২ সেপ্টেম্বর সিলেটের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় তাঁর বৈচিত্র্যপূর্ণ জীবনের অবসান ঘটে। ২০০৪ থেকে ২০০৬ খ্রিষ্টাব্দের বিভিন্ন সময়ে প্রয়াত এই বাউলের সাক্ষাত্কারটি নেওয়া হয়েছে।
প্রশ্ন : জীবনের অন্তিমে এসে আপনার কি মনে হচ্ছে, বাউল গানে নিজেকে জড়িয়ে ভুল করেছেন?
শাহ আবদুল করিম :না।
প্রশ্ন :কিন্তু এই যে আপনার অর্থসংকট ও পারিবারিক দৈন্য, এরপরও কীভাবে ‘না’ বলছেন?
শা আ ক :আমি তো কোনো কিছু পাওয়ার আশায় গান গাই না। আমার মনে গান চায় তাই গান গাই। গান গাই বলেই তো তুমি আমার কাছে এসেছ, তাই না?
প্রশ্ন : আপনার বাউল হয়ে ওঠার পেছনের শক্তি কী?
শা আ ক :নিঃসন্দেহে কালনী নদী। বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া কালনী নদীর প্রেমে পড়েই আমি বাউল হয়েছি। তাছাড়া হাওরের আফাল (ঢেউ) আমাকে বাউল বানিয়েছে। ভাটির অপরূপ রূপবৈচিত্র্য না থাকলে হয়তো আমি বাউল হতে পারতাম না। কালনী নদীর উত্তাল স্রোত আর হাওর আমাকে প্রেম শিখিয়েছে। তবে এরও আগে একটা ঘটনার কথা বলতেই হয়। আমি তখন খুব ছোটো ছিলাম। আমার এক দাদা সারিন্দা বাজিয়ে গাইতেন—‘ভাবিয়া দেখ তোর মনে/মাটির সারিন্দারে বাজায় কোন জনে’। এ গানটি আমার মনের ভেতরে ঢুকে যায়। এরপর ধীরে ধীরে গানের জগতে ঢুকে পড়ি।
প্রশ্ন : এই গান নিয়ে আপনার ভাবনার কথা বলুন।
শা আ ক :আমি গানপাগল মানুষ। গানই আমার জীবনে সবকিছু। ছোটবেলা থেকে আজ পর্যন্ত গান গেয়ে এসেছি। দেশ-বিদেশের অনেক জায়গায় গান গাইবার জন্য মানুষ আমাকে আমন্ত্রণ করে নিয়ে গেছে। আমি অনেক জায়গায় গেছি। গান গাইবার জন্য মানুষের সম্মান ও ভালোবাসা পেয়েছি।
প্রশ্ন : গান গাইবার সূত্র ধরেই তো আপনার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর পরিচয়?
শা আ ক :হ্যাঁ।
প্রশ্ন : আমরা শুনেছি তাঁর সঙ্গে আপনার মধুর সম্পর্ক ছিল।
শা আ ক :মোটামুটি একটা মেলামেশা ছিল, এই আর কি। উনি আমাকে খুব ভালোবাসতেন। বিভিন্ন সভা-সমাবেশে আমার ডাক পড়ত। আমি ওঁর ডাকে সাড়া দিয়ে মাঝে মাঝে গান-টান গাইতাম। সবার সামনে তিনি বলতেন—‘শেখ মুজিব বেঁচে থাকলে করিম ভাইও বেঁচে থাকবেন।’ আমার গানের ভক্ত ছিলেন তিনি। জনসভায় বক্তব্য শেষ করেই বলতেন—‘করিম ভাই এখন আমাদের গান গেয়ে শোনাবেন।’
প্রশ্ন : মৌলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গেও তো আপনার সুসম্পর্ক ছিল।
শা আ ক :হ্যাঁ। গান গাওয়ার সুবাদে তাঁদের সঙ্গেও পরিচয় এবং সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে।
প্রশ্ন : কোনো প্রচলিত ধারার রাজনীতির সঙ্গে কি আপনি জড়িত ছিলেন?
শা আ ক : আমরা বাউল মানুষ। রাজনীতি করা আমাদের খাটে না। সরাসরি কোনো দলে যোগ না দিয়ে রাজনীতিটাকে ভালোভাবে বোঝা উচিত। মানে প্রত্যেকের সচেতন থাকা উচিত। দলটল নয়, শোষণের বিরুদ্ধে অবস্থান থাকা উচিত।
প্রশ্ন : কিন্তু আমরা তো যতদূর জানি আপনি আওয়ামী লীগের রাজনীতি করতেন।
শা আ ক : না। আমি অমুক দল-তমুক দলের রাজনীতি-টাজনীতি সমর্থন দেই না। আসল কথা হলো মানুষের পক্ষে কথা কওয়া। গরিব, শ্রমিক ও দিনমজুর মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য সারাজীবন কথা বলেছি, গান গেয়েছি। আমি একটা গানে বলেছি—‘শোষণের বিরুদ্ধে আমি শোষিতের গান গাই।/আপোসহীন সংগ্রাম করে বেঁচে থাকতে চাই\’ বিপ্লব আর সংগ্রাম আমার গানের মূল চেতনা। আমার রাজনীতিও তা-ই। যেখানে অন্যায় সেখানে প্রতিবাদ, সেটা গান ও কথায় দুভাবেই করে যাচ্ছি। তবে বিভিন্ন জায়গায় শেখ মুজিবের সঙ্গী হওয়ায় অনেকে ভাবত আমি বুঝি তাঁর দল করি। একবার তো আওয়ামী লীগের নেতারা আমাকে সুনামগঞ্জ আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক করেছিল। গান-টান গাইতাম বলে হয়তো আমাকে এই পদ দিয়েছিল।
প্রশ্ন : কাগমারী সম্মেলনে রমেশ শীলের সঙ্গে এক মঞ্চে গান গেয়েছেন। অনেক বিখ্যাত বাউলসাধকদের সঙ্গে আপনার পরিচয় ছিল। এ সম্পর্কে জানতে চাইছি।
শা আ ক :কাগমারীতে রমেশ শীলের সঙ্গে এক মঞ্চে গান গেয়েছি। তিনি এ সময় আমার গান শোনে প্রশংসা করে উত্সাহও দিয়েছিলেন। এছাড়া উকিল মুন্সী, জালালউদ্দীন খাঁ, আবদুস সাত্তার, বারিক মিয়া, কামাল উদ্দিন, আবেদ আলী, মিরাজ আলী, দুর্বিন শাহ, মজিদ তালুকদার—এঁদের সবার সঙ্গে গান গেয়েছি। আরও অনেকের সঙ্গে গেয়েছি, যাঁদের নাম তাত্ক্ষণিকভাবে মনে পড়ছে না।
প্রশ্ন : লালনের গান সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন।
শা আ ক :লালনের গানকে আমি খুব গুরুত্ব দেই। তাঁর গান ছোটোবেলা থেকেই শুনছি ও গাইছি। তাঁকে আমি একজন বড় দার্শনিক মনে করি। তাঁর গানে তত্ত্ব আছে, দর্শন আছে।
প্রশ্ন : আর রাধারমণ কিংবা হাসন রাজা?
শা আ ক : রাধারমণের গান তো আমাদের ভাটি এলাকার প্রায় সব মানুষই জানে। যাঁরা গান গায় না, তাঁরাও রাধারমণের গান মনের আনন্দে গান। বিয়ে বাড়িতে, কীর্তনে রাধারমণের গান প্রচলন আছে। আর হাসন রাজা ইদানীং মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা পাইছে। আরও আগে উজির মিয়া নামে এক গায়ক হাসন রাজার গান সব সময় গাইতেন, তাঁর নামগন্ধ পর্যন্ত এখন কোনো মানুষ নেয় না। রাধারমণ আর হাসন রাজা—দুজনেই প্রকৃত সাধক।
প্রশ্ন : সৈয়দ শাহনূর, আরকুম শাহ, শীতালং শাহ সম্পর্কে আপনার অভিব্যক্তি কী?
শা আ ক : এঁদেরও কিছু কিছু গান আমি গাইছি। নাগরি লিপিতে লেখা সৈয়দ শাহনূরের একটি গ্রন্থ তো আমার কাছে রয়েছে। এঁরা মহত্ মহাজন ও সাধক।
প্রশ্ন : পাকিস্তান আমলে নাকি স্বাধীনভাবে গান গাইতে না পারার কারণে বেতার ছেড়ে দিয়েছিলেন?
শা আ ক : হ্যাঁ। পাকিস্তান আমলে অনেকবার বেতারের মানুষজন আমারে গান গাওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিল। আমি যাইনি। পরে তাদের চাপাচাপিতে একবার গিয়েছিলাম, বেশ কিছুদিন গান গেয়েছিলামও। কিন্তু সেখানে স্বাধীনভাবে নিজের ইচ্ছেমতো গান গাইতে না পারার কারণে ছেড়েও দিয়েছি। পরে স্বাধীনতার পরে সিলেট বেতারে পুনরায় তালিকাভুক্ত শিল্পী হিসেবে গান গাওয়া শুরু করি। এরপর বেতারের তালিকাভুক্ত গীতিকারও হয়েছি।
প্রশ্ন : আপনি তো বাংলাদেশ টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত শিল্পী ও গীতিকার।
শা আ ক : হ্যাঁ। তবে বেতার ও টেলিভিশন আমাকে খুব টানে না। আমি সরাসরি দর্শক-শ্রোতাদের সামনে গান গাইতে পছন্দ করি। ভর-আসরে হাজারো মানুষের সামনে গান গাওয়ার মজাই আলাদা। আসলে মানুষের কাছাকাছি থাকতেই আমি বেশি পছন্দ করি।
প্রশ্ন : সাধারণত বাউলেরা দেহসাধনা নিয়ে মগ্ন থাকেন। কিন্তু আপনার গানে আমরা দেহসাধনার পাশাপাশি গণমানুষের মুক্তির বিষয়টিও জোরেসোরে উচ্চারিত হতে দেখেছি। এটা কি বাউলের চরিত্রের বৈপরীত্য নয়?
শা আ ক : মানুষ-ই যদি না থাকে তাহলে দেহসাধনা করবে কে? দেহসাধনা করতে তো কেউ বাধা-টাধা দিচ্ছে না, তবে বিপন্ন মানুষের কথাও চিন্তা করতে হবে। গণমানুষের মুক্তি প্রয়োজন। তাই আমি সুযোগ পেলেই মানুষের দুঃখ-দুর্দশার কথা তুলে ধরি।
প্রশ্ন : আপনার সেই বিখ্যাত গান ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’ সম্পর্কে জানতে চাইছি। এটা কোন প্রেক্ষাপটে লেখা?
শা আ ক : আগের দিন আর নাই। আমরা যৌবনে যা দেখেছি, তা আর এখন নাই। মানুষে-মানুষে মেলামেশা উঠে গেছে। আগের মানুষ সহজ-সরল ছিল। আর এখন মানুষ তালাতালি মারামারি কাটাকাটিতে ব্যস্ত। কারে মেরে কে খাবে, এটাই এখন আসল কাজ। আগে হিন্দু-মুসলমানে একটা সুসম্পর্ক ছিল। হিন্দুদের বাড়িতে পূজাটুজা হলে মুসলমানেরা যেত, মুসলমানদের বাড়িতে ঈদটিদ এলে হিন্দুরাও আসত। নিজেদের মধ্যে সমপ্রীতি ছিল। ধর্মটর্ম দিয়া সংসার চালাইত না, ব্যবসা-বাণিজ্য তো দূরের কথা। জাতের কোনো ভেদাভেদ ছিল না। এগুলো হঠাত্ করে হারিয়ে গেছে। এখন এক ধর্মের মানুষ আরেক ধর্মের মানুষকে সহ্য করতে পারে না।
প্রশ্ন : এই যে ধর্ম নিয়ে সারা বিশ্বেই উশৃঙ্খলতা-মারামারি, এটা কীভাবে দেখছেন?
শা আ ক : একটু আগে বললাম না, এটা অধর্ম। ধর্মকে পুঁজি করে কিছু ধান্ধাবাজ ব্যবসা-বাণিজ্য করছে। এদের কাছ থেকে দূরে থাকতে হবে। কিছু মোল্লা-মুন্সি-পুরোহিত ধর্মের দোকান খুলেছে। নিজেদের স্বার্থের জন্য এরা কথায় কথায় বিভেদ সৃষ্টি করে। আর আমাদের বাংলাদেশ তো হিন্দু-মুসলমানের দেশ। মানুষে-মানুষে কত সমপ্রীতি ও বন্ধন ছিল। আজ তা হারিয়ে যাচ্ছে। বড়ই আফসোস হয়। আমি শিষ্যদের বলি, আমরা হিন্দু-মুসলমান এটা বড় নয়; আমরা বাঙালি, আমরা মানুষ। পৃথিবীর সব মানুষ ভাই-ভাই, এই কথাটা মনে রাখতে পারলে আর কোনো ঝগড়া-বিবাদ থাকত না বোধহয়।
প্রশ্ন : আপনার গ্রামের উগ্রপন্থি কট্টর মৌলবাদী গোষ্ঠীরা নাকি আপনার স্ত্রী সরলা এবং প্রিয় শিষ্য আকবরের জানাজা পরাতে রাজি হয়নি?
শা আ ক : ঠিক। আমার স্ত্রী সরলা মারা যাওয়ার পর গ্রামের ইমাম সাহেব বললেন—‘বাউলের স্ত্রীর জানাজা পড়ানোর দরকার নাই।’ আবার আকবর মারা যাওয়ার পর মসজিদের মাইকে তার মৃত্যুর সংবাদ প্রচার করেনি। তার দোষ, সে আমার সঙ্গে থেকে গানটান গেয়ে নাকি বেশরা ও ইসলামবিরোধী কাজ করেছে। তাই সে আমার মতোই কাফের হয়ে গেছে। বেতনভোগী ইমামের কথা শুনে আর রাগে-দুঃখে নিজেই আমার বাড়িতে কবর খুঁড়েছি। আকবরের জানাজা পড়িয়ে দাফন করেছি। গ্রামের কেউ কেউ আইছিল, কেউ কেউ আয়ে নাই।
প্রশ্ন : অনেক আগেও সেই একই ধরনের ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর শিকার হয়ে আপনি বাড়ি ছেড়েছিলেন। সে সময়ের কথা কী মনে আছে?
শা আ ক :মনে আছে কিছু কিছু। ঈদের নামাজে গেছি। এক মুরুব্বি আমাকে দেখেই বললেন, ‘করিম ইসলাম ধ্বংস কইরা ফালাইতাছে। গানবাজনা ইসলামে হারাম, এরপরও সে গান গাইতাছে। এইটার বিহিত করা দরকার’। তিনি ইমাম সাহেবকে সামনে রেখে সব মানুষের সামনে তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘গান গাওয়া ইসলামে হালাল কি না?’ ইমাম সাহেব বললেন—‘গানের সুরে যদি আল্লাহকেও ডাকে, তাহলেও গুনা হবে’। ব্যাস, আর যায় কই? ওই মুরুব্বি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন—গান ছাড়ব কি না? আমি বললাম—সেটা কখনোই আমি পারব না। উত্তর শুনে ওই মুরুব্বি মানুষটি রেগে গেলেন। তিনি বললেন, ‘এত স্পর্ধা, ইমাম সাহেব ও মুরুব্বিদের মুখের ওপর কথা। সেটা মেনে নেওয়া যায় না।’ এরপর আমি বললাম, ‘এখন বললাম গান ছেড়ে দেব, পরে ছাড়লাম না। তাই এ ধরনের মিথ্যা কথা আমি বলতে পারব না। নিজে যা বিশ্বাস করি, তা-ই বলেছি। আপনার যদি এ কারণে আমাকে গ্রামে জায়গাও না দেন, তাতেও আমি রাজি। আমি পাশের দাসগ্রাম ভাঙাডহরে চলে যাব। আমার বিশ্বাস—তারা আমারে জায়গা দিব।’ এমন সময় আরেক মুরুব্বি আমার পক্ষ নিয়ে উঠে বললেন, ‘হিন্দু-মুসলমানের দেশ। কে না বাউলা-ঘাটু গান গাইছি। আর এখন ঈদের নামাজে আইসা এর বিচার বইছে। এ বিচার তো পরেও করা যায়।’ এরপর আরও কয়েকজন একই রকম কথা বললে শেষে সবাই চুপ হয়ে যান। পরে নামাজ শেষে বাড়ি ফিরি। মনটা খারাপ হয়ে যায়। এরপর থেকে প্রায় প্রতি শুক্রবারে জুম্মার নামাজের আগে-পরে মসজিদে মুসল্লিরা আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে—গান-বাজনা করে আমি নাকি বেশরা কাজ করছি। তখন গ্রামের আশপাশে সারারাত ধরে ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছিল। সেই ওয়াজে দেশের বিশিষ্ট ওয়াজিরা এসে আল্লা-রসুলের নাম না-নিয়ে আমার শ্রাদ্ধ করার কাজে যোগ দিয়েছিল। রাতভর অকথ্য ভাষায় আমাকে গালিগালাজ করেছিল। শেষে একসময় পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে গ্রাম ছাড়ি।
প্রশ্ন : পরে আবার বাড়ি ফিরলেন কীভাবে?
শা আ ক : হেমন্তে বাড়ি ছেড়েছিলাম, পরের বর্ষায়ই গ্রামে প্রতিযোগিতামূলক বাউল গানের আসর বসে। সে আসরে আমাদের গ্রামের বাউলদের ভিন গ্রামের বাউলেরা হারিয়ে দিচ্ছিলেন। এ অবস্থায় গ্রামের সবাই মিলে আমাকে আবার গ্রামে ফিরিয়ে নিয়ে এসে ওই বাউলদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় খাড়া করায়। আমরা জিতেও যাই। পরে গ্রামবাসীরাই আমাকে গ্রামে থাকার জন্য জোরাজুরি করে। এরপর গ্রামেই থেকে যাই।
প্রশ্ন : আর ঈশ্বর কিংবা সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে আপনার ভাবনা কী?
মানুষের মাঝেই ঈশ্বর বিরাজমান। মানুষের সেবা করা মানে ঈশ্বরের সেবা করা। এটাই সত্যি, এটাই বাস্তব কথা। কথায় আছে না, ‘জীবে প্রেম করে যেইজন, সেইজন সেবিছে ঈশ্বর’। আমি একটি গানে লিখেছি—‘তন্ত্রমন্ত্র করে দেখি তার ভিতরে তুমি নাই/শাস্ত্রগ্রন্থ পড়ি যত আরো দূরে সরে যাই/কোন সাগরে খেলতেছ লাই/ভাবতেছি তাই অন্তরে।’ তন্ত্রমন্ত্র না পড়ে মানুষের সেবা করলেই স্রষ্টার সন্ধান পাওয়া যায়। তাই আমি বলেছি—‘মসজিদ-মন্দির-গির্জাঘরে/কেউ খোঁজে জঙ্গল-পাহাড়ে/আবদুল করিম বিশ্বাস করে/আমাতে তুমি রয়েছ\’ মানুষের ভালোবাসা পেলেই আমি মনে করি স্রষ্টার ভালোবাসা পাওয়া যায়। কারণ মানুষ ছাড়া স্রষ্টা নয়। ধর্মে আছে—‘আমি ছিলাম গুপ্ত ভাণ্ডার, আমাকে প্রকাশ করতেই এই সৃষ্টি।’ তো সৃষ্টিটাই তাঁর রূপ। মানুষ যদি না থাকে তাহলে স্রষ্টা ডাকবে কে?
প্রশ্ন : আপনার দেওয়া একটি সাক্ষাত্কার পড়েছিলাম। সেখানে আপনি এক প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, ‘মন্ত্রপড়া ধর্ম নয়, কর্মকেই ধর্ম মনে করি। লাখ লাখ টাকা খরচ করে হজ পালনের চেয়ে এই টাকাগুলো দিয়ে দেশের দুঃখী-দরিদ্র মানুষের সেবা করাটাকে অনেক বড় কাজ মনে করি। কতিপয় হীন মোল্লা-পুরুত আমাদের ভাইয়ে-ভাইয়ে বিভাজন নিয়ে এসেছে।’
শা আ ক : হ্যাঁ, বলেছিলাম বোধহয়। আমি এখনো সেটা বিশ্বাস করি। একটা গান আছে না? ‘শতবর্ণের গাভী রে ভাই, একই বর্ণের দুধ, ত্রিজগত্ ভ্রমিয়া দেখি একই মায়ের পুত’। তুমি হিন্দু হলে পূজা করো, মুসলমান হলে নামাজ পড়ো, এতে তো কেউ বাধা দিচ্ছে না। তাহলে এসব নিয়ে দ্বন্দ্ব কেন? আসলে স্বার্থের কারণেই ধর্ম নিয়ে দলাদলি-মারামারি হচ্ছে।
প্রশ্ন : একই সাক্ষাত্কারে আরও কিছু কথা আমার মনে ধরেছিল। একেবারে পল্লি একটি অঞ্চলে বসে আপনি এ ধরনের চেতনা লালন করতে পারেন, সেটি অবিশ্বাস্য লাগে।
শা আ ক : তুমি কোনটির কথা বলছো?
প্রশ্ন : ওই যে আপনি বলেছিলেন—‘ঈশ্বরকে আমি মনে করি একটা পেঁয়াজ, খোসা ছিলতে গেলে নিরন্তর তা ছিলা যায় এবং হঠাত্ এক সময় দেখি তা শূন্য হয়ে গেছে। আমি ঈশ্বরকে এক বিশাল শক্তি হিসাবে গণ্য করি, ব্যক্তি হিসাবে নয়। ব্যক্তি কখনো একই সময়ে বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন রূপে অবস্থান করতে পারে না; শক্তি তা পারে। বৈদ্যুতিক শক্তির কথা ধরুন, একই সঙ্গে কোথাও বা ফ্যান ঘুরাচ্ছে, কোথাও বাতি জ্বলাচ্ছে, কোথাও ইন্ডাষ্ট্রি চালাচ্ছে...। আল্লা নিজেই যখন কর্তা, তার তাহলে এত কেরানি রাখার কী দরকার আমি বুঝে উঠতে পারিনি।’ এ কথা নিয়ে বেশ আলোচনা-সমালোচনা হয়েছিল।
শা আ ক : আমি মিথ্যে কথা তো বলিনি। এটাই সত্য। এটাই আমি মনে করি। নিজে যেটা বিশ্বাস করি, হূদয়ে লালন করি, ধারণ করি, সেটাই আমি অকপটে বলি। কারো হুমকি-ধামকি কিংবা সমালোচনার ধার ধারি না। এক গান লিখেছিলাম—‘পাই না তোমার ঠিক-ঠিকানা/ নাম শুনে হলেম পাগল/ যার-তার ভাবে সবাই বলে/ বুঝি না আসল-নকল’। তবে এখন সে প্রসঙ্গে যাচ্ছি না। এটা যার যার বিশ্বাস। তুমি আল্লা-ভগবান-গড-ঈশ্বর যা-ই বলো না কেন, সবাই একটা শক্তি হিসাবে কাজ করছে। এর বাইরে কিন্তু নয়।
প্রশ্ন : এটা ছাড়াও দেশের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন প্রসঙ্গ নিয়েও কিন্তু বেশ বিতর্ক উঠেছিল। অনেকে মনে করেন—বোধহয় এ মন্তব্যের কারণেই হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে আপনার সম্পর্কের অবনতি হয়েছে।
শা আ ক : হুমায়ূন সাহেব অত্যন্ত জ্ঞানী-গুণী মানুষ। আমি তাঁকে শ্রদ্ধাও করি। আমাকেও তিনি শ্রদ্ধা করেন, ভালোবাসেন। একবার তিনি টিভিতে একটি অনুষ্ঠান বানানোর জন্য একজন লোককে আমার কাছে পাঠালেন। প্রচার আমি কোনোসময়ই চাইনি, তখনো তা-ই করেছিলাম। কিন্তু লোকটির চাপাচাপিতে ঢাকা গেলাম। হুমায়ূন সাহেব আমার সাক্ষাত্কার নেওয়ালেন, গান গাওয়ালেন। আমি ফিরে আসার সময় উনি সৌজন্যসাক্ষাত্টুকু পর্যন্ত করলেন না, গাড়ির ড্রাইভারকে দিয়ে কিছু টাকা পাঠিয়ে দিলেন। আমার হাসি পেল। এই টাকার জন্য কি আমি এতদূর ঢাকা ছুটে গিয়েছিলাম? আমি হাওরের বনে-বাদাড়ে বড় হয়েছি, মনটা সে রকমই বড়। টাকা আমার কাছে কিছুই না। এই করিম টাকার ধান্ধা করলে এতদিনে অনেক বড়লোক হতে পারত! কই, কখনো তো টাকার পেছনে ছুটিনি। এ ঘটনাটি আমাকে খুব পীড়া দেয়। পরে অনুষ্ঠানটি প্রচারের তারিখও তিনি আমাকে জানাননি। সে ঘটনাই আমি সাক্ষাত্কারে বলেছিলাম। পরে আর কখনো হুমায়ূন আহমদের কাছে যাইনি। সত্য কথা বলার কারণে যদি সম্পর্কের অবনতি হয়ে থাকে—তাতে তো আমার আর কিছুই করার নাই।
প্রশ্ন : কিন্তু আপনি নাকি হুমায়ূন আহমেদকে ‘মরা গরুর হাড্ডির কারবারি’ বলেছিলেন?
শা আ ক :এটা আসলে ঘটনার প্রেক্ষাপটে বলা একটি কথা। মূলত মানুষের কাছে মানুষের মূল্যটাই আসল—সেটাই বলেছি। আর আমি জানি—যে করিম এখন না খেয়ে দিনের পর দিন কাটাচ্ছে, একদিন সে করিমকে নিয়েই ব্যবসা হবে, বাণিজ্য হবে। মরা করিমের হাড্ডি নিয়ে টানাটানি হবে, দর কষাকষি হবে। বৈশাখ মাসে আমার চোখের সামনে গ্রামেরই অনেক গৃহস্থ পরিবার পাঁচশ-ছয়শ মণ ধান তোলেন, কিন্তু আমার বাড়িতে পাঁচ বা ছয় মণ ধান ওঠে না। যদি নিজের স্বার্থ নিয়ে ভাবতাম তাহলে এতদিনে পাঁচতলা দালান তৈরি করতে পারতাম। কিন্তু টাকার লোভে তো চরিত্র আর মনুষ্যত্ব বিকিয়ে দেইনি, এটাই আমার তৃপ্তি। আর কিছু নয়। এ করিম সবসময় মানুষের কথা বলতে চেয়েছে। মানুষের ভালোবাসা নিয়েই আমি এখন মরতে চাই।
প্রশ্ন : এখন একটু ভিন্ন বিষয়। সমপ্রতি আপনার বিচ্ছেদ-গানগুলো তরুণদের মাঝে খুব জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। এ ব্যাপারে আপনার অনুভূতি কী?
শা আ ক : মানুষ আমার গান গাচ্ছে, শুনছে—এটা আমার সৌভাগ্য। আমি সারাজীবন মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি। আর মানুষের ভালোবাসা নিয়েই মরতে চাই।
প্রশ্ন : আপনি তো একসময় নিমাই সন্ন্যাস ও কীর্তন গাইতেন এবং যাত্রাগানে অভিনয়ও করেছেন।
শা আ ক : এইগুলা টুকটাক। শুরুর দিকে যাত্রাগানে বিবেক-এর ভূমিকায় অভিনয় করছি, গান গাইছি। এমন সময়ই কিছু কিছু পালা ও কীর্তন গাইছি।
প্রশ্ন : মালজোড়া গানও তো করতেন একসময়?
শা আ ক : হ্যাঁ। মালজোড়া গানটা খুব বেশি গাইছি। প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক এই গানটা নেত্রকোনার রশিদ উদ্দিন সাহেবই প্রথম শুরু করেছিলেন। পরে ভাটি এলাকায় এ গানের ধারাটা বেশ জনপ্রিয় হয়। নেত্রকোনার সাত্তার মিয়া ও আমি অনেক জায়গায় মালজোড়া গাইছি রাতের পর রাত। দিরাইয়ের ভাটিপাড়ার কামাল উদ্দিনও আমার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এ গান গাইছে। পরে আরও অনেকেই এ গানের ধারায় নেমেছিলেন।
প্রশ্ন : ইদানীং সুর বিকৃত করে অনেক শিল্পী আপনার গান গাচ্ছেন। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
শা আ ক : ঠিক সুরে গাইলে ভালো। তবে কথার বিকৃতি ঘটানো অন্যায়। কারণ একজন মহাজন অনেক ভেবে-চিন্তে তাঁর গানের পদ রচনা করেন। গাওয়ার সময় গানের কয়েক পদ ছেড়ে দিলে বা ধরো ওলটা-পালটা করে গাইলে তাঁর গানের ঠিক অর্থ বুঝতে সমস্যা হয়। এদিকেও নজর রাখতে হবে। তাই আমার মতে—গান গাইতে হলে ঠিক ঠিক মতো গাওয়া উচিত। গানগুলো বিকৃত না করে রাগিনী ঠিক রেখে গাওয়া উচিত। এছাড়া এখন তো বিদেশি গানে আমাদের যুবসমাজ পাগল হয়ে যাচ্ছে। বুঝে না-বুঝে গানের মধ্যে লাফালাফি করে। আমাদের নিজেদের গানে ফিরে আসতে হবে। শুদ্ধভাবে চলতে হবে, শুদ্ধভাবে গান গাইতে হবে।
প্রশ্ন : ইদানীং একটি কথা সবাই বলেন যে, বিদেশি সংস্কৃতির আগ্রাসনে বাংলা গান হারিয়ে যাচ্ছে।
শা আ ক : তা ঠিক। বিদেশি গানের দিকে দেশের যুবসমাজ ঝুঁকে পড়ছে। সব জায়গায় শুধু হিন্দি গান। পল্লিগান তো মানুষ এখন শোনেই না। ড্রয়িংরুমে বসে ‘ডিসকো মিউজিক’ শোনেন। আমি জানি না—আর কিছুদিন পরে বাউলগানের অবস্থা কই গিয়ে দাঁড়াবে!
প্রশ্ন : বেশ আগে বোধহয় আপনার একটি গান চলচ্চিত্রে ব্যবহার হয়েছিল।
শা আ ক : হ্যাঁ। সিলেটের বান্না [জামালউদ্দিন হাসান বান্না] বেদ্বীন চলচ্চিত্রে ‘এই দুনিয়া মায়া জালে বান্ধা...’ গানটি গাইছিল। সে আমার আরও দু-চারটা গান গাইছে। তার গানের গলা ভালো।
প্রশ্ন : আর আপনার শিষ্যদের মধ্যে?
শা আ ক : তকবুল, রোহী, রহমান, রণেশ, নান্নু, সুনন্দরা ভালোই গায়।
প্রশ্ন : শুনেছি আপনার ছেলেও নাকি ভালো গান লিখে?
শা আ ক : বাবুল [শাহ নূরজালাল] কিছু কিছু গান লিখছে। তবে তারে কইছি আমার মতো যেন সে এই রাস্তায় না এগোয়। কারণ আগের দিন আর নাই। সেই সমাজও আর নাই। সেই যুগও আর নাই। সেই ভক্তকুলও আর নাই। সামনে যে দিন আসতাছে গানটান গাইয়া টিকা যাইত না। আগে গানের আসরের কথা শুনলে মানুষ দশ-বিশ মাইল পায়ে হেঁটে গান শুনতে চলে আসত। আর এখন? এটা কী ভাবা সম্ভব? তাই বাবুলকে বলছি—এই রাস্তায় আইও না। তুমি নিজের মতো করে বাড়িতে বসে গান গাও, শিখো আর বোঝো।
প্রশ্ন : সরলা, আপনার স্ত্রী, তাঁর কথা কি মনে হয়?
শা আ ক : আজকের করিম কখনোই করিম হইত না, যদি সরলার মতো বউ না-পাইতাম। সরলা আমার শত অত্যাচার মুখ বুঝে সহ্য করছে, আমার গানের পথে কখনো বাধা দেয় নাই। বরং কইছে—‘আফনে গান ভালা পাইন, তাই আমিও গান ভালা পাই’। গাঁও-গেরামে গিয়া গান গাইতাম, মাসের পর মাস আমি বাড়িছাড়া। ঘরে চাউল-ডাইল আছে কি না, কুনুদিন খবর নেই নাই। কিন্তু সরলার কোনো অভিযোগ-অনুযোগ নাই। সব মাথা পাইতা নিছে। এই যে মানুষ আমারে চিনে, সরলা এই ছাড় না দিলে আমি তো কবেই শেষ হইয়া যাইতাম! অথচ সেই সরলা বিনা চিকিত্সায় মারা গেল। টাকার অভাবে আমি সরলার চিকিত্সাটুকু পর্যন্ত করাতে পারলাম না। এ দুঃখ আমাকে আমৃত্যু তাড়াবে।
প্রশ্ন : আপনি একাধারে গান লিখেছেন এবং গেয়েছেন। অন্যদিকে এসব গানের সংকলনও বের করেছেন। সাধারণত গান প্রকাশের ক্ষেত্রে এসব ঘরনার লোকদের অনীহা থাকে। কিন্তু আপনি ভিন্ন কেন?
শা আ ক : আমি চাই আমার গানগুলো মানুষ পড়ুক, জানুক। আমি কী বলতে চাই সবাই সেটা বুঝুক। তাই আমি বই বের করার জন্য সবসময় আগ্রহী ছিলাম।
প্রশ্ন : এ পর্যন্ত কয়টি বই বের হয়েছে? কিংবা কোনো বইয়ের পাণ্ডুলিপি কি এখনো প্রকাশের বাকি রয়েছে?
শা আ ক :এ পর্যন্ত ছয়টি বই বের হয়েছে। এগুলো হচ্ছে আফতাব সঙ্গীত, গণসঙ্গীত, কালনীর ঢেউ, ভাটির চিঠি, ধলমেলা ও কালনীর কূলে। সব বই আমার সংগ্রহে থাকলেও আফতাব সঙ্গীত বইটি নেই। এ বইটিতে ৪০টি গান ছিল। নিজের নয় বিঘা জমি বেচে কালনীর ঢেউ বইটা বের করেছিলাম।
প্রশ্ন : আপনি তো রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘একুশে পদক’ ছাড়াও অসংখ্য পুরস্কার-সম্মাননা পেয়েছেন। এ নিয়ে আপনার অনুভূতি কী?
শা আ ক : পদকের আশায় কোনোদিন গান গাইনি। গান গাইছি মনের টানে। মানুষ ভালো পাইয়া সম্মান দিছে। তবে এইসবের প্রতি আমার বিন্দুমাত্রও আগ্রহ নাই। এমনও তো ঘটনা আছে—পদক আনতে শহরে গেছি, আইবার সময় পকেটে টাকা নাই। এই পদক-টদকের কোনো দাম নাই। মানুষ আমারে ভালা পায়, সেইটাই আসল কথা।
প্রশ্ন : আপনার দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে পড়েছিলাম—‘এত সংবর্ধনা, সম্মান দিয়ে আমার কী হবে? সংবর্ধনা বিক্রি করে দিরাই বাজারে এক সের চালও কেনা যায় না। পেটে যদি ভাত না থাকে করিম মেডেল গলায় দিয়ে কী করবে?’
শা আ ক : কী কইছিলাম মনে নাই। এইটা আমার ক্ষোভের কথা হইতে পারে। তবে কথাটা তো ঠিক। নাকি মিথ্য বললাম?
প্রশ্ন : মিথ্যা হবে কেন? আপনি তো ঠিকই বলেছেন। এখন আপনার কোনো সুখের স্মৃতি শুনতে চাচ্ছি।
শা আ ক : চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের সময় আবদুস সামাদ আজাদের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়ে এক জনসভায় গেছি। তখন মানুষজন বলেন—‘বক্তৃতার দরকার নাই, করিম ভাইয়ের গান শুনব। ভোট আমরা দিমু নে।’ সুরঞ্জিত সেনগুপ্তর জনসভায় গেছি, একই অবস্থা হইছে। গানের উসিলায়ই আমি মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি। মানুষ আমারে এইভাবে ভালা পাইছে, এইটাই সুখ, এইখানেই আমার শান্তি।
প্রশ্ন : সবশেষে আপনার কোনো অপ্রাপ্তি কিংবা স্বপ্ন সম্পর্কে জানতে চাই।
শা আ ক : আমার জীবনে কোনো অপ্রাপ্তি নেই। এ জীবনে অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি। এরপর কোনো অপ্রাপ্তি থাকতে পারে না। বাংলাদেশ একসময় সত্যিকারের অসামপ্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ দেশ হিসেবে সারা বিশ্বে পরিচিতি পাবে—এটাই আমার স্বপ্ন।