চিত্রকলা
সব রাস্তা মিলেমিশে
প্রকাশ : ০৫ আগস্ট ২০১৩, ১৭:৫৫
শিল্পী বিজন চৌধুরী। তিনি আমাদের আর্ট কলেজের (বর্তমানে চারুকলা) দ্বিতীয় ব্যাচের ছাত্র। শিল্পী হিসেবে শুধু যে পশ্চিমবঙ্গেই তিনি খ্যাতিমান ছিলেন তা নয়; ভারতবর্ষেরও তিনি একজন অগ্রগণ্য শিল্পী। শিল্পের নানান দিক নিয়ে চর্চা ও নিরন্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। তাঁর ব্যক্তিচেতনা, শিল্পীসত্তা, সমাজচেতনা, সংস্কৃতিবোধ এবং রাজনৈতিক দর্শন—এ সবই গড়ে উঠেছিল অনেক কিছুর প্রভাবে। তাঁর চারপাশের পরিমণ্ডলটিই এমন ছিল যে, যা তাঁর উপলব্ধির জগতকে নাড়া দিয়েছে নিয়তই। যেমনটি তিনি নিজে বলেছেন, ‘বড় হয়েছি বেড়ে উঠেছি একটি সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল ও আয়োজনের ভেতর দিয়ে। পারিবারিক সূত্রেই গান-বাজনা, ছবি আঁকা, নাটকের সঙ্গে আমার পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা। আমার পিতা কুঞ্জবিহারী চৌধুরী, তিনি নিজে নাটক লিখতেন এবং অভিনয় করতেন। এক অবাক করা ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন তিনি। তাঁর পরিকল্পনায় সেই সময় থিয়েটারের মঞ্চ তৈরি করা হতো। তিনি নিজ হাতে আঁকতেন থিয়েটারের বিশাল বিশাল ব্যাকড্রপ। তাতে ফুটে উঠত অর্পূবসব সব দৃশ্যাবলি... তাতে নাটকটি আরও বাঙ্ময় হয়ে উঠত ।’
‘আরেকটি বিষয় আমায় আকর্ষণ করত, সেটি হচ্ছে—কলকাতায় আমাদের পাড়ায় কোনো ঘর কিছুদিনের জন্য ভাড়া নিয়ে সেখানে বড় বড় কাপড়ের ওপর সিনসিনারি আঁকার ঘটনা। কিছু সাগরেদ সঙ্গী করে বড় বড় তুলি আর জুতার বুরুশ দিয়ে এরকম বড় ছবি আঁকা হতো। সেই বয়সে আমি খুব মনোযোগ দিয়ে এগুলো দেখতাম। ছোটবেলার দেখা অনেক বিষয়ই স্বপ্ন স্বপ্ন মনে হয়, একটা ঘোরলাগা বিস্ময়ের অনুভূতি হয়; তেমনি এক বিস্ময় নিয়ে আমি আমার বাবকে দেখতাম।’
‘তো আমার বেড়ে ওঠার পেছনে এগুলো কাজ করেছে। আমার চারপাশের সাংস্কৃতিক আবহটাই ছিল এরকমের। ছবি আঁকা ছাড়াও সংগীতের সঙ্গেও আমার সখ্য ছিল পারিবারিক সূত্রে। বাড়িতে গান-বাজনার আসর বসত। খেয়াল, ঠুংরি, টপ্পা, আর বাংলা রাগপ্রধান গান গাওয়া হতো। বাবা নিজেও গাইতেন। ভোরে বাবাকে বিছানায় গুন গুন করে ভোরের কোনো রাগ ভাজতে দেখতাম। কী অসাধারণ দৃশ্য ভাবা যায়! মনে পড়লে চোখ ভিজে যায়।’
সংগীতকে ভালোবেসে পরবর্তীকালে সংগীতের অনুশীলন করেছেন বিজন চৌধুরী। প্রথম যৌবনে ঢাকায় থাকার সময়ে সেতার বাজনায় তালিমও নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ছবি আঁকার জীবনকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে নিয়মিত গানের অনুশীলন প্রায় বাদ হয়ে গেছে। বিজন চৌধুরীর মতে, শিল্পকলার প্রতিটি ক্ষেত্রই চায় যে, শিল্পী তার সকল প্রতিভা, সময় ও জীবনটাই দান করুক চর্চা ও অনুশীলনে, তাকে আরও সমৃদ্ধ করুক।
পরবর্তীকালে তার ছবিতে বিভিন্ন পর্বে সংগীত কখনো বিষয় হয়ে কখনো বা তার কিছু অনুষঙ্গ নিয়ে ক্যানভাসে উপস্থিত হয়েছে।
বিজন চৌধুরী ঢাকা এসেছেন বারবার। কখনো ছবি আঁকার কর্মশালায় অংশ নিতে, কখনো ভালোবাসার টানে, মাটির টানে, নাড়ির টানে। ঢাকা তাঁর কাছে প্রথম যৌবনের উত্তাল দিনরাত্রি যাপনের অসংখ্যস্মৃতির শহর। তাঁর নিজের পিতৃভুমিও ফরিদপুরে।
শিল্পী বিজন চৌধুরীর সঙ্গে আমার প্রথম আলাপচারিতা ২০০২ সালে। উনি ঢাকা এসে শিল্পী জামাল আহমেদের আথিতেয়তা গ্রহণ করেছেন জেনে আমি উনার সঙ্গে দেখা করতে আগ্রহ প্রকাশ করি। বিজন চৌধুরী তত্ক্ষণাত্ রাজি হন। আমরা একসঙ্গে পুরান ঢাকা চষে বেড়িয়েছি—শাঁখারী বাজার, উয়ারী, কাপ্তান বাজার, সদরঘাট, বিউটি বোর্ডিং... সর্বত্র তিনি স্মৃতি হাতড়ে বেরিয়েছেন। এরপরও অন্তত তিন-চারবার কলকাতা ও বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত ছবি আঁকার কর্মশালায় আমরা একত্রে অংশ নিয়েছি। নানাসময়ের কথোপকথনের সূত্র ধরে এই লেখাটি তৈরি করেছি। এটি তাঁর সাক্ষাত্কার নয়; স্মৃতিকথন। বিশেষ করে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের দিনগুলোর কথা স্মরণ করেছেন তিনি—
‘বাংলাদেশে আমি থেকেছি প্রায় দশ বছর। ১৯৫০ থেকে ১৯৫৯-এর মধ্যভাগ পর্যন্ত। এই সময় ছবি আঁকার জগত্ ছাড়াও অন্য নানান দিকে নিজেকে ছড়িয়ে দিয়েছিলাম। লেখক, কবি, সাহিত্যিক ও চিত্রশিল্পীদের আনন্দ-বেদনার সাথি হয়ে থাকতে চেয়েছি সকলসময়। তাই আত্মনিয়ন্ত্রণের ও অধিকার অর্জনের দাবিতে ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছিলাম। ওই সময় সকলে একসঙ্গে পায়ে পা মিলিয়ে চলেছি। সকলে সকলের সহযোগী হয়েছি সেই দুযোর্গময়কালে।
মনে পড়ে, আমি, আমিনুল, মুর্তজা বশীর, রশীদ চৌধুরী, এমদাদ আমরা ঢাকা আর্ট ইন্সটিটিউটের প্রথম ব্যাচের ছাত্র। তখন আর্ট ইন্সটিটিউটের ক্লাস হতো সেগুন বাগিচায়। কিছুপরে দেবদাস চক্রবর্তী এলেন। আমার আসাটা অন্যরকমের ছিল।
১৯৪৮ সাল থেকেই রাজনৈতিক আবর্তে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছিলাম। আমি কলকাতার কথা বলছি। ১৯৪৯-এর শেষের দিকে আমি তখন ক্যালকাটা আর্ট কলেজের ফিফথ্ ইয়ারের ছাত্র, কয়েক মাস পরই আর্ট কলেজের শেষ ডিপ্লোমা পরীক্ষা; কিন্তু পরীক্ষায় বসা হলো না। ছাত্র-রাজনীতি করার অভিযোগে কলেজ থেকে বহিস্কৃত হলাম। ভালো ছাত্র ছিলাম। নতুন কিছুর ভাবনা-চিন্তা করার আগেই স্বপ্ন ভেঙে যাবার মতো অপ্রত্যাশিত একটা হতাশা এল।
কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সহযোগিতায় এই সময় বাংলাদেশে (তখনকার পূর্ব-পাকিস্তান) আসার একটা সুযোগ ঘটে। সেই সময় পাসপোর্ট-ভিসার ঝামেলা ছিল না। ঢাকায় অনুষ্ঠিত কবি-শিল্পী-সাহিত্যিকদের সম্মেলনে আমিও যোগ দিলাম।
ওই সম্মেলনেই শিল্পী জয়নুল আবেদিনের সঙ্গে দেখা। তিনি আমাকে চিনতেন। কলকাতা আর্ট কলেজে আমি তাঁর ছাত্র ছিলাম। আমার আর্ট কলেজে পরীক্ষা দিতে না পারা ও অন্যান্য ঘটনা তাঁকে জানাতে তিনি সুহূদয়তার সঙ্গে আমাকে সরাসরি ঢাকা সরকারি আর্ট ইন্সটিটিউটে ভর্তি হবার পরামর্শ দিলেন। এভাবেই আবার প্রায় অভাবিতভাবে ঢাকার সঙ্গে আমার যোগাযোগ স্থাপিত হলো। চট্টগ্রামেও ছিলাম কিছুদিন। সে অন্য প্রসঙ্গ...
ঢাকার সহপাঠীরা ছিল আমার অতীব আপনজন— আত্মীয়সম। আমিনুলের শান্তিনগরের বাড়িতে থেকেছি দীর্ঘদিন। একসঙ্গে থেকেছি, কাজ করেছি... অনেক আনন্দ-বেদনার সঙ্গী আমরা। শিল্পী কামরুল হাসান আমাদের মাস্টার মশাই হলেও পরে তাঁকে পেয়েছি বন্ধু হিসেবে, আপনজনের মতো। মুর্তজা বশীর, রশীদ চৌধুরী এরাও আমার খুব ঘনিষ্ঠ।
ঢাকায় তখন সওগাত প্রেসে ‘‘সাহিত্য সংসদ’’-এর শিল্প-সাহিত্যের নিয়মিত বৈঠক বসত। এখানে সাহিত্য ও শিল্প নিয়ে আলোচনা হতো। এসবের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছিলাম। তাছাড়া আমি প্রগতিশীল রাজনৈতিক আবহে বেড়ে উঠেছি... তাই প্রচ্ছন্নে সবসময়ই শিল্প-সাহিত্যের সঙ্গে আত্মার একটা যোগ অনুভব করতাম। এখন আমার মনে হয়, আমি পারিবারিক সূত্রে মানসিকভাবেই সকল বাম আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছি।
সওগাতের সাহিত্য সংসদের কথা বলছিলাম, ওখানে আলাউদ্দিন আল আজাদ, শামসুর রাহমান, আমিনুল ইসলাম, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, খালেদ চৌধুরী এঁরা সকলেই যেতেন, লেখা পাঠ করতেন, আলোচনা করতেন। শিল্প ও সাহিত্যের নানা প্রসঙ্গ নিয়ে তর্ক হতো। আমিও ওই বাদানুবাদে অংশ নিতাম।
মনে পড়ে, কাজী মোতাহার হোসেন, অধ্যাপক আবুল কাশেম, মনসুর আহমেদ, মুনীর চৌধুরীকে ওখানে দেখেছি। ওনারা বক্তৃতা দিতেন সাহিত্য সভায়। এই সাহিত্য সংসদে ‘‘বাংলা’’কে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রস্তাব নেয়া হয়েছিল। এটা বায়ান্নর আগের কথা।
কথাটা খুব সত্য যে, ‘‘তমুদ্দন মজলিশ’’ ইসলাম প্রভাবিত সংগঠন হলেও ‘‘বাংলা’’কে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে এরা মৌলিক কিছু যুক্তি দেখিয়েছিল। তারা প্রশ্ন তুললেন, উর্দু, বাংলা না ইংরেজি হবে অফিসিয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ...!! বিশেষ করে চাকরির উন্নতির ক্ষেত্রে উর্দুভাষীদের অগ্রাধিকার দেবার ব্যাপারেও তমুদ্দন মজলিশ থেকে আপত্তি তোলা হয়েছিল। তমুদ্দন মজলিশের প্রতিনিধিরা ওই সময়ে জিন্নাহ-এর সঙ্গে সাক্ষাত্ করে অতি সন্তর্পণে তাঁদের কথা বলেছিলেন। যতদূর স্মরণ হয়, পল্টনে খাজা নাজিমুদ্দীন বক্তৃতায় বলেছিলেন, উর্দু হবে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। ওই সভায় একটা অংশ থেকে তাত্ক্ষণিক আপত্তি তোলা হয় এবং এই আপত্তি জনসাধারণের কাছ থেকে সরাসরি আসে। ফলে একটা বড় ধরনের সচেতনতা দানা বাঁধে জনসাধারণের মধ্যে।
একথা এজন্য বলছি যে, আমরা যারা ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম—আমাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে জনসাধারণের মনে দ্বিধা ছিল। ছাত্রদের মিটিং-মিছিল এসব অবশ্যই বাঙালির মননে রেখাপাত করেছিল ঠিকই কিন্তু একথাও সত্য, বেশিরভাগ বাঙালির মন ছিল দ্বিধাগ্রস্ত। কিন্তু যখন খাজা নাজিমুদ্দীনের জনসভায় একেবারে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ‘‘উর্দু’’ রাষ্ট্রভাষা হওয়ার যে স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ আসে তা বাঙালির মন থেকে সকল দ্বিধা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে।
একটা সাধারণ উদাহরণ দিই—বাংলাভাষার পক্ষে কলতাবাজার, মেডিকেল বা এর আশপাশে পোস্টার লাগানোর আপত্তি তুলেছিলেন জনসাধারণ; কিন্তু জনসভার ওই ঘটনার পর থেকে আর আপত্তি তোলেন নাই একটুও। অর্থাত্ সমাজে একটা সঞ্চারী ভূমিকা নিয়েছিলেন সাধারণ মানুষ।
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে আমরা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়লাম। সংগ্রাম কমিটি গঠিত হলো। কমিটিতে এমদাদ আমাদের প্রতিনিধি হলেন। কিন্তু ততদিনে ভেতরে ভেতরে অনেকটা এগিয়েছি।
কামরুল হাসান, অজিতগুহ, মুনীর চৌধুরী, শওকত ওসমান এঁরা প্রায়ই রমনায় হাজারীর বাসায় একসঙ্গে বসতেন। আমরা শিল্পী হিসেবে যোগ দিতাম। সেখানে সামপ্রতিক ঘটনা নিয়ে আলোচনা হতো। এখানে বাংলা ভাষা চেতনায় সামাজিক বাস্তব দিকগুলো নিয়ে সারগর্ব আলোচনা হতো।
এছাড়া সাহিত্য সংসদের নিয়মিত সাহিত্য সভায় শিল্পীদের মধ্যে আমিনুল, মুর্তজা, আমি এবং ওই সময়ের উদীয়মান সাহিত্যিক শামসুর রাহমান, সাইয়িদ আতিকুল্লাহ উনারা যেতেন। এটা এমন এক সময় গেছে যে, মনে হতো প্রতিদিন শিক্ষিত হচ্ছি।
এর মধ্যে ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর খাজা নাজিমুদ্দিন জানান যে পাকিস্তান সরকারের সিদ্ধান্তই মেনে নেওয়া হবে। অর্থাত্ উর্দুই হবে বাঙালির রাষ্ট্রভাষা। এই ঘোষণার ফলে আন্দোলন আরও জোরদার হয়ে ওঠে। পুলিশ ১৪৪ ধারা জারি করে মিটিং-মিছিল ইত্যাদি বেআইনি ঘোষণা করে। ২১ ফেব্রুয়ারি (৮ ফাল্গুন ১৩৫৮) এই আদেশ অমান্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহুসংখ্যক ছাত্র ও কিছু রাজনৈতিক কর্মী মিলে মিছিল শুরু করেন। মিছিল ঢাকা মেডিকেল কলেজের কাছাকাছি এলে পুলিশ মিছিলের ওপর গুলি চালায়। গুলিতে নিহত হন সালাম, রফিক, বরকত, জব্বারসহ আরও অনেকে।
এখন যখন পেছনে ফিরে তাকাই—একথা পলে পলে অনুভব করি যে, রাষ্ট্রভাষা বাংলা তখন বাঙালির অস্তিত্বের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছিল; বাঙালিকে আত্মপরিচয়ের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। ১৯৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারির পর ঢাকায় ব্যাপক গণজাগরণ ও একটা গণবোধ তৈরি হলো। বিদ্বজ্জনের ভেতর স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া পাওয়া গেল। এবং গণআন্দোলনের মুখে নতি স্বীকার করে এবং ১৯৫৬ সালে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি প্রদান করে। তাই ২১ ফেব্রুয়ারির সবচেয়ে বড় অনুভব হলো—বাঙালির আত্মপরিচয়।
অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন, মুনীর চৌধুরীর বিভিন্ন আলোচনা, বক্তৃতা ওই সময় দারুণভাবে অণুপ্রণিত করেছে আমাদের। মোহাম্মদ তোয়াহ-এর অবদানও কম নয়। তিনিও আমাদের আকৃষ্ট করতেন। এঁরা সবাই আমাদের সংগঠিত করেছিলেন অন্যভাবে।
ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, আমার মাস্টার মশাই জয়নুল আবেদীন—এঁরা বাঙালির মননকে বিকশিত করেছেন, রুচি তৈরিতে তাঁদের অবদানও অনেক। এঁরা অপ্রত্যক্ষে থেকে নানাভাবে অনুপ্রেরণা, উত্সাহ দিয়েছেন, আশীর্বাদ করেছেন আমাদের জন্য। আজ আমার ভাবতে ভালো লাগে যে, এই ভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা এসেছে। ১৯৭১-র মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় বিজয়গাথা আমাকে অভিভূত করে।
আমি খুব গর্ব অনুভব করি যে, আমি এই ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। সব রাস্তা মিলেমিশে আমরা এক হয়ে আন্দোলন করেছিলাম। তাই বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন আমার কাছে এক অগ্নিগর্ভ স্মৃতির মতো। বাংলা আমার ও আমাদের ভাষা। প্রতিটি বাঙালির আন্দোলনের ভাষা, সাহিত্যের ভাষা, আবেগ প্রকাশের ভাষা। আমি বাঙালি, বাংলাদেশ আমারও দেশ—আমার পিতৃভূমি।’